টিভির পিছনের ঢাকনাটা খুলে স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে কিছুক্ষণ কীসব দেখল। চন্দ্রাণী টিভির পাশে দাঁড়িয়ে মদনের কাজ দেখছিল আর বিড়বিড় করে বলছিল, সুইচ অন করতেই ফ্ল্যাশ-ট্যাশ হয়ে একেবারে সব ফিউজ হয়ে গিয়েছিল। কে জানে এখন কত খরচ হবে…।
আপনার কোনও চিন্তা নেই, বউদি..যতটা কমে হয় করে দেব। বিজ্ঞের মতন টিভির ভেতরটা দেখতে-দেখতে মদন বলল।
তারপর হঠাৎই ওর হাত থেকে ক্রু-ড্রাইভারটা পড়ে গেল মেঝেতে।
বউদি, স্ক্রু-ড্রাইভারটা একটু তুলে দিন না…।
মদনের অনুরোধে চন্দ্রাণী ঝুঁকে পড়ল মেঝের ওপর। হাত বাড়িয়ে স্ক্রু-ড্রাইভারটা তুলতে গেল।
স্টেন মদন চট করে টিভির একদিকে চলে এল। পকেট থেকে রিভলভার বের করে টিভির অন্যদিকে ঝুঁকে-পড়া চন্দ্রাণীর মাথায় নল একেবারে ঠেকিয়ে গুলি করল।
ফট করে একটা চাপা শব্দ হল।
টিভির পিছনের দেওয়ালটা বিচ্ছিরিরকম লাল হয়ে গেল। চন্দ্রাণীর জ্ঞান, অহংকার, আর আই. কিউ. ছত্রখান হয়ে দেওয়ালে লেপটে গেল। ও টু শব্দটি করার সময় পেল না।
টিভির আড়াল থাকায় মদনের গায়ে রক্ত ছিটকে এসে লাগেনি। লাগলেও কোনও ক্ষতি ছিল না, কারণ, ওর ব্রিফকেসে একই রঙের আর-এক সেট জামা প্যান্ট ছিল। মদন পেশাদার খুনি। ও-ও নিজের মতো করে ছক কষতে জানে।
রিভলভারটা পকেটে ঢুকিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গে মদন অবাক হয়ে গেল।
একটা ভারী খিল হাতে দেবপ্রিয় কখন যেন ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। মদন অবাক হয়ে কিছু একটা বোধহয় বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই দেবপ্রিয় খিলটা সপাটে মদনের মাথায় বসিয়ে দিয়েছে।
মদন টাল খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।
দেবপ্রিয় পাগলের মতো মদনের মাথা লক্ষ্য করে খিল চালাতে লাগল। একবার… দুবার…তিনবার…চারবার…।
দেবপ্রিয় যখন থামল তখন মদনের মাথাটা থেঁতলে যাওয়া কালোজামের মতো দেখাচ্ছিল।
খিলটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে চটপট কাজ শুরু করে দিল দেবপ্রিয়।
সাবধানে মদনের পকেট হাতড়ে মোবাইল ফোনটা বের করে নিল। ফোনের পিছনটা খুলে সিম কার্ডটা টেনে খুলল। তারপর সেটা টক করে মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে লাগল। ফোনটা ঠিকঠাক করে লাগিয়ে আবার ঢুকিয়ে দিল মদনের পকেটে।
মুখ নাড়তে নাড়তেই টিভির পাশে রাখা একটা ছোট টি-টেবিলের দিকে গেল দেবপ্রিয়। টেবিলে ওর লেখা চিরকুটটা রাখা ছিল।
সেটা তুলে নিয়ে একবার দেখল। শেষের দুটো লাইন মিহি গলায় ব্যঙ্গ করে পড়ল : .বাড়ি ফিরে কথা হবে। লাভ ইউ। তারপর চিরকুটটাও মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে লাগল।
যাক, ছকের নটা ধাপ শেষ! হাঁফ ছাড়ল দেবপ্রিয়। এরপর ললনার সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলা আর চন্দ্রাণীর সবরকম সম্পত্তি ওর মা-বাবাকে নিঃশর্ত গিট করে দেওয়া। এই দুটো ধাপ তেমন কঠিন নয়।
