‘আপনার অ্যাড্রেস বা ফোন নাম্বার যদি দেন—।’
ভদ্রলোক কেবিনের দরজার কাছে থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকালেন আমার দিকে। মুচকি হেসে বললেন, ‘ওসবের দরকার নেই। এক বছর পর আমিই আপনার অফিসে ফোন করে কনট্যাক্ট করে নেব। ”চারুলতা” তো, আমার মনে থাকবে।’
ভদ্রলোক চলে গেলেন। ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে শুধু চুরুটের গন্ধ ভেসে রইল।
তারপর এক বছর কেটে গেছে, কিন্তু আমার অফিসে কোনও ফোন আসেনি। বছর পেরিয়ে আরও দশদিন কেটে গেছে, কিন্তু ওই কনসালট্যান্ট ভদ্রলোক আমার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করেননি।
তবে আমি কিন্তু এখনও হাল ছাড়িনি। মরিয়া হয়ে একটা টেলিফোনের জন্যে অপেক্ষা করছি। আর দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে—বিশেষ করে রাতের ট্রেনে—খেয়ালখুশিমতো উঠে পড়ে ফার্স্ট ক্লাস কামরায় হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি সেই ভদ্রলোককে।
আমি জানি, একদিন-না-একদিন ওঁকে আমি খুঁজে পাবই। যে করে হোক খুঁজে আমাকে পেতেই হবে।
আর ‘সুনন্দা’-র পাঠক হিসেবে আপনাকেও একান্ত অনুরোধ, যদিও কখনও সেই ভদ্রলোককে কোথাও দেখতে পান, দয়া করে আমাকে টেলিফোন করার কথাটা ওঁকে একবার মনে করিয়ে দেবেন। বলবেন, দেড়শোটা পরিবার ওঁর মুখ চেয়ে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে।
শেষ লেখা
ঘরটা অস্বাভাবিক চুপচাপ। রাত এখন গভীর, কিন্তু গভীর রাতেও কিছু-কিছু শব্দ থেকে যায়। কুকুরের চিৎকার, ছুটে-যাওয়া কোনও ট্রাকের গর্জন, সিলিং-ফ্যানের শনশন, হাওয়ায় ওড়া দেওয়াল-ক্যালেন্ডারের ঘষটানি।
আমার আঙুল তখন দড়িটার গেঁট নিয়ে ব্যস্ত, আমার চোখ একটু দূরে দাঁড়ানো ত্রস্ত মেয়েটির দিকে। বুক-কেসের সামনে শক্ত কাঠের পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে। লক্ষ করছে আমার প্রতিটি নড়াচড়া। ওর সুন্দর মিষ্টি মুখটা এখন ফ্যাকাসে, সেখানে প্রাণের কোনও অভিব্যক্তি নেই। ভয় নেই, করুণা নেই, এমনকী ঘৃণাও নেই।
দড়ির ফাঁসটা গলায় পরে নিলাম। তারপর কাঁপা হাতে সেটা টেনে আঁট করে বসালাম। বড্ড বেশি শক্ত হয়ে গেছে। একটু টেনে আলগা করলাম ফাঁসটা। মনের মধ্যে নানান ভাবনার ভিড়—একে অপরকে ঠেলে সরিয়ে জায়গা করে নিতে চাইছে।
কুন্তলার দিকে তাকিয়ে বললাম, ভয় পেয়ো না। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়ালাম। কারণ, বইয়ের থাকের ওপর আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমি চাই না, সময় হওয়ার আগেই পায়ের নীচে ভরসাটুকু সরে যাক।
কুন্তলাকে আবার বললাম, কী-কী করতে হবে সব মনে আছে তো?
এসব করার কী দরকার, রাজীব?—কুন্তলার স্বর ওর মুখের মতোই ভাবলেশহীন। যেন পাথরে-পাথরে ঠোকাঠুকি হয়ে তৈরি হওয়া শব্দ। ওর জটিল মনের অন্দরে কী যে আঁকাবাঁকা চিন্তার খেলা চলে তার হদিস কখনও পেলাম না। কুন্তলা অন্য মেয়েদের মতো চিন্তা করে না। ও আলাদা।
না করে উপায় নেই, কুন্তলা—।
সবসময় তুমি একই কথা বলো—আমার বিশ্বাস হয় না। এসব শুধু আমাকে কষ্ট দেওয়ার ফন্দি।
ছেলেমানুষি কোরো না, কুন্তলা!
