জিশান রিমিয়ার পাশে-পাশে হাঁটছিল। চাপা গলায় বলল, ‘চিফ ইনস্ট্রাকটর লোকটা সুবিধের নয়।’
‘হুঁ।’ ছোট্ট করে জবাব দিল রূপকথা।
‘আপনি ম্যারেড?’ কৌতূহল চাপতে না পেরে জিগ্যেস করল।
‘হুঁ—।’
‘চিফ কীসব ফিলিং-টিলিং-এর কথা বলছিলেন…।’
রূপকথা ইশারায় জিশানকে চুপ করতে বলল। আঙুল তুলে দেখাল সামনেই ফুড প্লাজা। বিল্ডিং-এর গায়ে সিন্ডিকেটের লোগো। সুদৃশ্য গেটের সামনে পিস ফোর্সের দুজন গার্ড দাঁড়িয়ে।
রূপকথা এগিয়ে গিয়ে একজন গার্ডের সঙ্গে কথা বলল। তারপর জিশানকে ইশারায় কাছে ডেকে দরজার স্লটে নিজের স্মার্ট কার্ডটা সোয়াইপ করল।
ওরা ভেতরে ঢুকল।
ঢুকেই একটা ধাক্কা খেল জিশান। ভেতরের চেহারাটা যেমন বিচিত্র তেমনই সুন্দর। প্লাজার মেঝেটা ডানদিক থেকে সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ক্রমশ ওপরে উঠে গেছে।
জিশান গুনল। পাঁচটা পাক—পাঁচটা লেয়ার। লেয়ারের নতি কোণ এতই কম যে, সিঁড়ির ধাপের কোনও দরকার হয়নি।
প্লাজার দু-দিকের দেওয়াল স্বচ্ছ প্লাস্টিক কিংবা কাচ দিয়ে তৈরি। সেটার রং সামান্য নীল হওয়ায় রোদের তেজ কমানোর কাজ যেমন হয়েছে, তেমনই ভেতরে একটা নীল মায়া ছড়িয়ে দেওয়া গেছে। তার সঙ্গে রং মিলিয়ে ভেতরের অন্যান্য আলোও নীল।
প্লাজার মাপের তুলনায় লোকজন অনেক কম। তাদের কথাবার্তা এমনই নিচু গলায় চলছে যে, সবমিলিয়ে কোনও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে না। শুধু সাউন্ড সিস্টেমে চাপা মিউজিক বেজে চলেছে। চারদিকে একটা শান্ত আনন্দের ভাব।
রূপকথা জিশানের হাত ধরল। নিচু গলায় বলল, ‘এখানে নানান জায়গায় স্পাই-ক্যামেরা লাগানো আছে। তা ছাড়া প্লেইন ড্রেসে গার্ডরাও ঘোরাফেরা করে। নজর রাখে যে, সিন্ডিকেটের এগেইনস্টে কোনও ছক কষা হচ্ছে কি না। সো বি কেয়ারফুল। আসুন—।’
সেকেন্ড লেয়ারের একটা টেবিলে মুখোমুখি বসল ওরা। চিলিং এসিতে জিশানের একটু শীত-শীত করছিল।
জিশান অবাক হয়ে দেখল, ওদের টেবিলে একটা চৌকোনা অংশে স্নিগ্ধ আলো জ্বলছে। সেখানে অনেকগুলো ব্যাক লাইটেড ছোট-ছোট খোপ—সেই খোপে আই-ফোনের রঙিন আইকনের মতো এক-একটা খাবারের ছবি। ছবির নীচে খাবারের নাম লেখা।
ধোঁয়া ওঠা কফির কাপের ছবিতে আঙুল ছোঁয়াল রূপকথা—দুবার। বলল, ‘অবাক হবেন না। এটাই অর্ডার দেওয়ার সিস্টেম। হাইটেক সব ব্যাপার। এই প্লাজায় যখন যে-যে আইটেম অ্যাভেইলেবল তখন সেইসব খাবারের নাম আর ছবি এই টাচস্ক্রিন অ্যাকটিভেটেড আইকন মেট্রিক্স-এ ফুটে ওঠে। আইকনগুলো টাইম টু টাইম আপডেটেড হয়।’
‘এবার স্টার্ট করুন।’ বলল জিশান, ‘গিভ অ্যান্ড টেক।’
‘না, প্রথমে আপনি। বিকজ য়ু স্টার্টেড দ্য হোল গেম। বলুন, কী নাম রেখেছেন আমার—।’
দাঁত দিয়ে ঠোঁটের কোণ কামড়াল জিশান। একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘বলছি। তবে আগেই বলে রাখছি, ব্যাপারটা স্পোর্টিংলি নেবেন। ও.কে.?’