খুনের ছকের কয়েকটা খুঁটি দেবপ্রিয় ইচ্ছে করেই একটু নতুনভাবে সাজিয়েছিল। স্টেন মদনের বেঁচে থাকাটা ওর ঠিক পছন্দ হয়নি। এত কাণ্ড করার পর মদনকে বাঁচিয়ে রাখাটা নিতান্ত বোকামি। তাই…।
চিবোনা কাগজের মণ্ডটা এইবার জোর করে গিলে ফেলল দেবপ্রিয়।
তারপর গলার স্বর দু-রকম করে এক কাল্পনিক পুলিশ ইনস্পেক্টরের সঙ্গে চাপা গলায় কথা বলতে লাগল। আর একইসঙ্গে মদনের জামাকাপড় হাতড়ে চন্দ্রাণীর রঙিন ফটোটা খুঁজতে লাগল। খুঁজতে লাগল মদনকে চিনে ফেলা যায় বা মদনের সঙ্গে ওর যোগাযোগ ধরে ফেলা যায় এমন কোনও কাগজপত্র আছে কি না।
মার্ডারার যখন আপনার ওয়াইফকে গুলি করে তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানার এককোণে শুয়ে ছিলাম। গুলির শব্দ শুনে বেরিয়ে এসে দেখি একটা লোক চন্দ্রাকে গুলি করে পালাচ্ছে। তখন আমার জ্ঞান ছিল না। শোওয়ার ঘরের দরজার পাশ থেকে খিলটা তুলে নিয়ে…। ব্যঙ্গ করে কাঁদতে লাগল দেবপ্রিয়। চন্দ্রাণীর ফটোটা খুঁজে পেল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, কালচার্ড ওয়াইফ, এবার তোমাকে চিবিয়ে খাব।
কথা শেষ করার সঙ্গে-সঙ্গে ফটোটা মুখে পুরে দিয়ে হিংস্রভাবে চিবোতে লাগল দেবপ্রিয়। চিবোতে চিবোতেই কাঁদতে লাগল আর কাল্পনিক ইনস্পেক্টরকে বলতে লাগল, জানেন, আমার জীবনটা একেবারে শেষ হয়ে গেল..সত্যিকারের আত্মীয় বলতে আর কেউ রইল না…কেউ রইল না…।
দেবপ্রিয় ফ্ল্যাটটা যেটুকু গোছগাছ করার করে নিল। তারপর দেওয়াল-ঘড়ির দিকে তাকাল। চন্দ্রাণী খুন হওয়ার পর প্রায় আট মিনিট পার হয়ে গেছে। এইবার চেঁচিয়ে লোক জড়ো করা যেতে পারে।
মুখে রাখা ফটোর পিণ্ডটা গিলে ফেলে সর্বহারা স্বামীর মতো হইচই শুরু করে দিল দেবপ্রিয়।
খুন! খুন! বলে ফ্ল্যাটবাড়ি একেবারে মাথায় তুলল।
ফলে, আধঘণ্টা কি চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ, সব এসে হাজির হল।
দেবপ্রিয় বাইরে কাঁদছিল, তবে ভেতরে-ভেতরে মজা দেখছিল। নিখুঁত খুন করতে পারার অহংকার ওর ভেতরে ফুলে-ফুলে উঠছিল।
*
দেবপ্রিয় জানত না, ওর খুনের ছকে সব ঘুঁটি ঠিকমতো সাজানো হয়নি। তাই ওর খুনটাও নিখুঁত হয়নি।
কারণ, ওর হাতে লেখা চিরকুটটা পাড়ারই একটা দোকান থেকে স্টেন মদন ফোটোকপি করে নিয়েছিল। তারপর সেই কপিটা দেবপ্রিয়র লেটার বক্সে রেখে ওপরে উঠে এসেছিল। ভেবেছিল, খুনের কাজ সেরে ফেরার পথে ওটা নিয়ে যাবে। মদন পেশাদার খুনি। সেইজন্যই একটা অস্ত্র ও হাতে রাখতে চেয়েছিল। দরকার হলে যাতে দেবপ্রিয়র বিরুদ্ধে সেটা ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সেটা মদন আর হাতে পায়নি। কারণ, দেবপ্রিয়র লেটার বক্সের অন্ধকার এককোণে চিরকুটের জেরক্স কপিটা পুলিশের জন্য অপেক্ষা করছিল।