একটা আবছা হাসি ওর মুখের আড়ষ্টতা নরম করল। মিষ্টি হাসি? নরম হাসি? মোনালিসা?
হঠাৎই ওর হাসি মিলিয়ে গেল। চমকে বলে উঠল, দাঁড়াও!
কেন?—আমার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
কে যেন আসছে।
বাইরে অন্ধকার বারান্দায় পায়ের শব্দ শোনা গেল। শব্দটা একটু ইতস্তত করল, তারপর আবার চলতে শুরু করল। আমি শুধু অপলকে ওকে লক্ষ করছি। ও কি সত্যিই হেসেছে? নাকি কল্পনা?
ওরা চলে গেছে।—আমি অস্পষ্ট গলায় বললাম।
কুন্তলা যেন সে-কথা শুনতেই পেল না। নিষ্প্রাণ সুরে বলল, এসব কাণ্ড করে কি সত্যিই কোনও লাভ আছে, রাজীব?
এটা ওর অন্তরের কথা কি না টের পাওয়া ভার।
আমি কোনও উত্তর দিলাম না। আর-একটা মুহূর্ত অপেক্ষা করে দেখা যাক। এক মুহূর্ত!
একরাশ বইয়ের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে গলায় ফাঁস পরে একটা অতিরিক্ত মুহূর্ত কোন কাজে লাগে কে জানে!
ঢোঁক গিললাম। বেশ কষ্ট হল। দড়িটা কেমন করে যেন বেশি এঁটে বসেছে। ঘামে-ভেজা হাতের তালু ঘষে নিলাম প্যান্টের খসখসে কাপড়ে। একটু আগেই দড়িটা ঢিলে করে দিয়েছিলাম, কিন্তু এখন দেখছি টাইট হয়ে গেছে। আমার মাথার ভেতরে একটা অংশ যুতসই শব্দ খুঁজে বেড়াল। তারপর শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তৈরি করতে লাগল কথা।
‘…তার মনটা মনটা যেন খাঁচায় বন্দি এক উদভ্রান্ত বুনো পাখি…।’
না, এটা ঠিক লাগসই হল না।
‘…তার মন যেন বুনো হাঁসের ডানায় ভর করে…।’
এটা মন্দ নয়। এটাকেই ঘষেমেজে কাল ঠিক করে নেওয়া যাবে। কাল? জীবনের শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়েও একটা মানুষ আগামীকালের কথা ভাবে! সত্যি, স্বপ্ন দেখার কোনও শেষ নেই। এই কথাগুলোও মনে রাখতে হবে। বেশ ভালো। লেখার সময় যেন বাদ না পড়ে।
দড়িটা দেখছি ক্রমশ এঁটে বসছে। ঘামে ভিজে কি দড়ির আঁশগুলো কুঁকড়ে যাচ্ছে? না বোধহয়।
যাক, আর অপেক্ষা করে লাভ নেই—কাজটা শেষ করে ফেলাই ভালো। কারণ, একটা উপন্যাস আমাকে শেষ করতে হবে।
নাও, আমি তৈরি, কুন্তলা।—আমার কথাগুলো যেন শুকনো কাঠের খটাখট শব্দ।
এক গ্লাস জলের ছবি ভেসে উঠল চোখের সামনে। তেষ্টা পেল। কিন্তু না, এখন জল চাইলে সময় নষ্ট হবে। কল্পনায় টের পেলাম, আমি এক গ্লাস ঠান্ডা জল ধীরে-ধীরে চুমুক দিয়ে খাচ্ছি।
‘…ঢোঁক গিলল সে। গলায় এঁটে বসা মোটা দড়িটা যেন হাজার ছুঁচ ফোটাচ্ছে। একটা শীতল অনুভূতি গলা বেয়ে নেমে যাচ্ছে তার অস্থির পাকস্থলীতে…।’
