জিশানের ভেতরে হঠাৎই যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। এই গেমটায় ও কোয়ালিফাই করবেই। করতে ওকে হবেই।
ও টের পেল, স্নেক লেক গেমটার মোকাবিলার জন্য ও কোন ম্যাজিকে যেন চনমনে হয়ে উঠল।
•
নিয়মমাফিক পার্টিসিপ্যান্টদের স্নেক লেক গেম-এর কম্পিউটার সিমুলেশান দেখানো হল।
কমব্যাট পার্কের মতো এখানেও গেম সাইটের কাছাকাছি গেম কন্ট্রোল রুম বিল্ডিং। সেই বিল্ডিং-এর এয়ারকন্ডিশনড হলে বসে জিশানরা স্নেক লেক গেম-এর সিমুলেশান দেখল।
অগভীর জলের বিস্তীর্ণ আয়তাকার পুকুর। মাপ একশো মিটার বাই তিরিশ মিটার। সেই পুকুরে কিলবিল করে বেড়াচ্ছে ছোট-বড় নানান বিষধর সাপ। সাপগুলো ঠিক কী-কী ধরনের সেগুলো ছবিসমেত বোঝানো হচ্ছিল। সাপগুলোর চলাফেরা, আচরণ, শিকার ধরা বিশদভাবে বোঝানো হচ্ছিল। তিনজন সাপবিশেষজ্ঞ পালা করে সবকিছু ব্যাখ্যা করছিলেন। সাপগুলোর বিষগ্রন্থি, তাদের বিষদাঁতের মাপ ও আকার, বিষের তেজ, ছোবল মারার বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি অত্যন্ত যত্ন আর নিষ্ঠা নিয়ে বোঝাচ্ছিলেন তাঁরা। এবং তারই মাঝে-মাঝে জাম্প কাট করে গেম-এর সিমুলেশানটা দেখানো হচ্ছিল।
জিশানের মনে হল, সাপ নিয়ে কোনও তথ্যচিত্র দেখেও বোধহয় ব্যাপারটা এত ভালো করে বোঝা যেত না।
বিষধর সাপের তালিকায় সাতরকমের সামুদ্রিক সাপের নাম ও ছবি দেখানো হল। সাঁতার কাটার সুবিধের জন্য প্রকৃতি ওদের লেজের দিকটা আচমকা চ্যাপটা করে দিয়েছে—অনেকটা মাছের লেজের মতো। একইসঙ্গে জিশানদের জানানো হল, প্রায় সব সামুদ্রিক সাপই মারাত্মকরকম বিষধর।
সিমুলেশান শেষ হওয়ার পর মিনিটপাঁচেক ধরে চলল প্রশ্নোত্তরের পালা। জানানো হল যে, এই গেম-এর সারভাইভাল ফ্যাক্টর 0.36।
সবশেষে গেম ইনস্ট্রাকটর ঘোষণা করলেন, এই খেলায় প্রাইজ মানি চল্লিশহাজার টাকা।
জিশান ভাবছিল, এরপর বোধহয় ওদের বিল্ডিং-এর বাইরে বেরোতে হবে। সার বেঁধে হাঁটা দিতে হবে স্নেক লেকের দিকে। কিন্তু অডিয়ো সিস্টেমে শোনা গেল একটি বিশেষ ঘোষণা ঃ ‘পার্টিসিপ্যান্টদের এবারে ”ভেনম হাউস” দেখানো হবে। যেহেতু আসল গেম-এর সময় সাপগুলো থাকবে ঘোলাজলের আড়ালে, সেহেতু পার্টিসিপ্যান্টরা সাপগুলোকে দেখতে পাবে না। তাই ”ভেনম হাউস”-এ সেই প্রজাতির সাপগুলো কাচের বাক্সে রাখা আছে—যাতে খেলায় নামার আগে তারা সাপগুলোকে ভালো করে দেখে নিতে পারে। ”ভেনম হাউস” রয়েছে এই বিল্ডিং-এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে…নর্থ-ইস্ট কর্নারে।
‘নাউ স্টার্ট। হলের দরজায় ”ভেনম হাউস”-এর গাইড আপনাদের জন্যে ওয়েট করছে। ”ভেনম হাউস” দেখার জন্যে আপনাদের সময় দেওয়া হল তিরিশমিনিট। তার মানে, কাঁটায়-কাঁটায় এগারোটায় আমরা এই গেম কন্ট্রোল বিল্ডিং-এর মেন গেটে জড়ো হব। তারপর স্টার্ট দেব স্নেক লেকের দিকে। ও. কে., প্রসিড গাইজ…।’
