হঠাৎই একটা বেডে একজন পেশেন্ট সোজা হয়ে বসল। জিশানকে লক্ষ করে ডেকে উঠল, ‘এ জিশান ভাইয়া!’
জিশান চমকে সেদিকে ফিরে তাকাল।
মনোহর সিং। মুখে একগাল হাসি। কালচে ছোপধরা দাঁত দেখা যাচ্ছে। একপায়ে হাঁটুর নীচে ব্যান্ডেজ।
জিশান বেড থেকে নেমে ওর কাছে এগিয়ে গেল। পায়ের ব্যান্ডেজের দিকে আঙুল দেখাতেই মনোহর উঠে বসল। কোমরের নীচে ইনজেকশানের জায়গাটা হাত দিয়ে ঘষতে-ঘষতে বলল, ‘একটা গিরগিটি আমার পায়ে কামড়ে দিয়েছে—।’
জিশান মনোহরকে দেখে খুব খুশি হয়েছিল। হেসে বলল, ‘গিরগিটি নয়—কোমোডো।’
‘ওই একই হল। সালা আমিও একটা গিরগিটিকে কামড়ে দিয়েছি…।’
জিশান আঁতকে উঠল। মনোহর বলে কী! একটা কোমোডো ড্রাগনকে ও কামড়ে দিয়েছে!
সে-কথা জিগ্যেস করতে মনোহর বলল, ‘হাঁ, জিশান ভাইয়া। আমার পায়ে কামড় দিয়ে জানোয়ারটা ছাড়ছিল না। তখন আমি লড়তে-লড়তে ওটার লেজে কামড় দিয়েছি। ও:, কী বাজে টেস্ট!’ নাক কুঁচকে ঘেন্নায় মাথা ঝাঁকাল মনোহর।
জিশান আবার হেসে ফেলল। তবে সেই হাসির মধ্যে কিছুটা দু:খ মেশানো ছিল। সুপারগেমস কর্পোরেশন কী চমৎকারভাবেই না মানুষকে ধীরে-ধীরে পালটে দিচ্ছে পশুতে! একটা মানুষ পশুর গায়ে কামড় বসিয়ে লড়াই করছে—পশুর মতো!
অন্যান্য বেডের বাকি তিনজন তখন বিছানায় উঠে বসেছে। নিজেদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। পঞ্চাশহাজার টাকার প্রাইজ মানি কে কীভাবে খরচ করবে তা নিয়েও জল্পনা-কল্পনা চলছে।
সেদিকে একবার তাকিয়ে মনোহর সিং বলল, ‘জিশান ভাইয়া, তোমার তো মোট প্রাইজ মানি হল আশিহাজার টাকা। তুমি এই টাকাটা নিয়ে কী করবে ঠিক করেছ?’
জিশান বলল, আজ রাতে অন-লাইন নেটওয়ার্কে বোতাম টিপে বলে দেব টাকাটা আমার ওয়াইফের কাছে পাঠিয়ে দিতে। মিনি ঠিক করবে এই টাকা দিয়ে ও কী করবে। আমার তো এখান থেকে ফিরে যাওয়ার কোনও ঠিক নেই…বুঝতেই পারছ…।’
‘ফিরতে তোমাকে হবেই, জিশান ভাইয়া। তোমার বিবি-বাচ্চার সঙ্গে মিলতে হবে। ওরা ওয়েট করছে…।’
জিশানের মনটা পলকে উড়ে গেল ওল্ড সিটিতে। মিনি আর শানুর কাছে। ওদের কাছে যদি ও আর কখনও ফিরতে পারে তখন কি আর ও মানুষ থাকবে? ফিরে গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তটার কথা ভেবে ভয় পেল জিশান।
মনোহর তখন হাসিমুখে বলছে, ‘আমার টাকাটা নিয়ে কী করব সেটা আমিও ভেবে ফেলেছি।’
‘কী করবে?’
‘তিরিশহাজার আমি রাখব, আর বাকিটা আমার ভাতিজাকে দেব—।’
‘ভাতিজা?’ অবাক হয়ে বলল জিশান, ‘এই যে বলো, তোমার আগে-পিছে কেউ নেই!’
‘আগে ছিল না—এখন আছে।’ মুচকি হেসে বলল মনোহর, ‘একজন দাদা আছে, একজন ভাবী আছে, আর একজন ভাতিজা আছে।’
‘মানে?’
