খোকনের মনে আছে, সেদিন সারারাত ও ঘুমোতে পারেনি। আরও মনে আছে, পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা বাবার ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না সারারাত ধরে ওর বুকের ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল। বারবার ওর কানে বাজছিল বাবার কান্না মেশানো কথাগুলো : ‘…এ-শহরের মানুষগুলো সব মরে গেছে…।’
প্লেট টিভিতে দেখানো নানান ধরনের খেলা খোকনকে বরাবর নেশার মতো টানত। সেইসঙ্গে টাকার অভাবটা ওকে চব্বিশ ঘণ্টা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দিত। সেই রাতের পর ও মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল, যে করে হোক, বাবার চোখের জল ও মুছবেই।
সাঁতারে খোকন ছোটবেলা থেকেই ওস্তাদ। ওয়াটার পোলো ও ভালোই খেলে। তাই ওর মনে হল, হাংরি ডলফিন খেলাটাই ওর পক্ষে সবচেয়ে ভালো।
হাংরি ডলফিন গেম-এ নাম দিয়ে যখন ও ওল্ড সিটি ছেড়ে চলে আসে তখন ওর খুব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু ও মুখ ফুটে বাবাকে বা মা-কে বলতে পারেনি, ‘তোমাদের চোখের জল মোছার জন্যেই আমি নিউ সিটিতে যাচ্ছি—।’ ওর খুব সাধ, বিশলাখ টাকা প্রাইজ জিতে মা-বাবাকে ও প্রাইজ দেবে। দেখিয়ে দেবে, খোকন ফ্যামিলির জন্য কিছু করতে পারে।
ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভাবছিল জিশান। খোকনই ওকে সব বলেছে। বলেছে, দু:খের কথা, বলেছে স্বপ্নের কথাও।
কাল বিকেলের পর থেকে জিশান খোকনের কাছে ‘জিশানদা’ হয়ে গেছে। এলিভেটর ফাইটটা জিশানকে খোকনের কাছে হিরো করে দিয়েছে।
খোকন আবার জিগ্যেস করল, ‘জিশানদা, পোটেনশিয়াল মানে?’
জিশান হেসে বলল, ‘পোটেনশিয়াল মানে যে হেভি লড়বে—সহজে হারবে না।’
খোকন মনোহরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সিন্ডিকেট তা হলে ঠিকই ভেবেছে। কী বলো, মনোহরদা?’
মনোহর বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল : ‘হুঁ—।’
এমন সময় ঘরের দরজা খুলে অ্যাটেনড্যান্ট ঢুকল। হাতের ক্রিস্ট্যাল ট্রে-তে সাজানো তিনকাপ কফি আর ফিঙ্গার চিপস।
সোফার সামনে রাখা টেবিলে কফি আর ফিঙ্গার চিপস সাজিয়ে দিয়ে অ্যাটেনড্যান্ট চলে গেল।
ফিঙ্গার চিপস তুলে নিয়ে তাতে কামড় বসাল মনোহর। চোখ বুজে চিবোতে-চিবোতে বলল, ‘এরা রান্নাগুলো দারুণ করে, জিশান ভাইয়া।’
জিশান ছোট্ট করে ‘হুঁ’ বলল। কিন্তু মনে-মনে বাবার কাছে শোনা একটা ঘটনার কথা ভাবছিল। বহু যুগ আগে দেবতাদের সামনে পশুবলি দেওয়ার প্রথা চালু ছিল। তখন বলির ঠিক আগে পশুটিকে প্রাণভরে তার প্রিয় খাদ্য খাওয়ানো হত।
সে-কথা ভাবতে-ভাবতে মনোহরের দিকে দেখছিল জিশান। বাচ্চা ছেলের মতো তৃপ্তিতে ফিঙ্গার চিপস খাচ্ছে আর ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে।
জিশানেরও একই দশা, কিন্তু ও মনোহরের মতো নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে কই?
জিশান আবারও মনে-প্রাণে চাইল, ওকে যেন মনোহরের সঙ্গে মরণপণ মোকাবিলায় না নামতে হয়।
খোকন চুপচাপ কফি খাচ্ছিল। হঠাৎই বলল, ‘মনোহরদা, জিশানদাকে পুনিয়ার কথা বলো…।’
জিশানের ভুরু কুঁচকে গেল। পুনিয়া? কে পুনিয়া?
