এবার শ্রুতিদি জবাব দিল, তুই তখন থেকে এরকম জেদ ধরে আছিস কেন, রিমকি। শুরুতে তুই-ই তো বললি ঘরটা হন্টেড। তা ছাড়া মা এই যে বলল, ছায়াটা আলমারির পেছনে ঢুকে গেল– একদিক দিয়ে ঢুকে আর-একদিক দিয়ে বেরিয়ে এল–এটা কি কোনও মানুষের পক্ষে ইম্পসিবল নয়?
কেন, ইম্পসিবল কেন!
আলমারির পেছনেই তো দেওয়াল! সেখানে দুইঞ্চিও ফাঁক নেই! তা হলে একটা গোটা মানুষ ঢুকবে কেমন করে?
আমি দমে গেলাম।
শ্রুতিদি বলেই চলল, তোকে তো লোকটা টাচ করেছিল। ওটা কোনও মানুষের ছোঁয়া? তুই বল! তখন তোর মন-শরীর অবশ হয়ে যায়নি? একটু চুপ করে থেকে শ্রুতিদি আবার নীচু গলায় বলল, ভাগ্যিস ট্রেনটা এসে গিয়েছিল…নইলে আরও বাজে কিছু হতে পারত!
তার মানে! আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। কাল রাতে ঝমঝম শব্দে ট্রেন ছুটে গেছে বলে আমি বাজে কিছু হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেছি! পিসিমাদের ওই রিলেটিভ-জয়তী–সে-ও একইরকম ভাবে বেঁচে গেছে।
শ্রুতিদি এত সব জানল কেমন করে! কী করে মনে রাখতে পারল কবিতার ওই রোম্যান্টিক লাইনগুলো!
শ্রুতিদির মুখ থমথম করছিল।
আমি জিগ্যেস করলাম, তুমি এত জানলে কেমন করে?
শ্রুতিদির চোখে জল এসে গেল পলকে। মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে ও উঠে দাঁড়াল। তারপর বলতে গেলে ছুট-পায়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
আমি খানিকটা অবাক হয়ে পিসিমার দিকে তাকালাম।
পিসিমা মাথা নীচু করে বসেছিলেন। সেই অবস্থাতেই বললেন, শ্রুতিকে নিয়ে ব্যাপারটা শুরু হয়। তার আগে কখনও কিছু হয়নি। সে-রাতে ও একা শুয়েছিল ওই ঘরে। সেদিনটা আবার বাংলা বন্ধ ছিল। তাই কোনও ট্রেন চলেনি। অশরীরী সেই প্রেতটা সেদিন আর মাঝপথে থামেনি। ওর…ওর..সাধ মিটিয়ে তারপর উধাও হয়ে গেছে…।
আমি পাথর হয়ে গেলাম। আমি এসব কী শুনছি!
পিসিমা কেঁদে ফেললেন : সেদিন থেকে শ্রুতি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। পরে…পরে..ওকে মানসিকভাবে সুস্থ করার জন্যে মিছিমিছি অ্যাবরশন করাতে হয়। তোকে আমি লজ্জায় একথা আগে বলিনি। তা ছাড়া কেউই তো এসব কথা বিশ্বাস করবে না। সবই আমাদের কপাল…
জয়তীর ব্যাপারটার পর এতবছর পার হয়ে গেছে…তাই ভেবেছিলাম ঘরটার দোষ কেটে গেছে। এখন দেখছি যায়নি! আমাদের হয়তো বাড়িটাই ছেড়ে দিতে হবে…।
শ্রুতিদির বিয়ে না করার কারণ হিসেবে কানাঘুষোয় কিছু-কিছু শুনেছিলাম। ভেবেছিলাম, আর-পাঁচটা ঘটনার মতোই ওর লাভার ওকে বিপদে ফেলে পালিয়েছে। কিন্তু এখন পিসিমার মুখে এসব কথা শোনার পর সবকিছু কেমন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল।
আমি কল্পনায় এক অতৃপ্ত প্রেমিককে দেখতে পাচ্ছিলাম–যার বয়েস একশো, দুশো, তিনশো, কি চারশো বছর। যার ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা আজও মেটেনি। এককালে সে হয়তো এইখানেই থাকত। পাগলের মতো আকুল ভালোবাসা নিয়ে কারও জন্যে অপেক্ষা করত।
আমি চোখ বুজে ফেললাম। পায়রার বুকের নরম পালক আমার শরীরে বিলি কাটতে লাগল। আমি একটা চেনা পারফিউমের গন্ধ পেলাম।
ঠিক তখনই পশ্চিমের রেল-লাইন ধরে ঝমঝম শব্দে একটা ট্রেন ছুটে গেল। তার হুইলের শব্দটা আমার বুকের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
