ফকিরচাঁদ জিশানের বাহু আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। তবে অবাক চোখ মেলে দৃশ্যটা দেখতে লাগল। বোঝা গেল, এ-দৃশ্য আগে ও দেখেনি।
জিশানের সামনে এক অন্ধকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর। সেই অন্ধকারে হাজার-হাজার মোমবাতি উজ্জ্বল নীল শিখায় জ্বলছে। মোমবাতির মায়াময় নীল আলো আর সুগন্ধী বাতাস জিশানকে মুগ্ধ করে দিল, স্তব্ধ করে দিল।
একজন প্রহরী জিশানের হাত ধরে টান মারল। বলল, ‘চলো, ভেতরে চলো—নেকরোসিটি দেখে তোমার দশহাজার টাকা উশুল করো…।’
ওরা চারজন আলোকমালার দিকে এগিয়ে চলল। জিশান তখনও বুঝতে পারছিল না ফকিরচাঁদ কেন অকারণে কাঁদছে।
বেঁটে গার্ডটি অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিল—বোধহয় কিছু বলতে চাইছিল। ও ওর সঙ্গীর সঙ্গে চাপা গলায় কিছু পরামর্শ করে তারপর হঠাৎই বলল, ‘এখানে চ্যালেঞ্জ গেম খেলতে এসে যে ক’জন পার্টিসিপ্যান্ট মারা গেছে তাদের মাথাপিছু একটা করে মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে।’
জিশান একটা ধাক্কা খেল। এত মোমবাতি! এত পার্টিসিপ্যান্ট মারা গেছে এখানে! ভাবা যায় না।
চারপাশে দেখল গার্ডটি। তারপর পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করল। চাপা হেসে বলল, ‘উফ, ”নো স্মোকিং” নিয়মের ঠেলায় দম আটকে মারা যাওয়ার জোগাড়। সিগারেট খাওয়া বারণ তো সিগারেট বিক্রি বন্ধ করে দে। তা না, ওদিক থেকেও ট্যাক্সের পয়সা লুটবে আর আমাদেরও নেশায় বাঁশ দেবে। ওই শ্রীধর পাট্টা—সালা শুয়োরের বাচ্চা—যত নষ্টের গোড়া…।’
জিশান তাজ্জব হয়ে গেল। এসব কী শুনছে ও! শ্রীধর পাট্টার নামে এই বেপরোয়া গালাগাল! নেশার ঘোরে আসল কথাগুলো কি বেরিয়ে আসছে?
গার্ডটির লম্বা সঙ্গী প্রায় ছুটে গিয়ে ওর মুখে হাত চাপা দিল: ‘এসব কী বলছিস তুই! চুপ—চুপ! কেউ শুনতে পেলেই কেলেঙ্কারি হবে। তুই—।’
এক ঝটকায় সঙ্গীর হাত সরিয়ে দিয়ে বেঁটে গার্ডটি বলল, ‘ছাড় তো! সালা কেলেঙ্কারির নিকুচি করেছে। এরা হাজার-হাজার লোককে কোতল করে মোমবাতি জ্বেলে দিল তাতে কিছু না—আর আমি দুটো সত্যি কথা বললেই দোষ!’
চৌকশ কেতায় প্যাকেটে সিগারেটটা কয়েকবার ঠুকে ঠোঁটে ঝোলাল গার্ড। ছোট্ট ইলেকট্রিক লাইটার বের করে সিগারেট ধরাল। তারপর প্যাকেটটা সামনে বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, ‘আর কেউ ধরাবে?’
ফকিরচাঁদ মাথা নাড়ল : ‘না।’
দ্বিতীয় গার্ড কিছু বলল না।
জিশান বলল, ‘না। ধন্যবাদ। তবে…’ একটু ভেবে আরও যোগ করল: ‘এখানে… মানে, এই কবরস্থানে…সিগারেট খাওয়াটা ঠিক নয়…।’
এ-কথা শুনে প্রথম গার্ডের কী হাসি! হাসতে-হাসতে পেটে হাত চেপে ঝুঁকে পড়ল ও। হাসতেই লাগল।
সঙ্গীর এই পাগলামি দেখে দ্বিতীয় ভয়ে-ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। পিস ফোর্সের কেউ এসব কথা শুনছে না তো—এসব কাণ্ড দেখে ফেলছে না তো!
