আপত্তি! মলিন আলোয় বিনোদনারায়ণের হাসিটা কেমন যেন দেখাল। নরম গলায় তিনি বললেন, সুনীতকে সুস্থ করে তোলার জন্যে কোনও কিছুতেই আমার আপত্তি নেই।
ওঁরা সিঁড়ি ঘুরে দোতলায় নেমে এসেছিলেন। তখনই কানে এল জড়ানো গলায় গান ও .কারণ সেবায় বারণ করো, জানতে পারি কারণটা কী…?
প্রমোদ। চাপা গলায় বললেন বিনোদবাবু, এসব নাকি ওর তন্ত্র সাধনার অঙ্গ। হুঁ!
প্রিয়নাথ কোনও কথা বললেন না।
রাত অনেক হল। চলুন, হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নেওয়া যাক।
প্রিয়নাথকে একতলার খাওয়ার ঘরের দিকে নিয়ে চললেন বিনোদনারায়ণ।
জাফরির ফাঁক দিয়ে বাতাস আসছিল। সেদিকে তাকিয়ে প্রিয়নাথ বুঝতে পারলেন, বাইরে অন্ধকার আর শীতের রেষারেষি শুরু হয়ে গেছে।
.
টিনের বাক্স লাগানো সাইকেল-ভ্যান নিয়ে যারা পাঁউরুটি আর বিস্কুট দোকানে-দোকানে জোগান দেয় তাদের কথা মনে পড়ল প্রিয়নাথের। পাঁউরুটি আর বিস্কুটের বদলে যদি বেশ কিছু কাচের মার্বেল সেই বাক্সে ভরে ভ্যানটাকে সদ্য-ধান কাটা কোনও চাষ-জমির ওপর দিয়ে চালানো হয়, তা হলে যেরকম ঝাঁকুনি ও শব্দ হবে তার সঙ্গে এই বাসটার চলার দারুণ মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন তিনি।
সমস্তিপুরে নেমে সরু লাইনের ট্রেনে চড়ে পাঁচ ঘণ্টা পথ চলার পর তিনি নেমেছিলেন কানিতাল স্টেশনে। সেখান থেকে বাস ধরেছেন–তবে বাসটাকে দোমড়ানো-তোবড়ানো ক্যানেস্তারা বলাই ভালো। এবড়োখেবড়ো রাস্তায় ছুটে চলা বাসের শব্দ আর ঝাঁকুনি প্রিয়নাথকে প্রায় কাহিল করে দিচ্ছিল। যদিও বাসের নাম উড়ান খটোলা।
আশার কথা একটাই। এই বাস তাকে সদরিয়া নিয়ে যাবে। তারপর…সেখানে নেমে..খুঁজে বের করতে হবে নেহাকে।
জানলার বাইরে দুপুর গড়িয়ে বিকেল এসে গেছে। স্তিমিত রোদে ছুটে চলা গম-ভুট্টা জওয়ারের খেত আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। সামান্য খোলা কাচের জানলার ফাঁক দিয়ে ছুটে আসা বাতাস ক্রমে আরও ঠান্ডা হচ্ছিল। প্রিয়নাথ জ্যাকেটের চেন গলা পর্যন্ত টেনে দিলেন, মাফলারটাকে আরও ভালো করে জড়িয়ে নিলেন।
ভিড়ে ঠাসা বাসের ভেতরে অনেক যাত্রীই বিড়ির নেশায় ব্যস্ত। বোধহয় নো স্মোকিং কথার নো-টা বাসের দেওয়াল থেকে মুছে গেছে বলে।
খানিক ইতস্তত করে অস্বস্তি কাটিয়ে প্রিয়নাথ একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর সুনীতনারায়ণের সমস্যার দুশ্চিন্তায় ডুবে গেলেন।
হঠাৎই তার মাথার ভেতরে সুনীত হাড় কাঁপানো ভয়ংকর চিৎকার করে উঠল।
আর প্রিয়নাথের সাতদিন আগের কথা মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল বসিরহাটের কথা। ঘোরালো প্যাঁচালো অলিন্দ আর সিঁড়িতে জট পাকানো প্রকাণ্ড বাড়িটার কথা।
সেদিন রাতে খাওয়াদাওয়ার পর প্রিয়নাথের চোখে ঘুম আসেনি।