‘ও.কে.।’ হাসল।
‘নাম রেখেছি রূপকথা। নামটা খারাপ?’
রিমিয়া অদ্ভুত চোখে জিশানের দিকে তাকাল। একটু পরে বিষণ্ণ গলায় বলল, ‘খুব ভালো নাম। আমি সেদিন আপনাকে বলেছিলাম, রূপকথার মধ্যেই মানুষের আসল জীবন লুকিয়ে আছে। আমরা দেখতে চাই না, তাই দেখতে পাই না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : ‘সেইজন্যেই এই নাম দিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ।’
টিপটপ ড্রেস পরা একজন বেয়ারা কফি নিয়ে এল। ট্রে থেকে কফির কাপ নামিয়ে দিল টেবিলে।
ফ্রস্টেড ক্রিস্টালের তৈরি কাপ-প্লেট। তার মধ্যে নীল আর গোলাপি রঙের ছটা।
বেয়ারা চলে যেতেই রূপকথা বলল, ‘অর্কপ্রভও বলত, আমি খুব আজব পাবলিক। সবসময় গল্পের বইয়ের সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে রূপকথার দেশে বাস করি। কোনও বাস্তব বুদ্ধি নেই..। কিন্তু একইরকম দেশে অর্কপ্রভও বাস করত। আমাদের জুটিটা ভারি অদ্ভুত ছিল।
‘কে অর্কপ্রভ?’ কফিতে চুমুক দিয়ে জিশান জিগ্যেস করল। ওর অর্কনিশানের কথা মনে পড়ল—ছেলে শানুর কথা।
‘আমার হাজব্যান্ড—ডেড হাজব্যান্ড।’ মাথা নিচু করল রিমিয়া। ওর কফির কাপটাকে গভীর মনোযোগে পরীক্ষা করতে লাগল। জিশান ওর চোখ দেখতে পাচ্ছিল না।
হঠাৎই কফির কাপের ওপারে জলের ফোঁটা পড়ল।
‘সরি, রিমিয়া। আমি আপনাকে হার্ট করতে চাইনি। আই অ্যাম রিয়েলি সরি।’
মুখ তুলল। হাসছে। কিন্তু চোখের কোণে জলের কণা।
‘আপনার হাজব্যান্ড কবে মারা গেছেন?’
‘বেশিদিন নয়।’ রুমাল বের করে চোখের কোণে চেপে ধরল: ‘অ্যাবাউট ফোর মান্থস…।’ স্কার্টের পকেটে রুমাল রেখে দিল।
‘কী হয়েছিল?’
.
০৬.
জোর করে হাসল রূপকথা। মাথা ঝাঁকিয়ে কফির কাপে চুমুক দিল। জিশানের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, ‘বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না। ও এখানকার কমপিটিশানে নাম দিয়েছিল। হাংরি ডলফিন। গেমটার নাম শুনেছেন তো?’
জিশান মাথা নাড়ল : হ্যাঁ, শুনেছে। শুধু শুনেছে নয়, গেমটার ভিডিয়ো রেকর্ডিংও টিভিতে দেখেছে।
‘…তো সেই গেমটায় হাঙরের পেটে চলে গেল। হাঙরটাকে ডলফিন ভেবে ভুল করল। ব্যস, এন্ড অফ দ্য গেম…।’
কিছুক্ষণ ওরা দুজনেই চুপ করে রইল। শুধু কফির কাপে চুমুকের শব্দ শোনা যেতে লাগল। সাউন্ড সিস্টেমের মিউজিকটাকে দু:খের সুর বলে মনে হচ্ছিল।
ধীরে-ধীরে পুরো গল্পটা শুনল জিশান।
অর্কপ্রভ ওল্ড সিটি থেকে এসেছিল। রিমিয়া তখনও এই অ্যানালগ জিমেই চাকরি করত। সেখানেই অর্কর সঙ্গে আলাপ।
