তখনই ওর চোখ পড়ল আমার শুয়ে থাকার বিচিত্র ভঙ্গির ওপর, কালো আলখাল্লার ওপর, টুকটুকে লাল ঠোঁটের ওপর। সুতরাং ও থমকে গেল। রূঢ় স্বরে প্রশ্ন করল, কী হচ্ছে এসব বাড়ির মধ্যে?
আমি ধীরে-ধীরে উঠে বসলাম বিছানার। শমিতা হুস-হুঁস করে বাদুড়টাকে তাড়াতে লাগল।
পোশাকটা কীরকম? পছন্দ হয়?–ওকে প্রশ্ন করলাম।
ও সেই পুরোনো কথাই উচ্চারণ করল, যতসব উদ্ভট আজগুবি চিন্তা।
আমি তরল ভঙ্গিতে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালাম এখনও অবিশ্বাস?–হ্যাঁসলাম ঠোঁট টিপে।
ওই বইটা পড়ে আর সিনেমা দেখে-দেখে তোমার মাথাটা একেবারে গেছে। সব রকম গাঁজাখুরি ব্যাপার বিশ্বাস করতে শুরু করেছ।
কথা বলতে-বলতে ও অন্ধকারের মধ্যেই ব্ৰস্তপদে এগিয়ে চলল আলোর সুইচের দিকে। এবং কয়েক পা গিয়েই হোঁচট লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। হাড়তে-হাতড়ে এই পতনের কারণ অনুভব করতে গিয়ে ওর মুখে ফুটে উঠল অন্ধ আতঙ্কের ছাপ, বিস্ময়ের জোয়ার, অনিশ্চয়তার মেঘ।
এ কী? কী এটা? শমিতার স্বর আমার অচেনা লাগছে।
আমি বিছানার পাশে দাঁড়িয়েই জবাব দিলাম, মানুষ–আমার বন্ধু অভিজিৎ সান্যাল।
চকিতে উঠে দাঁড়াল শমিতা : কী হয়েছে ওঁর? উনি পড়ে আছেন কেন?
আমি ধীরে ধীরে পা ফেলে শমিতার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ফিশফিশ করে বললাম, এখনও অবিশ্বাস, শমিতা? নিজের স্বামীকে অবিশ্বাস?
শমিতা পাগলামো ছাড়ো বলতেই আমি ওর দুকাঁধে হাত রাখলাম আলতো করে। বললাম, পাগলামো?
তারপর ওর মুখের কাছে মুখ নামিয়ে নিঃশব্দে হাসলাম।
বাদুড়ের কালো ছায়াটা সারা ঘরময় ভেসে বেড়াচ্ছে। মোমবাতির আলো কমে এসেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার দেখতে অসুবিধে হল না। অনুভবে ভুল হল না।
আমার দু-হাতের মধ্যে শমিতার শরীরটা প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠল। ওর আতঙ্কে ভেজা চোখের চকচকে তারায় আমায় মুখের প্রতিবিম্ব কেঁপে উঠল। কেঁপে উঠল আমার ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁট, এবং সেইসঙ্গে ভেসে উঠল আমার ঝকঝকে শূদন্তের ধারালো নির্মোঘ প্রতিবিম্ব।
শমিতার সরব সম্মতি না পেলেও ওর অভিব্যক্তি আমার এতদিনকার প্রশ্নের (এখন বিশ্বাস করো, শমিতাঃ) জবাব দিয়ে গেল।
আমাদের পরস্পরের ব্যবধান আরও কমে আসতেই বাদুড়ের ভাসমান ছায়াটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
কারণ, প্রদীপ (প্রকৃতপক্ষে, মোমবাতি) নিভিয়া গেল।
.
(অরুণাভ দত্তগুপ্তকে এই পার্থিব পরিবেশে আর দেখা যায়নি। তবে একটা ছোট্ট কাগজে তিনি তাঁর শেষ ইচ্ছের কথা প্রকাশ করে গেছেন। তাতে তাঁর ট্রাসিলভ্যানিয়া যাত্রার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এর বেশি আর কিছু জানা যায়নি।)
