জিশানের হাতের ছোঁয়া পেয়েই লোকটা কান্না থামিয়ে চট করে উঠে বসল। ঘুরে তাকাল জিশানের দিকে—চোখেমুখে লড়াকু ছাপ। কিন্তু জিশানকে দেখেই ওর ভাবভঙ্গি নরম হল। ‘ও—’ বলে জলাশয়ের পাড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে অবসন্নভাবে বসে রইল। ওর গলা দিয়ে কান্নার মিহি গোঙানি বেরিয়ে আসতে লাগল। শরীরটা ফুলে-ফুলে উঠতে লাগল।
লোকটাকে ভালো করে দেখল জিশান।
লম্বাটে মুখ। পোড়খাওয়া তামাটে রং। গালে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। ছোট কিন্তু চওড়া ভুরু। চোখ দুটো নরম—ভালোবাসার কবিতার মতো। সেই চোখে জল।
লোকটার মুখে আলোছায়ার খেলা। চোখের দৃষ্টি বিভ্রান্ত।
‘তুমি কাঁদছ কেন?’ লোকটার পিঠে হাত রেখে জিশান জিগ্যেস করল।
লোকটা কোনও উত্তর দিল না। এমনকী জিশানের দিকে তাকাল না পর্যন্ত।
জিশান আবার জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে?’
লোকটা এবার কান্না থামাল। দু-হাতে চোখ মুছে জিশানের দিকে তাকাল। ওর চোখে লালচে আভা, চোখের কোল ফোলা। ভাঙা গলায় পালটা প্রশ্ন করল, ‘তোমাকে বলে কী ফায়দা?’
জিশান ওর পাশে বসে পড়ল। বলল, ‘তেমন লাভ কিছু হবে কি না জানি না, তবে তোমার দু:খ একটু কমতেও পারে…।’
‘হুঁ:!’ বলে তাচ্ছিল্যের একটা শব্দ করল লোকটা : ‘দু:খ কমলেও আমার ভাই তো আর ফিরবে না…।’
‘তোমার ভাইয়ের কী হয়েছে?’
‘ও মারা গেছে। ”স্নেক লেক” গেমটায় নাম দিয়েছিল। সাপের কামড়ে মারা গেছে—।’
‘কবে?’
‘আটদিন আগে। দুটো সাপ পায়ে কামড়েছিল।’ আবার ফুঁপিয়ে উঠল লোকটা। হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে নিল : ‘…আসলে ও রেসটা শেষ করেছিল। সেকেন্ড হয়েছিল। তখনও বুঝতে পারেনি ওকে সাপে কেটেছে। কয়েকমিনিট পর ছটফট করতে-করতে পড়ে গেল। এদের ডাক্তার নার্স আসতে-আসতেই সব শেষ। ভাইয়া চলে গেল…আমাকে ছেড়ে চলে গেল….।’
জিশান একটু অবাক হল। আটদিন আগে যে-ভাই মারা গেছে তার জন্য লোকটা আজ হাপুস নয়নে কাঁদছে! সবাই জানে, সুপারগেমস কর্পোরেশনের গেম শো-তে নাম দিলে সাধারণত প্রাণের ঝুঁকি থাকে। ফলে প্রিয়জন হারানোর শোকটা কখনও আচমকা আসে না—তার একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকে। তার ওপর দু:খের ঘটনাটা ঘটেছে আটদিন আগে। তাই কোথায় যেন একটা খটকা লাগছিল জিশানের।
ও লোকটাকে বলল, ‘চলো ভাই, আমরা মেন গেটের কাছে যাই। ওখানে ঘাসের ওপরে বসে একটু গল্প করি। আমিও এখানকার গেম-এ নাম দিয়েছি। টেনশানে ঘুম আসছিল না। তোমার কান্না শুনে নীচে নেমে এলাম। চলো…দু:খ তো লাইফে থাকবেই…।’ কথা বলতে-বলতে জিশান উঠে দাঁড়াল।
লোকটা জিশানের দিকে তাকিয়ে কী বুঝল কে জানে। দু-হাতে ঘষে-ঘষে চোখ মুছল। ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াল।
ওরা পাশাপাশি পা ফেলে মেন গেটের দিকে এগিয়ে চলল। জিশান লোকটাকে নিজের কথা বলতে লাগল। বলল, কীভাবে ও নিউ সিটিতে এসে পৌঁছেছে। কীভাবে ব্ল্যাকমেল করে ওকে কিল গেম-এ নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নিজের কাহিনি শেষ করে জিশান জিগ্যেস করল, ‘তোমার নাম কী?’