হাসির দমক থামিয়ে জ্বলন্ত সিগারেটে কষে টান দিল প্রথম। জিশানের গায়ে তাচ্ছিল্যের ঠেলা মেরে বলল, ‘কে বলেছে এটা কবরস্থান? কে বলেছে ওইসব মোমবাতির নীচে ডেডবডি আছে? সব ঢপের কেত্তন। ওগুলো সব ফলস। আসল ডেডবডি আছে এই নকল লোকদেখানো কবরস্থানের পেছনে। সেখানে একটা ডেডবডির ডোবা আছে। জল-টল কিছু নেই—শুধু পচা-গলা ডেডবডি। সেগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে হায়েনা, শেয়াল, নেকড়ে আর শকুন।’
ফকিরচাঁদ ডুকরে কেঁদে উঠল। জিশানের একটা হাত আঁকড়ে ধরল। ওর দেহটা ফুলে-ফুলে উঠতে লাগল।
প্রথম তখন সিগারেটে ঘন-ঘন টান দিচ্ছে। মাথা নাড়তে-নাড়তে ও বলল, ‘চাকরির সারাক্ষণই তো শ্রীধর পাট্টার ভয়ে চুপ করে থাকি। কত আর চুপ করে থাকব?’ জিশানের বুকে আঙুল ঠুকে বলল, ‘তোমার কাছ থেকে যখন ঘুষ কবুল করেছি তখন তার এক্সচেঞ্জে সার্ভিস দেব, নেকরোসিটির সব কেলো ফাঁস করব…।’
সারি-সারি মোমবাতির মাঝখান দিয়ে সরু হাঁটা পথ। জিশান আর ফকিরকে মাঝখানে রেখে নিয়ে গার্ড দুজন হেঁটে চলল। জিশান অবাক হয়ে মোমবাতির নীল শিখাগুলো দেখছিল। এই বিচিত্র মোমবাতি এরা পেল কোথায়? সে-কথাই ও জিগ্যেস করল প্রথমকে।
সিগারেটে জোরে টান দিয়ে প্রথম বলল, ‘কোথায় আর পাবে! হয় বিদেশ থেকে আনিয়েছে, নয়তো এই নিউ সিটিতেই তৈরি করেছে।’ সিগারেটটা ছোট হয়ে এসেছিল। সেটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে গার্ড বলল, ‘এই যে নাকে মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছ এটা মেশিনে তৈরি। মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা স্প্রেয়ারের নল থেকে স্প্রে করা হচ্ছে। বাইরে থেকে যখন নামিদামি লোকজন নিউ সিটি ভিজিট করতে আসে তখন এইসব ব্যবস্থা দেখে ওদের মাথা ঘুরে যায়। ভাবে, মারা যাওয়া মানুষগুলোর জন্যে সরকারের কত না দরদ, কত না শ্রদ্ধা। হুঁ:! আসল কাণ্ড তো আছে পেছনদিকটায়। বাইরের কাউকে ওদিকটায় নিয়ে যাওয়া বারণ। তুমি টাকা দেবে বলেছ, তাই তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি…।’
কবরস্তানের নানান জায়গায় বড়-বড় গাছ লাগানো। আবছা আলোয় সেই অন্ধকার গাছগুলোকে অপার্থিব দানব মনে হচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়ে জোনাকির ঝাঁক দেখতে পেল জিশান। চলে বেড়ানো নীল আলোর ফুটকি।
ফকিরচাঁদ জিশানের পাশে-পাশে হাঁটছিল। ওর গা থেকে ঘামের গন্ধ পাচ্ছিল জিশান। সেইসঙ্গে শোকের গন্ধও।
প্রথমের কথার খেই ধরে দ্বিতীয় গার্ড জিশানকে বলল, ‘তোমার হয়তো মনে হচ্ছে…আমরা তোমার কাছ থেকে ঘুষ নিচ্ছি…আমরা দুজন ঘুষখোর। আসলে ব্যাপার কী জানো…’ অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল দ্বিতীয়: ‘এই নিউ সিটিতে ওপরমহলেই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি। ওই শ্রীধর পাট্টা…আমাদের মার্শাল…ওটাই সবচেয়ে বড় হারামজাদা। নেকরোসিটির আইডিয়াটা ওরই। রেগুলার এত লোক গেম সিটিতে এসে মারা যাচ্ছে…এত ডেডবডির গতি হবে কী করে! কে রোজ এত ডেডবডি কবর দেবে? কে-ই বা দাহ করবে? তার চেয়ে অনেক ভালো…।’