ও সে-কথাই জিগ্যেস করল মনোহরকে।
মনোহর বলল, ‘পুনিয়া আমাদের গ্রুপের না—অন্য গ্রুপের। ওর পুরো নাম পুনিয়া সরকার—খিদিরপুরে থাকত…।’
‘থাকত মানে?’
‘কাল রাতে লাস্ট রাউন্ডে মারা গেছে।’
জিশান বুঝতে পারল। পুনিয়া কিল গেম-এর কোয়ালিফাইং রাউন্ডগুলোর লাস্ট রাউন্ডে মারা গেছে।
কিল গেম পার্টিসিপ্যান্টদের নিয়ে নানান কোয়ালিফাইং রাউন্ডে যে এতরকম বিপজ্জনক ‘খেলা’ আছে সেটা জিশান জানত না। কারণ, সুপারগেমস কর্পোরেশন কোনওদিনই টিভিতে এসব নিয়ে প্রচার করেনি। এগুলো হয়তো সিন্ডিকেটের ট্রেড সিক্রেট।
কফি খেতে-খেতে মনোহরের মুখে পুনিয়ার কথা শুনল জিশান।
পুনিয়া জিশান-মনোহর-খোকনদের গ্রুপে নয়—অন্য গ্রুপে। ও জিশানদের অনেক আগেই জিপিসি-তে এসেছিল। পেটানো স্বাস্থ্য, লড়াকু ছেলে। ছোটবেলা থেকে খতরনাক পাড়ায় মানুষ। মারপিট করতে-করতেই বড় হয়েছে।
কিল গেম-এর অন্য সব রাউন্ডগুলোয় পুনিয়া অনায়াসেই জিতেছে। কিন্তু কাল রাতে ছিল ওর ‘পিট ফাইট’। একটা বিশাল গর্তের মধ্যে দুজন ফাইটারের লড়াই। অনেকেই সেই লড়াই দেখতে যায়। মনোহর আর খোকনও গিয়েছিল।
জিশান পিট ফাইট নিয়ে আগে কিছু শোনেনি। তাই ওই ফাইট দেখার কোনও উৎসাহ ওর ছিল না। তবে এখন খোকনের কাছে শুনল, পিট ফাইট শুধু গায়ের জোরের লড়াই নয়—মনের জোরেরও লড়াই।
গতকাল রাতে পুনিয়া অন্য আর একটা গ্রুপের চ্যাম্পিয়ান জাব্বা নামে এক ফাইটারের হাতে মারা গেছে। এ নিয়ে জাব্বার হাতে মোট দুজন পার্টিসিপ্যান্ট খতম হল। মনোহর আর জিশান যদি পরের দুটো রাউন্ডে কোয়ালিফাই করে তা হলে ওরা লাস্ট রাউন্ডে যাবে। তখন ওরা পিট ফাইটে কার মুখোমুখি হবে কে জানে!
এখানে কোনও পার্টিসিপ্যান্ট শুধু নানান রাউন্ডে জিতলেই কিল গেম-এ তাকে নেওয়া হবে না। ওদের ট্রেনিং শিডিউল-এর নানান ধাপে নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। যেমন, ফিজিক্যাল ট্রেনিং স্কিল, আর্মস স্কিল, রিঅ্যাকশন টাইম—এসবের ওপরে নম্বর দেওয়া হয়। সেইসব নম্বর যোগ করে তারপরই বেছে নেওয়া হবে একজনকে—কিল গেম-এর জন্য।
জাব্বাকে দেখে মনোহর আর খোকন বেশ ভয় পেয়ে গেছে।
মনোহর ভয় পেয়েছে নিজের আর জিশানের জন্য, আর খোকন ভয় পেয়েছে মনোহরের জন্য—আর কিছুটা জিশানের জন্যও।
মনোহর বলল, ‘জিশান ভাইয়া, জাব্বার চোখ দুটো খুনির মতো। সবাই বলাবলি করছে, লোকটা নাকি তিন-চারবার জেল খেটেছে। আর জাব্বা বলছে, কিল গেম-এ ও চান্স পাবেই—আর তারপর ওই তিনটে খতরনাক কিলারকে ধরে ও মটমট করে ঘাড় মটকে দেবে—পাটকাঠির মতো। তারপর লুটে নেবে একশো কোটি টাকা।’
