রোশনলাল বয়েসে মাঝামাঝি। এই দু-নম্বরি পথে ও আছে অনেকদিন। কিন্তু ওর নার্ভাস-প্রকৃতিটা এখনও ওর সঙ্গ ছাড়েনি। গুণের মধ্যে, রোশন ভালো গাড়ি চালায়।
নয়ন বাড়ি ছেড়ে বিয়ে-থা করেছে আজ দশবছর। অনেকদিন টানাপোড়েনের মধ্যে কাটিয়ে অবশেষে ও হাত পেতেছিল আমার কাছে। ক্রমে-ক্রমে একরকম নিরুপায় হয়েই ও আমার সঙ্গে মিশে গেছে। মাঝে-মাঝে তাই দুঃখ করে বলে, ‘আমি মারা গেলে আমার না-খেতে পাওয়া ছেলেমেয়েগুলোকে আর আমার বউটাকে দেখিস।’
নয়নের ধারণা ওর বউ চরিত্র বিক্রি করেছে। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। কারণ ললিতাকে আমি বিয়ের আগেও চিনতাম।
এতদিন একসঙ্গে কাটানোর পর আমাকে চিনতে ওদের আর বাকি নেই। বড়লোক বাবা-মায়ের কোল ছেড়ে কীসের নেশায় যে এ-পথে পা বাড়িয়েছি সে-কথা আজ আর স্পষ্টভাবে মনে পড়ে না। মানুষকে যন্ত্রণা দেওয়া আমার পেশা নয়, নেশা। আমার এ-নেশার কথা ওরা চারজনও জানে। তা হলে দধীচি তালুকদারকে খুন করার জন্যে ওরা কেন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে?
ভেবে দেখলাম, এই চারজনের মধ্যে কোনও একজন প্রতিহিংসা মেটাতে চায়। কারণ? কারণ, হয়তো পঁয়ষট্টি টাকার বিনিময়ে প্রাণহানির ব্যাপারটা সে ঠিক সরল মনে হজম করতে পারছে না, তাই প্রতিবাদে মুখর হয়েছে।
সেই বিশেষ একজনের মুখোশ খোলার নিটোল পরিকল্পনা মনে-মনে ছকে নিয়ে বিছানা ছেড়ে বাইরের ঘরে এলাম।
ওরা চারজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে।
পরাশর মাথা নীচু করে হাতের নখ খুঁটছে। নয়নের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। অবনী মুখ নেড়ে কী যেন চিবোচ্ছে—সম্ভবত চানাচুর। রোশন একদৃষ্টে চেয়ে আছে দেওয়ালে সাঁটা জনপ্রিয় নায়িকার জনপ্রিয় বুকের দিকে।
আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই ওরা চারজন চোখ ফেরাল আমার দিকে। এবং আশ্বস্ত হল। কারণ, আমার হাতে রিভলভার নেই।
একপাশে পড়ে থাকা মোড়াটা টেনে নিয়ে বসলাম। নয়নের দিকে চেয়ে বললাম, ‘নয়ন, তোদের চারজনের একজন আমাকে খুন করতে চাইছে।’
‘সেটা তোর ধারণা—’ ও তাচ্ছিল্যভাবে জবাব দিল।
‘ধারণা, কিন্তু কারেক্ট।’ শীতল স্বরে জবাব দিলাম, ‘যাক সে কথা।…সেই একজনকে আমি আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় দিলাম। তারপর আর কোনও প্রশ্ন কাউকে করব না। হেম বাড়ুয্যেকে তোমরা চেনো। তোমাদের মতো ভেড়ুয়াদের শায়েস্তা করে সে মাথার চুল পাকিয়েছে। সুতরাং সেই একজনকে এই পৃথিবীতে জন্মেছিল বলে রীতিমতো দুঃখ করতে হবে।
কথা শেষ করে ঘর ছেড়ে বেরোতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালাম। ঘুরে তাকিয়ে বললাম, ‘নয়ন, তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু। ললিতাও আমাকে অনেক দিন ধরে চেনে…জানে। ওকে বিধবা করতে হলে আমি নিজেই ভীষণ কষ্ট পাব। বিশ্বাস কর, সত্যি বলছি।’
ডেরা ছেড়ে পা বাড়ালাম রাস্তার দিকে। ডাক্তারখানায় যাব। কারণ, রোশনের অপটু হাতের ব্যান্ডেজ বুকে বেশ যন্ত্রণা দিচ্ছে। মোটামুটি একটা চিকিৎসা করানো দরকার।
যাওয়ার পথে মুচিবাজার পার হতে গিয়ে মনে পড়ল, রথের দিন আমি আর নয়ন বছরের-পর-বছর ধরে ফুটপাথে পাঁপড় ভাঁজা কিনে খেয়েছি। স্কুলেও একসঙ্গে গিয়েছি বেশ কিছুদিন। তারপর…।
কৈশোরের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা মনে পড়ল বলতে ইচ্ছে করে: কৈশোর তোমার মতো গদ্দারি এই দুনিয়ার আর কেউ আমার সঙ্গে করেনি!
