এবার আমি চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু ভোকাল কর্ড স্ট্রাইক করে বসল।
আশ্চর্য! যখন আমি চিৎকার করতে পারতাম তখন লজ্জায় সঙ্কোচে চিৎকার করতে চাইনি। আর এখন প্রাণপণে চিৎকার করতে চাইছি অথচ পারছি না।
হঠাৎই মনে হল আমার বিছানায় খুব কাছে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে ঝুঁকে পড়েছে আমার শরীরের ওপরে। পারফিউম ছাড়া আমি যেন একটা উগ্র পুরুষালি গন্ধ পাচ্ছি। একই সঙ্গে পায়রার বুকের পালকের মতো নরম আলতো একটা ছোঁয়া আমাকে অবশ করে দিল। হাতে, পায়ে, গলায়, বুকে। টিভি চালিয়ে তার স্ক্রিনের খুব কাছে হাত নিয়ে গেলে যেরকম অনুভূতি হয়, এ-ছোঁয়া ঠিক সেইরকম।
আমার ঘুম পেয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তীব্র হুইল্প দিয়ে ঝমঝম শব্দে একটা ট্রেন ছুটে গেল।
আর সঙ্গে-সঙ্গে তাল কেটে গিয়ে সব ওলটপালট হয়ে গেল। পলকে পারফিউমের গন্ধ, অলৌকিক ছোঁয়া সব উধাও। আমার ঘুমের ঘোরও কেটে গেল। গলা পর্যন্ত যে-ভয় উথলে উঠেছিল সেটা থার্মোমিটারের পারার মতো দ্রুত নামতে লাগল।
প্রচণ্ড এক চেষ্টায় বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম আমি। হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় আলোর সুইচ জ্বেলে দিলাম।
ঘরে কেউ নেই।
ঘরটা শেষ যেমনটি দেখেছিলাম ঠিক তেমনটিই আছে।
হঠাৎই আমার চোখ গেল ঘরের দরজার দিকে।
দরজার খিল-ছিটকিনি দুটোই ভোলা। দরজার পাল্লা দুটো ইঞ্চিদুয়েক ফাঁক হয়ে আছে।
তা হলে কি ঘরে চোর ঢুকেছিল! কিন্তু বাইরে থেকে তো খিল-ছিটকিনি খোলা অসম্ভব।
দরজা আবার ভালো করে বন্ধ করে খিল আর ছিটকিনি এঁটে দিলাম। পাল্লা দুটো বারকয়েক টেনেটুনে দেখলাম ঠিক আছে কি না। তারপর বিছানায় ফিরে এলাম।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত সওয়া তিনটে।
শরীর আর বইছিল না। আলো জ্বেলে রেখেই শুয়ে পড়লাম। কারণ, আলো নিভিয়ে দিলে আমার আর কিছুতেই ঘুম আসবে না।
.
দুমদুম করে দরজার কেউ ধাক্কা দিচ্ছিল।
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। হাতঘড়িটার দিকে তাকালাম। নটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। জানলার দিকে তাকিয়েও বোঝা যাচ্ছে বেলা অনেক হয়ে গেছে।
দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল। সেইসঙ্গে সুকান্তি আমার নাম ধরে ডাকল ও রিমকি! রিমকি! ওঠ, ওঠ–নটা বাজে! তুই বলে মর্নিংওয়াকে যাবি, সানরাইজ দেখবি!
আমি সাড়া দিলাম : খুলছি, খুলছি! এক মিনিট…।
এক মিনিটের কম সময়েই পোশাক পালটে টুথব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে দরজা খুলে দিলাম।
কাল রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারিসনি নাকি!
আমি জড়ানো গলায় বললাম, না।
তখনই ও দরজার কাছ থেকে জ্বলন্ত টিউব লাইটটা দেখতে পেল।
কী রে, সারা রাত আলো জ্বেলে ঘুমিয়েছিলি নাকি!
