দধীচি সংবাদ (নভেলেট)
আমার হাতে ধরা কিম্ভূতকিমাকার বস্তুটার দিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কিম্ভূতকিমাকার লোকটা। গলার কণ্ঠাকে অতিকষ্টে কয়েকবার ওঠানামা করিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ওটা কী?’
‘ঘূর্ণিকা।’ শান্ত স্বরে জবাব দিলাম।
‘ঘূ-ঘূ-উ-উর্ণিকা? হতভম্ভ সুরে সে বলে উঠল। তার কপালের কাটা দাগটা বারকয়েক কেঁপে উঠল।
বললাম, ‘বিলিতি ভাষায় যাকে বলে রিভলভার—।’
‘ও—’ সে যেন এবার আশ্বস্ত হল ‘আমি ভেবেছিলাম কী না কী।’
এবার অবাক হলাম আমি। বাংলা শব্দে ভয় পেয়ে তার ইংরেজি অনুবাদে আশ্বস্ত হয় এরকম লোক আমি অন্তত প্রথম দেখলাম। আমার রিভলভারটা সাধারণত কাপড়ের সরু প্যাড দিয়ে সর্বদা জড়ানো থাকে। তাতে শব্দও কম হয়, এবং আঙুলের ছাপটাপের বালাই থাকে না। সেইজন্যেই হয়তো লোকটা মালটাকে প্রথমে চিনতে পারেনি। এখন পারছে।
রিভলভারটা তাক করে ধীরে-ধীরে প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা, বলুন তো, এমন কোনও কারণ কি আপনার জানা আছে, যার জন্যে আমি আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেই এখান থেকে চলে যাব?’
‘আছে—আমি বাঁচতে চাই।’ ঢোক গিলে সে বলল।
হাসলাম ‘মানছি। কিন্তু আমিও যে বাঁচতে চাই—পুলিশের হাত থেকে। সুতরাং, আমার জন্যে আপনাকে প্রাণ দিতে হচ্ছে বলে দুঃখিত। জানেন, দেবরাজ ইন্দ্রের অনুরোধে দধীচি মুনিও—।’
‘আ—আমার নামও দধীচি—তালুকদার!’ ভয়ে-ভয়ে তড়িঘড়ি বলে উঠল লোকটা।
‘শুনে বড়ই প্রীত হলাম। কারণ, ”দধীচির তনুত্যাগ” কবিতাটাও আমারই লেখা। আমার নাম কবি শ্রীহেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়—’ এবং গুলি করলাম।
তারপর ঝুঁকে পড়ে তুলে নিলাম টাকার থলেটা।
বাইরে আসতেই অন্ধকারের আড়াল থেকে ছায়ার মতো বেরিয়ে এল ওরা চারজন। অবনী, নয়ন, পরাশর এবং রোশনলাল। আমি রিভলভার পকেটস্থ করে টাকার থলেটাকে হাতস্থ করে দোকানের দরজা থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ওদের প্রতীক্ষায় রইলাম। ওরা সর্তক দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাতে-তাকাতে, আমার কাছে এগিয়ে এল। চাপা গলায় প্রশ্ন করল রোশন, ‘হেমদা, (আমার নাম সত্যিই হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়—বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন) কোনও গোলমাল হয়নি তো?’
‘না। গাড়ি কোথায়?’
‘পাশের গলিতে।’
‘চলো।’ বলে আমি পা চালালাম। আমাকে অনুসরণ করল ওরা চারজন। যেতে-যেতে আড়চোখে একবার ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, নয়ন আর পরাশর একটু যেন বিহ্বল দৃষ্টিতেই ‘তালুকদার স্টোর্স’ দোকানটার দিকে চেয়ে আছে।
কালো অস্টিনটার কাছে পৌঁছে বহুদিনের অভ্যস্ত ভঙ্গিতে দরজা এক হ্যাঁচকায় খুলে সিটে বসলাম। রোশন বসল গিয়ে ড্রাইভারের আসনে—আমার পাশে। পেছনের সিটে গাদাগাদি করে (কারণ, অবনীর অবনী-প্রমাণ শরীর) অবনী, নয়ন আর পরাশর।
গাড়ি চলতে শুরু করতেই একবার তাকালাম হাতঘড়ির দিকে। সাড়ে ন’টা। বলা বাহুল্য ‘রাত’ সাড়ে ন’টা।
গ্রে স্ট্রিট ধরে কিছুটা এগোনোর পর মুখ খুলল নয়ন, ‘হেম, আশা করি এতক্ষণে তালুকদার স্টোর্সের ভেতরের কেস জানার অধিকার আমরা পেয়েছি?’
