অবশ্য যতই নতুন-নতুন জেনারেশান আসবে গড় আয়ু ধীরে ধীরে ততই বাড়বে। কারণ মানুষ ক্রমশ আরও বেশি করে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবে পরিবেশের সঙ্গে।
কিন্তু বাবা, গাছপালা, পাখি, এসব…।
ও, হ্যাঁ। বিজ্ঞানীরা মানুষের সমস্যার সমাধান করে দিলেন বটে, কিন্তু গাছপালা, ফুল-ফল, পাখি, কীটপতঙ্গ, এসব বাঁচিয়ে রাখতে পারলেন না। একে-একে সব মরুভূমি হয়ে যেতে লাগল। মুছে যেতে লাগল প্রকৃতির সৌন্দর্য।
চিকু পলিথিনের প্যাকেটে মোড়া শুকনো গোলাপটার কথা ভাবছিল। প্রকৃতির সৌন্দর্য কবে মুছে গেছে কে জানে! শুধু স্মৃতি রয়ে গেছে। ও বলল, সেইজন্যেই নকল গাছপালা-পাখি তৈরি করে দিলেন বিজ্ঞানীরা?
হ্যাঁ। না তৈরি করলে আমাদের অসুবিধে হচ্ছিল। প্রকৃতির সৌন্দর্য না থাকায় মানুষের মন খারাপ হচ্ছিল, মনটা খিটখিটে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল, ফলে মানুষের কাজ করার ক্ষমতাও কমে যাচ্ছিল। তাই মনোবিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিলেন, মানুষের মন ভালো রাখতে, মনে আনন্দ-ফুর্তি বজায় রাখতে, নকল প্রকৃতি তৈরি করা হোক। নইলে দেশের উন্নতির কোনও আশা নেই। তখন হাজার-হাজার বিজ্ঞানী বছরের পর বছর পরিশ্রম করে তৈরি করলেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য । পরিবেশ ক্রমশ গাঢ় ঘোলাটে হয়ে ওঠায় সূর্যের আলো নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল সূর্যকে তো আর দেখাই যেত না। তখন বিকল্প হিসেবে তৈরি হল ভাসমান আলোকপিণ্ড। তুমি তো সবই দেখেছ।
বাবাকে নতুন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। যেন একটা অচেনা লোক বসে আছে চিকুর সামনে। লোকটা বিষাক্ত বাতাসে দিব্যি শ্বাস নিচ্ছে। প্রকৃতি আসল না নকল তা নিয়ে লোকটার কোনও মাথাব্যথা নেই। শুধু বাইরের চেহারাটা ঠিক থাকলেই সে খুশি। আজ যদি চিকু মানুষ না হয়ে একটা রোবট হত তা হলে বাবার বোধহয় কোনও অসুবিধে হত না। শুধু রোবটের চেহারাটা আসল চিকুর মতো হলেই হল!
বাবা এবার ওকে কাছে টেনে নিলেন। আদরের গলায় বললেন, চিকু, এখন বলো তো, তোমাকে পুরোনো দিনের সমস্ত কথা কে বলেছে? তোমার মা বলছিলেন, তুমি নাকি কারও কাছে ওসব কথা শুনে এসেছ? কে বলেছে তোমাকে?
চিকুর শরীরটা কেমন কাঠ হয়ে গেল। একথার উত্তর দিলেই অসুস্থ বুড়ো লোকটা হয়তো বিপদে পড়বে। কিন্তু কেন? ও পালটা প্রশ্ন করল, বাবা যখন সবকিছু আসল ছিল তখনকার মানুষেরা কেউ বেঁচে নেই?
বাবার কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বাবা ধীরে-ধীরে বললেন, বেঁচে থাকা উচিত নয়। এই দূষিত পরিবেশে বেঁচে থাকতে তাদের অসুবিধে হবে। কিন্তু তবুও যে কেউ-কেউ বেঁচে নেই তা নয়। তাদের খুঁজে পেলে বর্তমান সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। তা নইলে তারা পুরোনো দিনের সব গালগল্প শুনিয়ে এখনকার মানুষের মন অকারণে দুর্বল করে তুলবে। সেইজন্যেই তো তোমাকে বলছি, যার কাছে ওসব আজেবাজে কথা শুনেছ সে কে?
