মদনকে দেবপ্রিয় নিজের নাম বলেনি। ওদের আলাপ-পরিচয় যত কম হয় ততই ভালো। তাতে ধরা পড়ার ভয় কম। খুনের দিন সকালে মদন ওর নাম জানতে পারবে–তার আগে নয়।
কিন্তু আপনি ফোন করলে বুঝব কেমন করে? মদন জানতে চাইল।
আমি ফোন করে প্রথমেই বলব, চন্দ্রাণী বলছি। তাতে আপনি বুঝে নেবেন। আর কবে, কখন কাজটা সারতে হবে সেটা আমি কাজের দিন সকালে আপনাকে জানাব। এসবই সেফটির জন্যে। বাকি কুড়ি হাজার টাকাও আপনি সেদিনই পেয়ে যাবেন–তবে কীভাবে পাবেন সেটা এখনই বলছি না।
মদন হাসল। বলল, ডিউ বিশ হাজার টাকা নিয়ে কোনও পরেনি আমার নেই। আমার টাকা কেউ চোট করতে পারে না…তাহলে সে নিজেই চোট হয়ে খাল্লাস হয়ে যাবে।
দেবপ্রিয় কাজ সেরে বাড়ি ফিরে এল। গলা ছেড়ে হিন্দি গান গাইতে গাইতে ফ্ল্যাটে ঢুকল।
চন্দ্রাণী ওর হেঁড়ে গলার গান শুনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, আনকাম্ফার্ড।
রাতে বিছানায় শুয়ে ক্রিকেটারদের ক্যাচ প্র্যাকটিসের মতো খুনের ছকটাকে নিয়ে অন্ধকারে লোফালুফি করতে লাগল দেবপ্রিয়। ওর ভেতরে একটা খুশির তুবড়ি জ্বলছিল।
সারা রাত ধরে খুনের ছকের প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখল দেবপ্রিয়। নাঃ, কোথাও কোনও ফঁক নেই। সব খুঁটি ঠিক-ঠিক জায়গাতেই বসানো আছে।
দেবপ্রিয়র ছকের ধাপগুলো এইরকম :
১. চন্দ্রাণীকে খুন করার জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
২. ধীরে-ধীরে, বেশ সময় নিয়ে, পঞ্চাশ হাজার টাকা গোপনে জমানো। টাকাটাকে ধীরেসুস্থে নানান জায়গা থেকে হাজার টাকার নোটে বদলে নেওয়া। এতে টাকা দেওয়া-নেওয়ার সুবিধে হবে।
৩. একজন ভাড়াটে খুনিকে কাজের দায়িত্ব দেওয়া। সঙ্গে চন্দ্রাণীর রঙিন ফটো এবং কম্পিউটারে ছাপানো ফ্ল্যাটের ঠিকানা।
সতর্কতাঃ খুনিকে ঠিক করতে হবে বেশ দুরের কোনও এলাকা থেকে। খুনির সঙ্গে দেখা করার সময় হালকা ছদ্মবেশ–যেমন, সানগ্লাস ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে। খুনির সঙ্গে একবারের বেশি দেখা করা ঠিক হবে না। সব যোগাযোগ ফোনে সারতে হবে। ফ্ল্যাটের ঠিকানাটা যে-কোনও একটা কম্পিউটার সেন্টার থেকে অন্যান্য বাজে ঠিকানার সঙ্গে ছাপিয়ে নিতে হবে। তাতে হাতের লেখা মিলিয়ে পুলিশ তদন্তে এগোতে পারবে না।
৪. খুনের দিনক্ষণ ঠিক করার পর তার দু-দিন কি তিনদিন আগে ঘরের রঙিন টিভিটা খারাপ করে দিতে হবে।
৫. পাড়ার এমন একটা ইলেকট্রিকের দোকানে খবর দিতে হবে, যার বেশ গাফিলতি আছে। সাতবার কি আটবার তাগাদা না-দিলে মিস্তিরি পাঠায় না।
৬. খুনের দিনটা কাজের দিন হিসাবে বেছে নেওয়া হবে–যাতে অফিস-কাছারি সব খোলা থাকে। সেদিন বেলা বারোটার সময় ভাড়াটে খুনিকে ফ্ল্যাটে আসতে বলবে।