প্রায় ঘণ্টা-দুয়েক পর—বেলা বারোটা নাগাদ—টলতে-টলতে ডেরায় ফিরলাম। নয়ন বেঞ্চে বসে খবরের কাগজটা পড়ছিল, আমার দিকে তাকিয়েই চমকে উঠল। কাগজটা ফেলে রেখে ছুটে এল আমার কাছে। আমার অনিশ্চিত ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে থাকা শরীরটাকে জাপটে ধরল! উৎকণ্ঠিত গলায় প্রশ্ন করল, ‘কী রে, হেম? কী হয়েছে তোর?’
আমার গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। নয়নের কাঁধে ডানহাতটা রাখলাম। মাথা ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে বলতে চাইলাম, ‘আমাকে বাঁচা, নয়ন। ওরা আমাকে খুন করতে চাইছে।’ নয়ন নীরবে আমাকে নিয়ে চলল খুপরি-ঘরের দিকে।
বিছানায় শুয়ে করমচা-লাল চোখে চোখ রাখলাম নয়নের চোখে। কাঁপা হাতে ওর ডানহাতটা চেপে ধরলাম। চাপা স্বরে প্রশ্ন করলাম, ‘ওরা কোথায়?’
নয়ন অবাক চোখে আমার মুখের, শরীরের ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়েছিল, বলল, ‘খেতে গেছে—হোটেলে। কিন্তু হেম, কী হয়েছে তোর? মনে হচ্ছে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটে গেছে।’
‘হ্যাঁ, নয়ন। আজ সকালের কেস তো তুই জানিস। রোশনের বেঁধে দেওয়া ব্যান্ডেজ নিয়ে আমি গিয়েছিলাম ডাক্তার পালের কাছে, আরিফ রোডে। সেই ব্যান্ডেজ কেটে নতুন ব্যান্ডেজ করতে গিয়ে তিনি অবাক হয়ে গেছেন। অবাক হয়েছি আমিও। কারণ, ব্যান্ডেজ বাঁধার আগে কেউ—হয়তো রোশনই—আমার কাটা জায়গায় ধুলো আর লোহার মরচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়েছে। ডাক্তার পাল শুধু বললেন, ‘হেমবাবু আর ঘণ্টা পাঁচ-ছয় অপেক্ষা করলেই পারতেন, ডাক্তার খরচটুকু বেঁচে যেত। টিটেনাসের সঙ্গে শ্মশানের যা রিলেশান, তাতে শেষ নিঃশ্বাসটুকুও ঠিকমতো ফেলার আর টাইম পেতেন না।” টিটেনাস টক্সয়েড নিয়ে, নতুন ব্যান্ডেজ বেঁধে, ফিরে আসতে-আসতে শুধু একটা কথাই আমার মাথায় ঘুরছিল—অবনী, পরাশর, রোশন—ওদের তিনজনের একজন আমাকে খুন করতে চায়। কে বল তো?’
আমার আগ্রহে ফেটে পড়া মুখের দিকে তাকিয়ে নয়ন বিহ্বলভাবে মাথা নাড়ল ‘জানি না। তবে এখনও আমার মনে হচ্ছে তুই কোথায় একটা ভুল করছিস।’