চিকু কিছুক্ষণ গুম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, গতকাল সামনের রাস্তায় একজন লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সে কথাগুলো আমাকে বলেই ছুটে পালিয়ে গেল।
বাবার সামনে এই প্রথম মিথ্যে বলল চিকু। ওর মনে হল, ভালো কাজের জন্য মিথ্যে বললে কোনও পাপ নেই।
বাবার চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ল। আনমনাভাবে বললেন, হু, ওরা বেছে-বেছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরই এসব আজগুবি গল্প শোনাচ্ছে।
ডানহাত বাড়িয়ে অভ্যস্ত ক্ষিপ্রতায় বাবা কতকগুলো বোতাম টিপলেন। কী সব দুর্বোধ্য শব্দ উচ্চারণ করলেন মাইক্রোফোনে। তারপর ঠান্ডা গলায় ছেলেকে বললেন, ঠিক আছে। তুমি এখন যাও। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। কারও আজেবাজে কথায় কান দিয়ো না।
চিকু থমথমে মুখে অফিস-ঘর ছেড়ে চলে এল। বুড়ো মানুষটা এখন কেমন আছে সে কথা জানতে ওর মন ছটফট করছিল।
.
সারাদিনে আর মা-বাবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে বাগানে বেরোতে পারেনি চিকু। সুযোগ এল পরদিন ভোরে।
গোলাপ বাগানে এসেই চিকু যেন একটা ধাক্কা খেল। রঙিন আলখাল্লা পরা শরীরটা টান টান হয়ে শুয়ে আছে মাটিতে। শ্বাস-প্রশ্বাসের তালে-তালে কোনওরকম ওঠানামা নেই। মানুষটার বুকের ওপরে পলিথিনের প্যাকেটে মোড়া একটা শুকনো গোলাপ আর কয়েকটা মলিন ফটো। দেখামাত্রই জিনিসগুলো চিনতে পারল চিকু। ও ছুটে আরও কাছে এগিয়ে গেল। বুড়ো মানুষটার হাতে হাত রাখল। কপাল ছুঁয়ে দেখল। বরফের মতো ঠান্ডা। চোখ বোজা। তবু যেন এক চিলতে হাসি লেগে রয়েছে মুখে। সাদা দাড়ি-গোঁফে হিমের ফোঁটা। হিমকণা রয়েছে ফটোগুলোর ওপরে, পলিথিন প্যাকেটের ওপরে। আঁকাবাঁকা লাঠি আর তালি মারা রঙিন পুঁটলি পড়ে আছে একপাশে।
চিকুর গলার ভেতরে ব্যথা করতে লাগল। বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত কষ্ট। বাগানে পাখিরা শিস দিচ্ছিল। মৌমাছি ফুলকে ঘিরে নেচে বেড়াচ্ছিল। কতশত রঙের গোলাপ ফুটে রয়েছে বাগানে। কিন্তু সবকিছুর চেয়ে সুন্দর যেন ওই শুকনো গোলাপ আর পুরোনো ফটোগুলো। তা ছাড়া, বুড়ো মানুষটার আলখাল্লার রংবেরঙের তালিগুলো যেন এক-একটা তাজা ফুল। সেই ফুলের বিছানায় ফুটে রয়েছে পুরোনো দিনের আসল প্রকৃতির সজীব ছবি। রাখাল ভোরবেলা যাচ্ছে গরু চরাতে। কুলকুল করে বয়ে যাওয়া নদী। নদীর তীরে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আকাশে নানা রঙের মেঘ। ছেলেমেয়েরা পার্কে ছুটোছুটি করে খেলা করছে। বাগানে রংবেরঙের ফুলের উৎসব। চিত্র-বিচিত্র কত পাখি।
