আমি চোখ ডলে ঘুম তাড়িয়ে আবার পড়তে শুরু করতাম। কিন্তু খুব রাগ হত ভোলার ওপর। বলতাম, তোমার কি কখনও ঘুম পায় না!
ভোলা হাসত। হাসলে ওর ঠোঁটটা সামান্য চওড়া হত। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত, ঘুম পেলে আমাদের চলে না, ভাইটি।
অনেকসময় এমন হয়েছে যে, ইতিহাস পড়তে-পড়তে ভীষণ বিরক্ত হয়ে চটাস শব্দে বই বন্ধ করে ফেলেছি ও দুর, কিচ্ছু মুখস্থ হতে চাইছে না! বারবার ভুলে যাচ্ছি।
ভোলা তখন বইটা আমার হাত থেকে টেনে নিয়েছে : কই, আমায় বইটা দাও দেখি! কোন জায়গাটা বলো তো…।
ওকে পৃষ্ঠাগুলো দেখিয়ে দিয়ে বলেছি, শুধু সাল-তারিখ আর গুচ্ছের রাজা-বাদশার নাম! এসব কখনও সহজে মুখস্থ হয়!
ভোলা পৃষ্ঠাগুলোর দিকে দু-পলক তাকাল, তারপর বইটা বন্ধ করে বলল, নাও, তুমি এবার চোখ বুজে শুনে যাও। একমনে শুনবে কিন্তু…।
ব্যস! ভোলা গড়গড় করে পৃষ্ঠাগুলো মুখস্থ বলে যেত আমার কানের কাছে। আর আমি ওর তাকলাগানো ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে যেতাম। ওর মুখে শুনতে-শুনতে ইতিহাসের পড়া দিব্যি মুখস্থ হয়ে যেত।
আমি ভোলাকে বলতাম, আমার বদলে তুমি পরীক্ষা দিলে রেজাল্ট অনেক ভালো হত।
ভোলা প্রতিবাদ করে বলত, না, ভাইটি, আমি ফেল করতাম। কোথা থেকে কোন পর্যন্ত লিখতে হবে সেটাই তো আমি বুঝতে পারি না!
তা হলে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমি পরীক্ষা দেব।
আমার এই অদ্ভুত বায়না শুনে ভোলা হেসে বলত, ভাইটি, এভাবে পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করার মধ্যে কোনও আনন্দ নেই।
আমি ওর কথাটা মন দিয়ে ভাবতাম। এতসব ও বোঝে কেমন করে!
আমার সঙ্গী হয়ে সময় কাটানো ছাড়াও কিছু-কিছু বাড়তি কাজ ভোলাকে করতে হত। যেমন, বাবার ফাইফরমাশ খাটা, দোকানে যাওয়া, টেলিফোন কিংবা ইলেকট্রিকের বিল জমা দিয়ে আসা– এইসব। কিন্তু এত কাজ করেও ভোলাকে কখনও বিরক্ত বা ক্লান্ত হতে দেখিনি। ওকে যদি জিগ্যেস করতাম, এত কাজ করতে করতে কখনও তোমার বিরক্ত লাগে না? তা হলে ও হয়তো হেসে বলত, বিরক্ত হলে আমাদের চলে না, ভাইটি।
আমার দেখাদেখি ভোলা বাবাকে বাবা বলেই ডাকত। বাবার অফিসের ব্যাগটা হাতে তুলে দিত, জুতো পালিশ করে দিত, বাবা কখন অফিস থেকে ফিরবে জিগ্যেস করত, সাবধানে যাতায়াত করার জন্যে পরামর্শ দিত।
ওর কাণ্ডকারখানা দেখে বাবা মাঝে-মাঝে আমাকে বলত, একটা ডোমেস্টিক কম্প্যানিয়ান রোবটের কাছ থেকে এত সার্ভিস পাব ভাবিনি।
আমি কোনও জবাব দিতাম না। তবে ভোলার সঙ্গে রোবট, সার্ভিস, এই শব্দগুলো জুড়ে কথা বলাটা আমার ভালো লাগত না।
একদিন আমরা তিনজনে ইভনিং শো-তে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম আমি, বাবা, আর ভোলা। ছবিটার নাম দ্য সাউন্ড অফ মিউজিক। ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে আর নাচ-গান নিয়ে দারুণ জমাটি ছবি। হল থেকে বেরোনোর সময় হঠাৎই শুনলাম ভোলা গুনগুন করে গান গাইছে : ডো আ ডিয়ার, আ ফিমেল ডিয়ার/রে আ রে অফ গোল্ডেন সান/ মি আ নেম আই কল মাইসেলফ…।
আমি জিগ্যেস করলাম, ভোলা, ছবি কেমন লাগল?