এখানে বলা প্রয়োজন নয়ন আমার চেয়ে বয়েসে বড় না হলেও ছোট নয়। আমাকে ও নাম ধরেই ডাকে। লেখাপড়া এককালে করেছিল—করেছিল প্রেম এবং বিয়েও। তার পরিণতি সন্তান এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন। আমার সঙ্গে ওর পরিচয় ছোটবেলা থেকে। একই পাড়ায়—দাসপাড়ায়—আমরা মানুষ। নয়ন খারাপ লাইনে এলেও নীতিবাগীশ চরিত্রের দশ পার্সেন্ট এখনও ছাড়তে পারেনি। নিজেকে এখনও ও সমাজের স্বাভবিক একজন মানুষ বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নয়নের কথায় ঘুরে ওর দিকে তাকালাম। টাকার থলেটা ছুড়ে দিলাম ওর কোলে। অন্ধকারে ওর চোখ দুটো যেন জ্বলছে। অন্যান্য অবয়ব অস্পষ্ট।
বললাম, ‘এটাই হল কেস।’
তারপর পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে তুলে ধরে বললাম, ‘আর এটা হল শুট-কেস। মানে, গুড়ুম-গুড়ুম।’
গাড়ির স্টিয়ারিং-এ রোশনলালের হাত কেঁপে উঠল। একটা অস্ফুট শব্দ ভেসে এল পেছনের সিট থেকে।
নয়ন চুপ।
আমি মনে-মনে হাসলাম।
শোভাবাজার এলাকায় আজ রাতে আমরা তিনটে কাজ করেছি। প্রথম দুটো বড় কাজ—বড় দোকানে। শেষেরটা, অর্থাৎ ‘তালুকদার স্টোর্স’-এর কাজটা, বলতে গেলে হঠাৎই ঘটে গেছে। কারণ, মদনমোহনতলার চিলড্রেন পার্কের পাশ দিয়ে আমরা যখন সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে পড়ছিলাম, তখনই আমার নজরে পড়েছে টিমটিমে আলো জ্বালা দোকানটা। গাড়ি থামাতে বলে আমি নেমে পড়েছি। ওরা চারজন তখন নীরব অসম্মতি নিয়ে চুপচাপ বসেছিল। তারপর নেহাতই নিয়তির লিখনে দধীচি তালুকদারের তনুত্যাগ এবং কেস ও শুট-কেস-এর জন্ম।
‘এই থলেটায় মাত্র পঁয়ষট্টি টাকা আর কিছু খুচরো পয়সা রয়েছে।’ জানলার কাছে হাত নিয়ে রাস্তার আলোয় গণনা-পর্যায় শেষ করে নয়ন বলল। ভর্ৎসনা আর ব্যঙ্গের ছোঁওয়া ওর গলায়।
আমার চোখ সামনের নির্জন-অন্ধকার ট্রাম রাস্তায়। জবাব দিলাম, ‘কে যেন বলে গিয়েছেন, ”ক্ষুদ্র বলিয়া করিয়ো না অবহেলা”—আগের দুটো আমদানির তুলনায় তালুকদারের তালুক ক্ষুদ্রই বটে—কিন্তু তা বলে—!’
‘হেমদা—!’ চাপা স্বরে গর্জে উঠল পরাশর। হয়তো কী বলতে যাচ্ছিল, বাধা দিলাম ‘পরাশর, আর একটা কথা মুখ দিয়ে বেরোলে জিভ টেনে ছিঁড়ে নেব!’
সবাই আবার চুপ।
