পিসিমা একবার অদ্ভুত চোখে বড় মেয়ের দিকে তাকালেন।
আমি শ্রুতিদিকে বললাম, তিদি, সবই নদীর এ পার কহে…। সত্যিকারের সুখ-শান্তি বলতে যা বোঝায় সেটা কারওর নেই। ওটা শুধু খুঁজে বেড়ানোর জিনিস কখনও পাওয়া যায় না।
শ্রুতিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আমার হঠাৎই বেশ খারাপ লাগছিল।
খটাখট শব্দে একটা লোকাল ট্রেন চলে গেল।
খোলা জানলা দিয়ে লাইনের ধারের গাছপালা দেখা যাচ্ছিল। কাছেই ইলেকট্রিকের তারে দুটো শালিক বসে রয়েছে। বাতাসে গাছের পাতা নড়ছিল। জোরালো রোদে কয়েকটা পাতা আয়নার মতো চকচক করছিল।
পিসিমা বললেন, শ্রুতিকে কত বলি, টিউশানি কর–ও করতে চায় না।
টিউশানি আমার ভাল্লেগে না। শ্রুতিদি বলল।
আমি ওকে বললাম, তোমার তো আঁকার হাত ভালো ছিল। হাতের কাজটাজ কিছু করতে পারো…বাটিকের কাজ…।
তিদিন মলিন হাসল। ছোট্ট করে হুঃ… শব্দ করল।
এরপর গল্প আর তেমন জমল না। আমি স্নান করার তোড়জোড় শুরু করলাম। পিসিমাও রান্নাবান্নার ব্যাপারটা দেখতে চলে গেলেন।
.
রাতে সবাই মিলে একসঙ্গে যখন খেতে বসেছি, তখন পিসিমা সুকান্তিকে বললেন, কীরে, কী ঠিক করলি? তুই কি তা হলে একতলার ঘরে শুবি? আর রিমকি তোর ঘরে শোবে?
সুকান্তি খেতে-খেতে মায়ের দিকে তাকাল। জড়ানো গলায় বলল, আমাকে সব লটবহর নিয়ে তাহলে নীচে নামতে হবে। তা ছাড়া আর ব্যাচিলার্স ডেন কি রিমকির ভালো লাগবে? একটু হাসল সুকান্তি।
আমি সাত-তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, একতলায় শুতে আমার কোনও প্রবলেম নেই, পিসিমা।
না, তা না…যদি ভয়-টয় পাস…।
আমি হাসলাম ও চোর-ডাকাত হলে পেতেও পারি। তা ছাড়া আবার ভয় কীসের। আমার একা-একা শোওয়ার অভ্যাস আছে।
সুকান্তি খাওয়া থামিয়ে বলল, রিমকির আই. কিউ. দিন-দিন কমে যাচ্ছে। মা চোর-ডাকাতের ভয়ের কথা বলছে না–বলছে ঘোস্ট প্রবলেমের কথা।
ভূতের ভয়! আমি আর হাসি চাপতে পারলাম না? পিসিমা, সত্যি…ভূত বলে কিছু থাকলে তবে না তাকে ভয় পাব! ভূত হচ্ছে বাচ্চাদের ভয় দেখানোর জন্যে বড়দের তৈরি একটা মিথ– মিথ্যেও বলতে পারো। আমি তো আর বাচ্চা নই!
শ্রুতিদি কেমন অদ্ভুত চোখে আমাকে দেখছিল। ওর বলা সকালের কথাটা মনে পড়ল : তোকে আমার হিংসে হচ্ছে, রিমকি।
সুকান্তি পিসিমাকে বলল, রিমকি একটুও বদলায়নি। সেই ছোটবেলার মতোই ঝাসি কি রানি। কী বল, রিমকি!