মনোহর ঝুঁকে পড়ে জিশানের হাত চেপে ধরল : ‘জিশান ভাইয়া, তুমি আমার দাদা আছ। আর শানু মেরা ভাতিজা। আমার আগে তো রিশতেদার কেউ ছিল না—এখন আছে। ওই পঞ্চাশহাজার টাকা আমি ভাতিজা শানুর জন্যে রাখব। তোমার কোনও ”না” শুনব না। তুমি আজ আমার ঘরের কম্পিউটার থেকে টাকাটা ট্রান্সফারের বেওস্থা করে দেবে। ওয়াদা?’
জিশানের চোখে জল এসে গিয়েছিল। ও চাপা গলায় বলল, ‘পাক্কা ওয়াদা।’
ও মনে-মনে চাইছিল, পিট ফাইটে কিছুতেই যেন ওকে মনোহরের মুখোমুখি না পড়তে হয়। যদি পড়ে, তা হলে জিশান লড়বে না—কিছুতেই না। তার জন্য শ্রীধর পাট্টা যে-শাস্তিই দিক জিশান মেনে নেবে। হোক সে রোলারবল, কিংবা প্রাইজ মানি আর লাইভ টেলিকাস্ট ছাড়া হাংরি ডলফিন কি ম্যানিম্যাল রেস—অথবা ডগ স্কোয়াড।
মনোহরের হাতে চাপ দিয়ে জিশান ধরা গলায় বলল, ‘আশ্চর্য, মনোহর, আমরা এখনও ইনসান আছি—পুরোপুরি জানবর হয়ে যাইনি।’
আর পাঁচ-দশমিনিটের মধ্যেই ইনস্ট্রাকটর দুজন ঘরে ঢুকে পড়ল। চেঁচিয়ে বলল, ‘ও. কে. গাইজ—লেটস গো।’
ওরা পাঁচজন চটপট লাইন দিয়ে দাঁড়াল। তারপর ঘর থেকে রওনা হল।
মনোহর জিশানের ঠিক সামনেই ছিল। সামান্য খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। ও জিশানের দিকে মুখ ফিরিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘বহত ভুখ লাগছে, জিশান ভাইয়া—।’
‘আমারও—। তবে চিন্তা নেই, গেস্টহাউসে গিয়েই মহাভোজ পেয়ে যাবে।’
‘এর পরের রাউন্ডের আগে আমাদের রেস্ট দেবে তো? আমার পায়ের যা অবস্থা…।’
‘নিশ্চয়ই দেবে। কিন্তু পরের রাউন্ডে কী গেম রেখেছে কে জানে!’
‘আমি শুনেছি, জিশান ভাইয়া। পরের রাউন্ডের গেমটার নাম ”স্নেক লেক”। তার পরে লাস্ট রাউন্ডের ”পিট ফাইট”…।’
‘স্নেক লেক?’
‘হ্যাঁ। জহরিলা সাপে কিলবিল করছে এমন একটা লেকের মধ্যে দিয়ে আমাদের ছুটতে হবে…।’
‘লেকের মধ্যে দিয়ে ছুটতে হবে মানে?’ জিশান অবাক হয়ে জানতে চাইল। লক্ষ করল, লাইনের বাকি তিনজন গলা বাড়িয়ে ওদের চাপা কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করছে।
‘লেকে বেশি জল নেই। আধহাঁটু জল। আমি ফকিরচাঁদের কাছে শুনেছি। ওর ভাই আমিরচাঁদ স্নেক লেকে ছুটতে গিয়ে সাপের কামড়ে মারা গেছে…।’
জিশান আর কোনও কথা বলল না। আজকের কমব্যাট পার্ক রাউন্ডেও হয়তো দু-চারজন মারা গেছে। এই মৃতদেহগুলো কোথায় যায়? সিন্ডিকেট কি এই ডেডবডিগুলো সৎকার করার চেষ্টা করে?
হঠাৎই জিশানের মনে হল, এটা খুবই মামুলি প্রশ্ন। যারা নিয়মিত মনুষ্যত্বের সৎকার করে চলেছে তাদের কাছে ডেডবডির নিয়মিত বন্দোবস্ত করাটা কোনও ব্যাপারই নয়।