লোকটা কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, ‘ফকিরচাঁদ।’
জিশানের মনে পড়ল মনোহরের কথা। আজ বিকেলে ‘কমব্যাট পার্ক’ থেকে ফেরার সময় মনোহর তা হলে এর কথাই বলছিল!
মেন গেটের দুপাশে সবুজ লন। একটু দূরে সুন্দর জ্যামিতিক কায়দায় সাজানো ঝাউগাছ আর পামগাছ।
এদিকটায় আলো কম। তাই অনেকটা যেন খোলামেলা পার্কের কোমল আবহাওয়া। সবুজ ঘাসের মোলায়েম আসনে বসে জিশানের মনেই হল না ও আর ফকিরচাঁদ আসলে নিউ সিটির ‘বন্দি’।
ওরা দুজনে কথা বলতে লাগল।
জিশান লক্ষ করল, মেন গেটের বাইরে দুজন গার্ড পাহারা দিচ্ছে। ওরা জিশানদের দিকে একপলক তাকিয়েই নজর সরিয়ে নিল। মেন গেটের বাইরে না আসা পর্যন্ত ওদের কাছে জিশানদের কোনও গুরুত্ব নেই।
বুক ভরে বাতাসের গন্ধ নিচ্ছিল জিশান। রাতের প্রকৃতিকে দু-চোখ ভরে দেখছিল।
ফকিরচাঁদ ওর ভাই আমিরচাঁদের কথা বলছিল।
অভাবের তাড়নায় খারাপ পথে চলে গিয়েছিল আমির। বুড়ো মা-বাপ আর ছোটবোন জেবার কষ্ট সইতে না পেরে ও নিয়মিত চুরি-ছিনতাই করতে শুরু করেছিল। তারপর একদিন দু-চারজন বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ‘স্নেক লেক’-এ নাম দেয়।
ছোটভাইকে দারুণ ভালোবাসত ফকির। তাই ভাইয়ের দেখাদেখি ও-ও নাম দেয় ‘হাংরি ডলফিন’ গেম-এ। ওরা দু-ভাই একসঙ্গে এই নিউ সিটিতে আসে। কম্পিটিশানের দুটো রাউন্ডে পরপর জিতেও যায় দুজনে। তারপর…তারপর আসে আমিরচাঁদের গেম-এর পালা : স্নেক লেক।
বাঁ-হাতে ঘাসের ওপরে হাত বোলাচ্ছিল ফকিরচাঁদ। কথা বলতে-বলতে কখন যেন ওর গলা ভারি হয়ে গিয়েছিল।
এতক্ষণ ধরে না-করা প্রশ্নটা এইবার উচ্চারণ করল জিশান : ‘…আটদিন আগে ভাই মারা গেছে…সেজন্যে আজও তুমি কাঁদছ?’
জিশানের দিকে মুখ ফেরাল ফকিরচাঁদ। কয়েকসেকেন্ড অপলকে তাকিয়ে রইল। তারপর ডানহাতে মাথার চুলে আঙুল চালাল। থেমে-থেমে বলল, ‘আমি কাঁদছি আমিরের ডেডবডির জন্যে, জিশানভাইয়া…।’
‘ডেডবডির জন্যে?’ অবাক হয়ে গেল জিশান।
‘হ্যাঁ, জিশানভাইয়া। অনেক চেষ্টা করে দুজন সিকিওরিটি গার্ডকে প্রাইজ মানির টাকা থেকে ঘুষ দিয়ে ভাইকে দেখার একটা বন্দোবস্ত করেছিলাম…।’ ওরা চোখে পটি বেঁধে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল সেখানে…ভাইয়ের কাছে…।’
‘তার মানে? তোমার ভাই তো মারা গেছে—।’
‘হ্যাঁ—মারা গেছে। কিন্তু মারা যাওয়ার পর তো ভাইকে আর আমি দেখিনি—।’