৭. খুনি টিভি সারানোর মিস্তিরি সেজে বাড়িতে ঢুকবে। একতলায় সিঁড়ির নীচে দেবপ্রিয়দের নাম লেখা লেটার বক্সে একটা চিরকুট রাখা থাকবে। চিরকুটে চন্দ্রাণীর নামে একটা ছোট্ট চিঠি লিখবে দেবপ্রিয়। যার সারমর্ম হল, টিভি সারানোর মিস্তিরি যাচ্ছে–ওকে টিভিটা সারাতে দিয়ো। টাকাপয়সা কিছু দিয়ো না দেওয়ার আমি দিয়ে দেব। চিঠির ওপরে ইলেকট্রিকের দোকানের নাম ও মালিকের নাম লেখা থাকবে–যাতে খুনি নাম দুটো জানতে পারে, চন্দ্রাণী আচমকা জিগ্যেস করলে ঠিক ঠিক জবাব দিতে পারে।
৮. লেটার বক্স থেকে চিরকুটটা নিয়ে খুনি দেবপ্রিয়দের ফ্ল্যাটে যাবে। কাজ শেষ করে চিরকুটটা মুখে পুরে স্রেফ গিলে ফেলবে–অথবা, লেটার বক্সে রেখেই চলে যাবে। দেবপ্রিয় পরে ওটা সরিয়ে নেবে।
সতর্কতাঃ চিরকুটটা যাতে কিছুতেই পুলিশের হাতে না-পড়ে সেটা সুনিশ্চিত করতে হবে। ওতে দেবপ্রিয়র হাতের লেখা থাকবে। তা হলেই জানা যাবে মিস্তিরি পাঠানোর ব্যাপারটা মিথ্যে। আর খুনির সঙ্গে দেবপ্রিয়র যোগাযোগের ব্যাপারটা ধরা পড়ে যাবে।
৯. চন্দ্রাণীর খুনটা নিশ্চিত করতে বড়জোর দুটো গুলি ব্যবহার করা যেতে পারে। গুলির শব্দ চাপা দেওয়ার জন্য সাইলেন্সার অথবা বালিশ কাজে লাগানো যেতে পারে। ব্যাপারটা ফোনে খুনির সঙ্গে আলোচনা করে নিতে হবে।
সাড়ে বারোটা নাগাদ খুনিকে মোবাইলে ফোন করবে দেবপ্রিয়। যখন জানবে কাজ শেষ, তখন খুনিকে বলবে মোবাইল ফোনের সিম কার্ডটা ফেলে দিয়ে নতুন একটা সিম কার্ড ভরে নিতে। তখনই ও জেনে নেবে, খুনির বাকি টাকাটা কোনও মিলম্যানের মারফত কবে কখন খুনিকে পৌঁছে দিতে হবে।
সতর্কতাঃ সিম কার্ড পালটানোর ব্যাপারটা বেশ জরুরি। দরকার হলে একাজের জন্য খুনিকে বাড়তি দু-হাজার টাকা অফার করা যেতে পারে।
১০. চন্দ্রাণীকে খুন করানোর অন্তত একমাস আগে থেকেই ললনার সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিতে হবে। খুনের পর কমপক্ষে ছ-মাস ললনার সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলবে দেবপ্রিয়। তারপর ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে।
১১. চন্দ্রাণী খুন হওয়ার পর পুলিশ যথারীতি দেবপ্রিয়কে সন্দেহ করবে এবং পাগলা কুকুরের মতো খুনের মোটিভ খুঁজে বেড়াবে। সেইজন্যই দেবপ্রিয় শ্রদ্ধশান্তি চুকে যাওয়ার পর চন্দ্রাণীর স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি কোর্টের কাগজ তৈরি করে চন্দ্রাণীর মা-বাবাকে গিফ্ট করে দেবে। তাহলে পুলিশ কিছুতেই আঁচ করতে পারবে না, চন্দ্রাণীর আন্ডারে-আন্ডারে থেকে মানসিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তি থেকেই দেবপ্রিয় চন্দ্রাণীকে খুন করার ছক কষেছে। অর্থাৎ, ওরা কোনও মোটিভ খুঁজে পাবে না।