জিশানরা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হলের দরজার দিকে এগোল।
সেখানে একজন গাইড আর পিস ফোর্সের দুজন গার্ড ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। গাইডের গায়ে নীল রঙের স্লিভলেস জ্যাকেট। জ্যাকেটের বুকের দিকটায় প্যাঁচানো একটা সাপের ছবি—ফণা তুলে আছে। আর জ্যাকেটের পিঠের দিকে সাদা ইংরেজি হরফে লেখা ‘ভেনম হাউস’।
গাইডকে অনুসরণ করে জিশানরা সার বেঁধে এগোল। চোরা-দৃষ্টিতে সারির সামনে-পিছনে তাকিয়ে প্রতিযোগীর সংখ্যাটা গুনে নিল জিশান। মোট ষোলোজন। তার মধ্যে মনোহর সিং-ও আছে।
প্রায় পনেরো সেকেন্ড হেঁটে কয়েকটা করিডর বদল করে ওরা ‘ভেনম হাউস’-এ পৌঁছে গেল।
সহজ কথায় বলতে গেলে ব্যাপারটা সাপের চিড়িয়াখানা। আধুনিক ছাঁদে সাজানো বিশাল মাপের ঘর। ঘরের চারদেওয়ালে নানান মাপের কাচের বাক্স। নেমপ্লেট লাগানো সেইসব বাক্সে রাখা আছে জীবন্ত সাপ। যে-সাপগুলো একটু আগেই জিশানরা তথ্যচিত্রে দেখে এসেছে।
কী সাপ নেই এখানে! কেউটে, গোখরো, চন্দ্রবোড়া, শাখামুটি থেকে শুরু করে ব্ল্যাক মাম্বা, ঝুমঝুমি সাপ পর্যন্ত সবই হাজির।
এই সাপগুলোর পাশেই সার বেঁধে রাখা আছে অ্যাকোয়ারিয়াম। তার মধ্যে রয়েছে সমুদ্রের সাপ। একটা সাপের নাম পড়ল জিশান—অলিভ সি স্নেক। সেই নামের পাশে ব্র্যাকেটে লেখা Alpysurus laevis।
জিশানের গা-টা কেমন শিউরে উঠল। মনে হল, সাপগুলো ওর পোশাকের নীচে কিলবিল করছে।
গাইড তখন মেগাফোনে ভরাট গলায় বলছে, ‘…এই সাপগুলোই থাকবে ওই লেকের জলের ভেতরে। আপনারা ভালো করে দেখে নিন কী-কী ধরনের সাপের কামড় আপনাদের বাঁচিয়ে চলতে হবে। অবশ্য রেসের ফিনিশ লাইনের পর এক্সপার্ট মেডিক্যাল ইউনিট হাজির থাকবে। ওরা সাপের কামড় খাওয়া পার্টিসিপ্যান্টদের দেখভাল করবে।’
কাচের বাক্সের ভেতরে সাপগুলো অলসভাবে নড়াচড়া করছিল। আর কতকগুলো সাপ অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে সাঁতার কাটছিল। ওদের আকর্ষণীয় রং মুগ্ধ হয়ে দেখছিল জিশান। আর একইসঙ্গে ভাবছিল, ওই বিচিত্র রঙের আড়ালে রয়েছে মারাত্মক বিষ।
জিশান চোয়াল শক্ত করল। গত কয়েকদিন ধরে বালির ওপরে দৌড় আর জলের ওপরে দৌড় ও কম প্র্যাকটিস করেনি। আজ আসল পরীক্ষায় বোঝা যাবে ওর প্র্যাকটিস ঠিকমতো হয়েছে কি না।
‘ভেনম হাউস’ দেখা শেষ করে এগারোটার দু-মিনিট আগেই গেম কন্ট্রোল বিল্ডিং-এর মেন গেটে ওরা সবাই এসে জড়ো হল। তারপর ঠিক এগারোটা পাঁচে সার বেঁধে হাঁটা দিল স্নেক লেক-এর দিকে। ওদের ষোলোজনকে আগলে নিয়ে চলল চারজন গার্ড। তার মধ্যে সেই বেঁটেমতন গার্ডটাকে দেখতে পেল জিশান। ওর হাতেই ও ঘুষের দশহাজার টাকা তুলে দিয়েছিল।
