প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই যশোর রোড থেকে বাঁ-দিকে বাঁক নিয়ে আমাদের গাড়ি মাইকেলনগরে ঢুকে পড়ল।
অন্ধকার কখন যেন পা টিপেটিপে নেমে এসেছে। রাস্তার সামান্য আলো কিংবা ছোটখাটো দোকানপাটের আলো তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার মনে হল, অন্ধকার যেন শিকারি বাঘের মতো গাছ-গাছালির মাথায় ওঁত পেতে অপেক্ষা করছে সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সব গ্রাস করবে।
প্রিয়নাথ বললেন, তোমরা সবাই জুমেলিয়ার কথা ভাবো। প্ল্যানচেট সাকসেসফুল হওয়ার জন্যে এটা খুব জরুরি।
শৌনক বলল, আমরা তো রাত দশটায় বসব। তা হলে এখন থেকেই ভাবার কী দরকার?
মিতি ওকে প্রায় বকুনি দিয়ে বলল, এসব ব্যাপারে আঙ্কল এক্সপার্ট। আঙ্কল যা বলেন তা-ই শুনবি।
তিওয়ারি বলল, আমি কিন্তু শুরুসেই তনুমন দিয়ে জুমির কথাই ভাবছি। খেয়াল করেছিস, আমরা ওর অ্যাক্সিডেন্টের স্পটের ওপর দিয়েই এলাম।
ব্যাপারটা আমিও খেয়াল করেছি, কিন্তু ইচ্ছে করেই সে কথা আর মুখে উচ্চারণ করিনি। কিন্তু রমেশটার তো কাণ্ডজ্ঞান নেই! দেখলাম, বাপ্পা দুহাতে মুখ ঢেকে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছে।
শৌনকদের বাগানবাড়ির পাশের মাঠে গাড়ি রেখে আমরা লোহার সদর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। শৌনকের ডাকে বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার মতিলাল এসে তালা খুলে দিল। দরজার পাল্লা ঠেলতেই গা শিউরে-ওঠা কাচকাচ শব্দ হল।
আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, মাত্র তিনমাস আগে এই বাগানবাড়িতে এসে আমরা কত হইহুল্লোড় করে গেছি। তখন জায়গাটাকে দারুণ লেগেছিল। অথচ আজ এখানে ঢুকতেই কীরকম যেন গা ছমছম করছে।
বাগানের গাছ-গাছালির পাশ দিয়ে এগোতে-এগোতে শৌনক প্রিয়নাথকে লক্ষ করে বলল, আঙ্কল, আজ আমাদের মিশন সাকসেসফুল হবেই। তারপর ঐন্দ্রিলার দিয়ে তাকিয়ে কী বল, মিতি?
ঐন্দ্রিলা আনমনাভাবে বলল, হ্যাঁ, হতেও পারে।
প্রিয়নাথ শৌনককে জিগ্যেস করলেন, তুমি কী করে এত শিওর হচ্ছ বলো তো? তুমি কি কিছু ফিল করছ? অনেক সময় প্রেতাত্মারা আসার আগে মনের ওপর ছাপ ফেলে জানান দেয়।
শৌনক খানিকটা বিব্রতভাবে বলল, না, সেরকম কিছু না–এমনি মনে হচ্ছে।
প্রিয়নাথ আর কোনও কথা বললেন না। তবে ওঁর কপালে কয়েকটা ভাঁজ যেন চোখে পড়ল।
আমরা শৌনকদের বাড়িতে ঢুকে পড়লাম।
প্রায় দেড়কাঠা জুড়ে দোতলা বাড়ি। শৌনকের দাদুর নামে বাড়ির নাম রাখা হয়েছে ভুজঙ্গ নিবাস। বাড়িটার বয়েস তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর হবে। বাড়িতে ঢুকেই কাকিমা আর মিতি রান্নাঘরের দিকে রওনা হল। প্রথমে আমাদের চা-জলখাবারের ব্যবস্থা, তারপর রাতের আয়োজন। আমরা সাতজন যে আজ এখানে আসব, থাকব, সে কথা মতিলালকে আগেই টেলিফোনে বলা ছিল। তাই সব ব্যবস্থা ও আগেই করে রেখেছিল। কিন্তু কাকিমা আর মিতি রান্নাঘরের দিকে রওনা হতেই প্রিয়নাথ ওদের ডাকলেনঃ মিসেস ঘোষ, এক মিনিট–একটু দাঁড়িয়ে যান।