হ্যাঁ। আলো পাখা অফ করে দে। আমি হাত-মুখ ধুয়ে ওপরে যাচ্ছি। গিয়ে সব বলছি। পিসিমাকে বল চা করতে।
ওপরে গিয়ে চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়েই আমি বললাম, পিসিমা, কিছু মাইন্ড কোরো না। তোমাদের ওই একতলার ঘরটা কিন্তু হন্টেড।
হন্টেড মানে! ঠিক কী বলতে চাইছিস? সুকান্তি জিগ্যেস করল।
আমি চায়ের কাপে আর-একটা লম্বা চুমুক দিয়ে নির্বিকারভাবে বললাম, হন্টেড মানে হন্টেড। ওই ঘরটায় ভূতের উপদ্রব আছে। আমাকে আগে বলিসনি কেন?
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ।
পিসিমা, শ্রুতিদি, সুকান্তি–সবাই বেশ ফ্যালফেলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। পিসিমা আর তিদি তো মনে হল আমার কথায় বেশ ভয় পেয়ে গেছে। আর সুকান্তি আমাকে খুঁটিয়ে লক্ষ করছিল। বুঝতে চাইছিল আমি সত্যি-সত্যি ভূতের কথা বলছি, নাকি ঠাট্টা করছি।
কিছুক্ষণ পর সুকান্তি মুখ নীচু করে মিনমিন করে বলল, না…মানে…ভাবিনি যে, এখনও ও-ঘরটায় কোনও প্রবলেম হতে পারে। মুখ তুলে পিসিমার দিকে তাকাল ও মা, তুমি তো জানো, ছোড়দির বন্ধু ঈশিতা তো এসে রাতে ও-ঘরে ছিল। তখন তো কিছু হয়নি! তারপর…।
লক্ষ করলাম, শ্রুতিদির চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। আর পিসিমাও কেমন যেন অস্বস্তি পেয়ে এর মুখে ওর মুখে চাইছেন।
সুকান্তি আমার কাছে ঝুঁকে এসে জানতে চাইল, তুই ঠিক কী দেখেছিস বল তো! কী হয়েছে কাল রাতে?
কী আবার হবে! একটা লোক ঢুকে পড়েছিল আমার ঘরের ভেতরে। অথচ রাত্তিরে শোওয়ার আগে খিল-ছিটকিনি ঠিকমতো এঁটে দিয়েছিলাম।
আমি চা খেতে-খেতে পুরো ঘটনাটা খুলে বললাম।
জানলা দিয়ে রোদ-ঝলমলে দিন দেখা যাচ্ছে। চারপাশে কোথাও অশরীরী-অলৌকিকের ছায়ামাত্র নেই। এই পরিবেশে কাল রাতের ব্যাপার-স্যাপারগুলো বলতে গিয়ে আমার হাসি পেয়ে যাচ্ছিল। মনে হল, এমন তো নয় যে, বাইরে থেকে কায়দা করে একতলার ঘরটার খিল-ছিটকিনি খোলা যায়! তা হলে কোনও বদমাস লোক চুরি বা অন্য কোনও বদ মতলবে বাইরে থেকে খিল ছিটকিনি খুলে মাঝরাতে ঘরে ঢুকে পড়েছে। তারপর ট্রেনের আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যাবে ভেবে পালিয়েছে।
সে কথাই সুকান্তিকে বললাম।
সুকান্তি মানতে চাইল না। বলল, না রে, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। ঘরটা বোধহয় সত্যি সত্যিই হন্টেড। তোর আগে আরও দুটো এরকম কেস হয়েছে।
কীরকম, শুনি ।
এবার পিসিমা মুখ খুললেন : জয়তাঁকে তুই চিনবি না। আমার ননদের বড় মেয়ে। বছরপাঁচেক আগে ও ওয়াশ হসপিটালে ওর এক আত্মীয়কে দেখতে এসেছিল। কী একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল যেন। তখন ও আমাদের বাড়িতে এসে থেকেছিল। রাতে নীচের ওই ঘরটায় শুয়েছিল। ও কিন্তু ভীষণ ভয় পেয়েছিল।
