কথা বলতে-বলতে গার্ড চলে গেল।
কিন্তু জিশানের বুকের ভেতরে ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়ে গেল। যাওয়ার আগে জিশানকে কী বলে গেল ঘুষখোর লোকটা! ‘মনে রেখো, আমাকে জেতানো চাই।’
মিনি বারবার বলছে, ওকে জিততে হবে। এই অসভ্য মরণখেলার একটা স্থায়ী বন্দোবস্ত করতে হবে।
মনোহর সিং চাইছে জিশান জিতুক।
ওকে ঘিরে এতরকম মানুষের এত আশা!
গার্ড বলে গেল, ‘…আমরা সব হেরে যাওয়া পাবলিক…।’ গার্ড চাইছে, এইসব হেরে যাওয়া পাবলিকদের হয়ে জিশান লড়বে—এবং জিতবে।
জিশান ঘাড় ঘুরিয়ে গার্ডকে খুঁজল। ও তখন প্রতিযোগীদের সারির একেবারে পিছনে গিয়ে পজিশন নিয়েছে। কয়েকসেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইল জিশান—যদি একটিবারের জন্য চোখাচোখি হয়।
চোখাচোখি হল। এবং হওয়ামাত্রই জিশান ঠোঁটের কোণে হাসল, আর বাঁ-হাতে ‘থামস আপ’ দেখাল। মনে-মনে বলল, ‘আমি তোমাকে জেতানোর জন্যে শেষ দম পর্যন্ত লড়ব।’
জিশানদের নিয়ে যাওয়া হল লেকের সামনে। ওদের সবার গায়ে কমপিটিশানের চেনা পোশাক : হলদে টি-শার্ট আর কালো বারমুডা। টি-শার্টের বুকে সুপারগেমস কর্পোরেশনের লোগো আর তার নীচে বার কোড।
য়ুনিফর্ম পরা চারজন ‘স্নেক হ্যান্ডলার’-কে দেখতে পেল জিশান। ওদের গায়ে কমলা রঙের জ্যাকেট। জ্যাকেটের পিঠের দিকে ইংরেজিতে লেখা : ‘স্নেক হ্যান্ডলার’। এ ছাড়া মেডিকেল ইউনিটের হুডখোলা সাদা গাড়িও চোখে পড়ল ওর। না, কোনও ব্যবস্থাতেই কোনও ফাঁক নেই।
খেলাটা লাইভ টেলিকাস্টের জন্য টিভি চ্যানেলের ত্রু লেকের চারকোণে আর মাঝামাঝি দুটো জায়গায় যন্ত্রপাতিসমেত পজিশন নিয়েছে। একটা উঁচু ফ্রেমে ক্যামেরা বসিয়ে লেকের টপভিউ নেওয়ার বন্দোবস্তও করা হয়েছে। সব আয়োজনই এমন নিখুঁত যাতে উত্তেজনা ও আনন্দের মাত্রা ঠিকঠাক রেখে খেলার প্রতিটি মুহূর্ত ‘জীবন্তভাবে’ পৌঁছে দেওয়া যায় টিভি দর্শকদের কাছে।
একজন ইনস্ট্রাকটরের নির্দেশে জিশানরা প্রত্যেকে জুতো খুলে ফেলল—যাতে জলের মধ্যে জোরে দৌড়তে সুবিধে হয়। তারপর সাঁতারের প্রতিযোগিতার মতো ওদের পরপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল।
ওদের সামনে একটা ধাতব পাঁচিল—তিনফুট মতো উঁচু। পাঁচিলটা ডিঙোলেই লেক। লেকের জলের রং সাদা, ঘোলাটে। জলে কি মিশিয়েছে কে জানে!
জিশানের ডানদিকে চারজন প্রতিযোগীর পর মনোহর সিং। ও মাঝে-মাঝে উঁকি মেরে জিশানের দিকে দেখছিল। ওর জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছিল জিশানের। ওর কাছে স্নেক রিপেলান্ট অয়েল রয়েছে—মনোহরের কাছে নেই। কিন্তু ওই তেলটা তো পায়ে মাখতে হবে!
হঠাৎই জিশান একজন গার্ডকে ডেকে বলল, ‘আমাকে টয়লেটে যেতে হবে। খুব জোর পেয়ে গেছে।’
গার্ডটার মুখে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। জিগ্যেস করল, ‘ছোট, না বড়?’