ভোলা বলল, দারুণ! যদিও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।
বাবা হেসে বলল, যাক, ভোলা অন্তত সত্যি কথাটা বলেছে!
আমি বললাম, রোবটরা মিথ্যে কথা বলে না, বাবা।
ফেরার পথে হঠাৎই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। তখনও আমরা একটা খালি ট্যাক্সি জোগাড় করতে পারিনি। ছাতা সঙ্গে না থাকায় ফুটপাথের ধার ঘেঁষে একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে কোনওরকমে মাথা বাঁচাতে চেষ্টা করছি।
হঠাৎই একটা বিশাল অফিসবাড়ির আড়ালের এক অন্ধকার কোণ থেকে তিনটে ছায়া এগিয়ে এল আমাদের দিকে। মাথায় কঁকড়া চুল। পরনে টি-শার্ট আর চোঙা প্যান্ট।
খুব কাছাকাছি এসে একটা ছেলে বাবাকে লক্ষ্য করে বলল, দাদা, ফুলকি হবে, ফুলকি?
বাবা থতোমতো খেয়ে বলল, ফু-ফুলকি…মানে?
তখন পাশ থেকে তার এক সঙ্গী কড়া মেজাজে মন্তব্য করল, আরে ফুলকি মানে আগুন– সালা ন্যাকাষষ্ঠী! একটা সিগারেট কোথা থেকে বের করে ঠোঁটে রাখল সে।
এইবার বাকি দুজন বাবার দু-পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, মালকড়ি যা আছে ঝটপট দিয়ে দে।
তিননম্বর ছেলেটা একটা ক্ষুর বের করে বাবার গলার পাশটায় চেপে ধরল।
আমার তো গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠছিল। কিন্তু শত চেষ্টা করেও গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বের করতে পারছিলাম না। তা ছাড়া, কাছাকাছি এমন কাউকে চোখেও পড়ল না যে আমাদের বিপদে এগিয়ে আসবে।
হঠাৎই ভোলা দিব্যি স্বাভাবিক গলায় আমায় বলল, ভয় পেয়ো না, ভাইটি। দেখছি কী করা যায়। তারপর ছেলেগুলোকে লক্ষ্য করে ঠান্ডা এবং শান্ত গলায় বলল, বাবাকে ছেড়ে দাও।
তা হলে তোমাদেরও আমি ছেড়ে দেব।
বাবা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ছেলে তিনটে খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ল।
একজন পেটে হাত চেপে হাসতেহাসতে খানিকটা কুঁজো হয়ে গেল। তারপর কোনওরকমে হাসির দমক কমিয়ে বলল, লে, চারফুটিয়া কী বলছে শোন। তারপর বাচ্চাদের আধো-আধো উচ্চারণে ব্যঙ্গ করে বলে উঠল, ওলে বাবা! বিলাট মাছতান এচে গ্যাচে! পালা, পালা, ছিগিল পালা!
কথা বলতে বলতে ছেলেটা ভোলাকে লক্ষ্য করে লাথি চালিয়েছে। ভোলা কিন্তু নড়ল না– চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। লোহার সঙ্গে মানুষের পায়ের সংঘর্ষ হল। আর সঙ্গে-সঙ্গে বিকট চিৎকার করে ছেলেটা বসে পড়ল রাস্তায়। ডান পা-টা চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল, আর কাটা ছাগলের মতো ছটফট করতে লাগল।
