চোখ বুজেই জিশান শানুকে দেখতে পেল। বাচ্চাটা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক নতুন-নতুন কথা শিখে গেছে। ওর হাসিটা এখন আরও শক্তিশালী চুম্বক হয়ে উঠেছে।
শানু ডাকল জিশানকে। যেন স্পষ্ট গলায় বলল, ‘বাপি, চলে এসো।’
‘যাই, সোনা। আর একটু—মাত্র একটা গেম। ব্যস, তারপরই আমি ফিরে যাব।’
‘ওটা তো কিল গেম, বাপি?’
‘হ্যাঁ, বাবা। ওটা কিল গেম। ওটা শেষ করেই আমি তোর কাছে ফিরে যাব…।’
‘তাড়াতাড়ি এসো, বাপি। তোমাকে ছেড়ে আর ভালো লাগছে না।’
‘আমারও…।’
তন্দ্রার মধ্যেই জিশান কেঁদে ফেলল। কতদিন ওর ছোট্ট সোনাকে ও দেখেনি!
লাউড স্পিকারে তখন মণীশের গলা শুনতে পাচ্ছিল জিশান।
‘…এখন জিশান আর জাব্বাকে লেভেল ওয়ান ফিজিক্যাল রিড্রেসাল ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হবে। এক্সট্রিম কেয়ার ট্রিটমেন্ট করা হবে ওদের। সুপার চ্যাম্পিয়ান জিশান সেরে উঠলে ওকে আবার কিল গেম ট্রেনিং-এ ফেলা হবে। পালা করে রেস্ট আর ট্রেনিং দিয়ে দু-মাসের মধ্যে ওকে সুপারফিট করে তোলা হবে। তারপর…।’
জিশান জানে তারপর কী। তারপর ছোট্ট দুটো শব্দ : কিল গেম।
•
স্মার্ট জিমের ন্যানোমিরারের সামনে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন শ্রীধর পাট্টা। ন্যানোস্ট্রাকচারের রিফ্লেকটিং পার্টিকল দিয়ে তৈরি বিশাল আয়নায় নিজেকে দেখছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তির এই আয়নায় শ্রীধরের শরীরের প্রতিটি রোমকূপ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
আয়নায় যা দেখলেন তাতে খুশি হলেন শ্রীধর।
ফরসা ছিপছিপে শরীর। মেয়েলি ঢঙে কথা বললেও শরীরটা মরদের মতো। পটল কিংবা কচি শশার মতো ছোট-ছোট পেশি দিয়ে তৈরি। ফরসা গায়ে লোমের কোনও চিহ্ন নেই। জিমে ব্যায়াম শুরু করার আগে মালটিভাইটালাইজার তেল মেখেছেন বলে চামড়া চকচক করছে। একইসঙ্গে চকচক করছে গলার খাটো চেনটা। অনেকটা ডগ চেনের মতো—প্লাটিনাম আর হিরের ‘পুঁতি’ দিয়ে তৈরি। শ্রীধরের শরীরের একমাত্র অলঙ্কার।
শ্রীধরের চুল তেল মাখানো—টান-টান করে পিছনদিকে আঁচড়ানো। বটগাছের ঝুরির মতো সেই চুল কাঁধ ছুঁয়ে ঝালর হয়ে ঝুলছে।
ডানহাত তুলে চুলের ঝালরে আঙুল বোলালেন শ্রীধর। মনে-মনে ভাবলেন, চুল নয়—সিংহের কেশর। আর লোমহীন এই শরীরটা সিংহ।
ঠোঁটের লাল টুকটুকে লিপস্টিকের দিকে তাকালেন। ফ্লুওরেসেন্ট রং দিয়ে তৈরি বলে তা থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। কয়েকসেকেন্ডের জন্য ঠোঁট ছুঁচলো করলেন। খুঁটিয়ে দেখে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে গেলেন। সিংহের ঠোঁট। যার আড়ালে রয়েছে ধারালো দাঁত।
শ্রীধরের পায়ে কালো রঙের স্কিন-টাইট পলিট্রাউজার। কোমরে দেড়ইঞ্চি চওড়া মেটাল সেগমেন্টেড বেল্ট। মনে হচ্ছিল, শ্রীধর যেন কোনও কমপিটিশান বা গেমের জন্য তৈরি।