আমি বললাম, তুই ছোটবেলা থেকে যা কুঁড়ে! তুই কখনও নিজের আস্তানা ছাড়বি! বিছানায় পাশ ফিরতে হলেও তো মাকে ডাকিস পাশ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে।
সুকান্তির সঙ্গে লাঠালাঠি করতে করতেই খাওয়া শেষ হল।
এরপর শুতে যাওয়ার পালা। সুকান্তি বলল, দাঁড়া, তোর জন্যে কটা ম্যাগাজিন নিয়ে আসি।
আমি বললাম, দরকার নেই–আমার সঙ্গে বই আছে, কিন্তু ও শুনল না। ওর ঘরে গেল ম্যাগাজিনগুলো নিয়ে আসতে।
দোতলায় বড় ঘরটায় পিসিমা আর শ্রুতিদি শোয়। তার পাশে ছোট ঘরটায় সুকান্তি। ওর ঠিক নীচেই আমার জন্যে বরাদ্দ করা ঘরটা। এমনিতে ওটা বন্ধই থাকে ইতিও ওখানে শুত না। পিসেমশাই বেঁচে থাকতে ঘরটা ব্যবহার হত। এতকালে ছিল বৈঠকখানা–পরে পিসেমশাইয়ের শোওয়ার ঘর। ঘর ছাড়া বাকিটা পুরোনো ধাঁচের বারান্দা, কলতলা আর বাথরুম।
খাওয়াদাওয়ার পর পিসিমাদের সঙ্গে বসে আর-এক প্রস্থ গল্প, আর কিছুটা সময় টিভি দেখলাম। তারপর হাই উঠতে লাগল।
পিসিমা বললেন, আজকের মতো ঢের হয়েছে। এবার শুতে যা–।
সুকান্তি ম্যাগাজিনগুলো হাতে নিয়ে আমাকে খোঁচা দিল? চল, তোকে সি অফ করে আসি।
একতলার ঘরের দরজায় এসে ও বলল, ঢুকেই বাঁদিকে সুইচবোর্ড–তুই তো জানিস। আর বাথরুম…।
আমি ম্যাগাজিনগুলো ওর হাত থেকে নিয়ে বললাম, মায়ের কাছে মাসির গল্প করিস না। গুডনাইট। কাল সকাল-সকাল উঠবি–আমাকে এসকর্ট করে মর্নিং ওয়াকে নিয়ে যাবি, সানরাইজ দেখাবি।
ও ভুরু উঁচিয়ে বলল, এটা কি পুরী নাকি! এখানে সানরাইজ রান্নাঘরের তাকে পলিপ্যাকে পাওয়া যায়। হাসল সুকান্তি। তারপর গলাটা সিরিয়াস করে বলল, সত্যি তুই ভয় পাবি না তো!
আমি হালকা গলায় বললাম, পেলে তোকে ডাকব।
তা হলে গলা ফাটিয়ে চেঁচাবি…জানিস তো আমার স্লিপ খুব ডিপ!
ও চলে গেল।
আমি ঘরের আলো জ্বেলে দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিলাম। সাবধানের মার নেই ভেবে খিল আর ছিটকিনি দুটোই এঁটে দিলাম। তারপর ম্যাগাজিনগুলো বিছানায় রেখে ঘরের এক কোণে গিয়ে শাড়ি ছেড়ে নাইটি পরে নিলাম।
ঘরের আলো বলতে একটিমাত্র টিউব লাইট। আর আসবাবপত্র বলতে একটা ছোট কাঠের আলমারি, একটা টেবিল, একটা চেয়ার, একটা বুককেস, আর একটা ছোট খাট। আলমারির মাথায় পুরোনো আমলের টুকিটাকি জিনিস–তার মধ্যে একটা পেতলের দোয়াত আর একটা পেতলের ফুলদানি। তবে এত ময়লা হয়ে গেছে যে, পেতলের বলে আর বোঝা যায় না।
ঘরে তিনটে জানলা ও একটা ভেতরের কলতলার দিকে, আর দুটো রেললাইনের দিকে। তিনটে জানলাতেই শক্তপোক্ত গ্রিল লাগানো।
বিছানায় গা ঢেলে দিতেই এক অদ্ভুত তৃপ্তি পেলাম–যেন কেউ আমার জন্যে পালকের কোল পেতে দিয়েছে। অথচ বিছানাটা নিতান্তই মামুলি।
সামান্য আড়মোড়া ভেঙে একটা ফিল্ম ম্যাগাজিন হাতে তুলে নিলাম। ব্যাগে আরভিং ওয়ালেসের সি অভ ফিলিপ ফ্লেমিং রয়েছে, কিন্তু সেটা আর বের করতে ইচ্ছে করল না।