প্রিয়নাথ আঙ্কলকে ঘিরে আমরা ছজন দাঁড়িয়ে পড়লাম। ওঁর কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বালবের আলোয় বিশাল হলঘরে আমাদের লম্বা-লম্বা ছায়া পড়েছে।
প্রিয়নাথ কখন যেন আমাদের দলপতি হয়ে পড়েছেন। একটু কেশে নিয়ে হাতঘড়ি দেখে তিনি বললেন, এখন ছটা বাজে। ঠিক নটায় আমরা খেতে বসব। সেই বুঝে রান্নাবান্না করবেন। আর ঠিক দশটায় আমরা প্রেতচক্র শুরু করব। এ ছাড়া আর-একটা কথা–এখন থেকে প্রতিটি মুহূর্ত আমরা জুমেলিয়ার কথা ভাবব, ওকে নিয়ে অলোচনা করব। তা হলে ও বুঝতে পারবে, ওকে আমরা আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমি আগে গোটা বাড়িটা একটু ঘুরে দেখে নিই, তারপর ঠিক করব কোন ঘরে বসলে আমাদের কাজের সুবিধে হবে। ব্যস, এবার আপনারা রান্নাঘরে যান। তবে সময়টা মনে রাখবেন–রাত ঠিক দশটায়, কাঁটায়-কাঁটায়।
কাকিমা আর মিতি চলে যেতেই প্রিয়নাথ আমাদের বললেন, তোমরা বাড়িটার ঘুরে-ফিরে বেড়াতে পারো, বই-টই পড়তে পারো, এ-ঘরে টিভি দেখতে পারো–শুধু বাড়ির বাইরে কোথাও যাবে না–এমনকী বাগানেও না। আর শৌনক, তুমি আমার সঙ্গে একটু থাকো, আমাকে হেল্প করো।
প্রিয়নাথ সঙ্গে করে মাঝারি মাপের একটা ব্রিফকেস নিয়ে এসেছিলেন। সেটা দেখে মিতি কী জিগ্যেস করতেই তিনি হেসে বললেন, ওতে ভূত নামানোর সরঞ্জাম আছে। আবার অনেক সময় ভূত তাড়ানোর জিনিসপত্তরও থাকে।
ব্রিফকেসটা হলঘরের একপাশে রাখা ছিল। সেটা হাতে নিয়ে প্রিয়নাথ শৌনকের সঙ্গে বাড়ি পরিদর্শনের কাজে এগোলেন।
ঠিক তখনই এরোপ্লেনের শব্দ শুনতে পেলাম।
শৌনকদের বাগানবাড়িটা এয়ারপোর্টের এত কাছে যে, সবসময়েই এরোপ্লেন ওঠা-নামার বিকট শব্দ শোনা যায়।
বাপ্পাদিত্য হলঘরের একটা খোলা জানলার সামনে বসে ছিল। লক্ষ করলাম, জানলার বাইরেটা এখন অন্ধকার হয়ে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাপ্পা বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখতে চেষ্টা করছে।
তিওয়ারি হলঘরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল। হঠাৎই আমার কাছে এসে বলল, অ্যাই, রঙ্গনকুছ টের পাচ্ছে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, না তো!
ও চাপা গলায় বলল, আমি টের পাচ্ছে। আমি ঘরের ওই কোণটায় গিয়েছিল–ওই আলমারিটার পাশে। তো শুনলাম, কে যেন খুব সলি বলল, রমেশ, আমি তোকে ফোন করব। কী বলব তোকে…একদম স্পষ্ট জুমেলিয়ার গলা। রঙ্গন, ইয়ার, মেরা ডর লগ রহা হ্যায়।