‘ছোট।’
‘বাঁচালে—।’ গার্ড ওর কাছে এগিয়ে এল। আঙুল তুলে দেখাল: ‘ওই যে—ওইদিকে।’
জিশান ইশারা লক্ষ করে তাকাল। পনেরো-কুড়ি মিটার দূরে অদ্ভুত ছাঁদের একটা একতলা ঘর।
ও তাড়াতাড়ি পা চালাল সেদিকে।
টয়লেটের দরজায় দুজন গার্ড। ওদের বলে ভেতরে ঢুকল জিশান। ঢুকেই বুঝল বাথরুমটা এয়ারকন্ডিশনড এবং আধুনিক ঢঙে সাজানো। আরামের ব্যবস্থার বহর দেখে ওর তেতো হাসি পেল। তবে আর সময় নষ্ট না করে কোমর থেকে অয়েল পাউচটা বের করে নিল। চটপট পাউচ ছিঁড়ে তেলটা বের করে দু-পায়ে ভালো করে মাখতে লাগল—গোড়ালির গাঁট থেকে হাঁটু পর্যন্ত।
তেল মাখা শেষ হলে ও ছেঁড়া পাউচটা মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিল। এটা এখানে পড়ে থাকা ঠিক নয়। গার্ডদের কারও নজরে পড়ে যেতে পারে।
ওটা লুকোনোর জায়গা খুঁজতে গিয়ে কাচের জানলায় লাগানো ভেনেশিয়ান ব্লাইন্ডের দিকে চোখ গেল জিশানের। তাড়াতাড়ি একটা জানলার কাছে গিয়ে ব্লাইন্ডের প্লাস্টিকের পাতের আড়ালে পাউচটা লুকিয়ে ফেলল।
তখনই ব্লাইন্ড টানার দড়ির দিকে নজর পড়ল ওর। কী ভেবে দুটো জানলা থেকে চটপট দুটো সিনথেটিক দড়ি খুলে নিল। দড়িদুটো দলা পাকিয়ে জাঙ্গিয়ার ভেতরে গুঁজে দিল। ভালো করে তাকিয়ে দেখল, পোশাকের ওপর থেকে দড়ির ব্যাপারটা মোটেই বোঝা যাচ্ছে না। তারপর টয়লেট থেকে বেরিয়েই লেকের দিকে ছুটতে শুরু করল।
সেখানে পৌঁছে দ্যাখে একজন ইনস্ট্রাকটর পোর্টেবল অডিয়ো সিস্টেমে পার্টিসিপ্যান্টদের আই-ডি নম্বর অ্যানাউন্স করে সেটা ল্যাপটপে চেক করে নিচ্ছেন।
জিশান পৌঁছনোর দু-মিনিটের মধ্যেই কমপিটিশান শুরু হয়ে গেল। ওদের সামনের ধাতব পাঁচিলটা নি:শব্দে ঢুকে গেল মেঝেতে। এবং ওরা স্টার্টারের বন্দুকের শব্দ শোনামাত্রই লেকে নেমে পড়ল। দুরন্ত গতিতে ছুটতে শুরু করল।
লেকের দুপাশে দর্শকের ভিড়। তারা এই অদ্ভুত রেস দেখছে আর উত্তেজনায় হইহই করছে। ওদের বেশিরভাগই পিস ফোর্সের গার্ড, সুপারগেমস কর্পোরেশনের স্টাফ, আর বিভিন্ন গেমে নাম দেওয়া সব পার্টিসিপ্যান্ট। নিউ সিটির বাসিন্দারা এখানে নেই। তারা ঘরের কিংবা অফিসের আরামে বসে এই মারাত্মক খেলার লাইভ টেলিকাস্ট দেখছে। যারা এখন দেখার সময় পাচ্ছে না তারা পরে সুবিধেমতো এর ভিডিয়ো রেকর্ডিং ডাউনলোড করে দেখে নেবে।
ওল্ড সিটিতেও এই গেমের লাইভ টেলিকাস্ট দেখছে বহু মানুষ। তাদের বেশিরভাগেরই চোখে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু মিনি টিভির সামনে বসে আছে জিশানের জন্য। আর জিশানকেও জিততে হবে মিনির জন্য। ওই ভয়ংকর শ্মশানের ওই হতভাগ্য মরা মানুষগুলোর জন্য। এবং ওই গার্ডের জন্য।