দোতলায় একটা ঘরে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। বিছানায় বসে নোটবই আর পেন নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে নানান মন্তব্য লিখেছেন প্রিয়নাথ। সুনীতের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, বিনোদনারায়ণের কাছ থেকে শোনা কিছু জরুরি কথা, আর নিজের মতামত। সেইসঙ্গে লিখে নিয়েছেন, এরপর কী কী কাজ করতে হবে।
লেখা-টেখার কাজ শেষ হলে পর প্রিয়নাথ ঘর অন্ধকার করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন। ঘরের সব জানলা-দরজা বন্ধ করে শুলে তার কেমন যেন দম আটকে আসে। তাই পায়ের দিকের একটা জানলার পাল্লা অর্ধেকটা খুলে রেখেছিলেন। সেটা নিশ্চয়ই পুব দিক কারণ, চাঁদের একটা টুকরো দেখা যাচ্ছিল।
বহু চেষ্টা করেও ঘুম আসছিল না। বিছানায় উশখুশ করছিলেন। হঠাৎই জড়ানো গলায় গানের কলি শুনতে পেলেন নৃমুণ্ডমালিনী তারা / মুণ্ডমালা কোথায় পেলি..।
প্রমোদনারায়ণ। দোতলায় বাসিন্দা–প্রিয়নাথের প্রতিবেশী।
রাতের খাওয়ার সময় প্রমোদনারায়ণের দেখা পায়নি প্রিয়নাথ। এখন ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলে নিলে কেমন হয়!
বাইরে বেরিয়ে দেখলেন চওড়া বারান্দার শেষ প্রান্তে, খানিকটা চাতাল মতো জায়গায়, একজন ছায়া-মানুষ বসে আছে। তার শরীর অন্ধকার আর চাঁদের আলোয় মাখামাখি।
পায়ে-পায়ে কাছে এগিয়ে গেলেন প্রিয়নাথ। আলতো করে ডাকলেন, প্রমোদবাবু।
ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন প্রমোদনারায়ণ।
একমুখ দাড়ি, ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া চুল, কপালে লাল তিলক চাঁদের আলোয় কালো দেখাচ্ছে। আর গভীর চোখদুটো নিশাচর প্রাণীর মতো অন্তর্ভেদী, উজ্জ্বল।
ঘাড় ঘুরিয়ে ওপরদিকে তাকালেন প্রমোদনারায়ণ : ও, ভূতনাথবাবু! আসুন…বসুন। মায়ের চরণ ধোওয়া চাঁদের আলো…এর কোনও জবাব নেই।
চাতালে সতরঞ্জি পাতা ছিল। ভূতনাথ তার ওপরে বসে পড়লেন। খোলা জায়গায় বেশ শীত করছিল। গায়ের শাল আরও ঘন করে জড়িয়ে নিলেন।
অন্ধকারে বেশ কিছু গাছের মাথা আর দু-একটা বাড়ি চোখে পড়ছে। একটা প্যাচা নিঃশব্দে উড়ে গেল। কয়েকটা জোনাকি আলোর ফুটকি জ্বেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। প্রিয়নাথের মনে পড়ে গেল সুনীতের ফটোটার কথা।
শীতের বাতাস যেমন-তেমন বইছিল। প্রিয়নাথের নাকে মদের গন্ধ ভেসে আসছিল।
শুনেছি, আপনি সুনুকে সারিয়ে তোলার জন্যে কলকাতা থেকে এসেছেন। প্রমোদনারায়ণ কথা বললেন, আমিও ওকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছি। কিন্তু দাদা এমন ঝামেলা করে। কিছুতেই বোঝে না ধর্মকর্ম এক জিনিস আর তন্ত্র আর-এক জিনিস। আমার সাধনায় বারবার বিঘ্ন ঘটায়…। বেশ বিরক্তভাবে কথা শেষ করলেন প্রমোদবাবু।