আয়নায় নিজের ছবির দিকে স্থির চোখে তাকালেন। তারপর পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে কাল্পনিক শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ের মূকাভিনয় শুরু করলেন।
কার সঙ্গে লড়ছেন শ্রীধর? ওঁর তো কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই! তাই সবসময় ওঁর লড়াই নিজের সঙ্গে। শ্রীধর নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিমুহূর্তে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। আর সেই চেষ্টা করেন বলেই নিউ সিটিতে শ্রীধর পাট্টাই শেষ কথা।
এই ‘শেষ কথা’ মানুষটার শুরুটা হয়েছিল ওল্ড সিটির নোংরা আবর্জনাময় ফুটপাথে। ছোটবেলা থেকেই এই লোকটা নিষ্ঠুর হিংস্র পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য লড়ছিল। রক্তাক্ত অবস্থায় বাড়ি ফেরাটা ওর কাছে ছিল রোজকার ব্যাপার। তাতে অবশ্য কোনও অসুবিধে হয়নি—কারণ, ওর বাড়ি বলতে যা বোঝায় সেরকম কিছু ছিল না। অন্যান্য বাড়িতে সাধারণত আর যারা থাকে—মানে, মা, বাবা, ভাই, বোন—ছেলেটার সেরকমও কেউ ছিল না।
আসলে জন্ম থেকেই ছেলেটা দেখছে ওর মা-বাবা নেই। ওর চারপাশে সব অচেনা মুখ আর অচেনা মানুষ। ওকে সবাই ডাকত পল্টন বলে। সেখান থেকে কীভাবে যেন নামটা ‘পিলটু’ হয়ে গিয়েছিল। দরমা আর পলিথিন শিটের আড়ালে ছেলেটা ‘মানুষ’ হচ্ছিল। ফুটবল খেলায় বাইশটা মানুষ মিলে একটা বলকে যেমন লাথি মারে, ঠিক সেইভাবে বাইশ কিংবা চুয়াল্লিশ পায়ের লাথি খেতে-খেতে ছেলেটা বড় হচ্ছিল। কখনও এ-বাড়িতে ঠাঁই হয় তো কখনও ও-বাড়ি। যদিও ‘বাড়ি’ মানে ছেঁড়া-ফাটা তালিমারা ঝুপড়ি।
ছেলেটার একটাই সম্পদ ছিল : গায়ের রং। ওইরকম টকটকে ফরসা হাতির দাঁতের মতো গায়ের রং ওর সঙ্গী-সাথী আর কারও ছিল না। ওকে সামনে রেখে বড়রা আলোচনা করত, নিশ্চয়ই ও খুব বড় ঘরের ছেলে—বাবা-মায়ের কোল থেকে ছোটবেলায় হারিয়ে গেছে। সেসব শুনে একটা অলীক আকাঙ্ক্ষা ছেলেটার ভেতরে লকলক করে উঠত। ও তখন থেকেই বুঝত ‘বড় ঘর’ মানে বড়লোক। আর বড়লোক মানে বড় ক্ষমতা। সেই বড় ক্ষমতা হাতের মুঠোয় পাওয়ার জন্য ছেলেটা ভেতরে-ভেতরে নেড়ি কুকুরের মতো জিভ বের করে লোভে হাঁপাত।
.
০৯.
পয়সা রোজগার করার জন্য ছেলেটা তখন নিয়মিত চুরি করত, পকেট মারত, আর কখনও-কখনও ভিক্ষে করত। একইসঙ্গে ও বুঝত, এইভাবে চললে এককোটি বছর পরেও ওর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। ততদিনে ওর লোভের জিভ কয়েকশো মাইল লম্বা হয়ে যাবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবে না।
অন্য কেউ হলে হয়তো হতাশ হয়ে পড়ত, হাল ছেড়ে দিত। কিন্তু পিলটু অন্য ধাতুতে গড়া। ও প্রতি মুহূর্তে একটা সুযোগ খুঁজছিল। আর লড়াই করে বাঁচছিল।
