তবে ওটা যে জিশানের টোপ সেটা বুঝতে পারেনি।
সুতরাং রণজিৎ হাত চালাল।
আর জিশানও চোস্ত খেলোয়াড়ের মতো শকারটাকে সামনে বাড়িয়ে জোরালো গুঁতো মারল রণজিতের পেটে।
সুইচ অফ করা অবস্থায় অস্ত্র হিসেবে শকারের গুণমান কাঠের রুলের চেয়ে একটু বেশি, লোহার রডের চেয়ে একটু কম। ফলে শকারের গুঁতোয় বেশ ভালোই কাজ হল।
রণজিতের দেহটা ভাঁজ হয়ে গেল সামনে। মাথাটা নিচু হয়ে যাওয়ায় চাঁদির তেলতেলে টাকটা এসে পড়ল জিশানের কাছাকাছি। জিশান নিজের মাথাটা ঝাঁকিয়ে মুগুরের মতো বাড়ি মারল রণজিতের টাকে। তারপর বাঁ-হাতের মুঠোয় সাপের মতো পোঁচিয়ে ধরল রণজিতের ডানহাতের মধ্যমা।
যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল রণজিৎ। হেঁড়ে গলায় চাপা গর্জন করে চলল—সঙ্গে তীব্র ফোঁসফোঁসানি।
জিশান রণজিতের আঙুলে হিংস্র মোচড় দিল। রণজিতের গলা থেকে যন্ত্রণার সা-রে-গা-মা বেরিয়ে এল। এবার শকারটা জিশান সপাটে বসিয়ে দিল রণজিতের পিঠে।
রণজিৎ পড়ে গেল বটে, কিন্তু কাবু হল না।
ও যে কিল গেম লড়তে এসেছে, সেকথা ভুললে চলবে না। ওর শরীরের রস-কষকে খাটো করে দেখলে চলবে না। মনে-মনে ভাবল জিশান।
রণজিৎ আবার উঠতে যাচ্ছিল, জিশান ব্যঙ্গের ঝাঁজালো গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘ক্ষমা, স্যার, ক্ষমা—।’ এবং পলকে সুইচ অন করে শকারটা চেপে ধরল রণজিতের পাঁজরের কাছে।
গেঞ্জির কাপড় পুড়ে যাওয়ার গন্ধ বেরোল। আর কোনও গন্ধ নাকে ভালো করে ঠাহর করার আগেই এলিভেটরের মেঝেতে পড়ে গেল রণজিৎ।
জিশান ঘুরে তাকাল পাপুয়ার দিকে। শকারটা হাতে খোলা তরোয়ালের মতো ধরা।
পাপুয়া সটান জিশানের পায়ে বডি ফেলে দিল : ‘মাপ করো, বস, মাপ করো! আর এরকম হবে না। ক্ষমা, বস, ক্ষমা…।’
জিশান শকারটার সুইচ অফ করে পাপুয়ার পিঠে ঠেকাল। সঙ্গে-সঙ্গে পাপুয়া আতঙ্কে হাঁউমাঁউ করে উঠল।
জিশান হেসে বলল, ‘সালা, ডরপোক—ইঁদুরের বাচ্চা।’ জিশান ওর কোমরে একটা হালকা লাথি কষাল।
এলিভেটর তখন চারনম্বর ফ্লোর পার হচ্ছিল। এলিভেটরের প্যানেলের কাছে গিয়ে জিশান বোতাম টিপে যন্ত্রটাকে থামাল। তারপর আটাশ নম্বর বোতাম টিপে দিল।
জিশান, মনোহর, খোকনরা গেস্টহাউসের আটাশ নম্বর ফ্লোরে থাকে। আর রণজিৎরা থাকে উনতিরিশে।
ওপরে উঠতে এলিভেটরের বেশ সময় লাগবে। সেই ফাঁকে জিশান এলিভেটরের ভেতরটা গোছাতে লাগল। খোকন ওর সঙ্গে হাত লাগাল।
প্রথমেই শকারটা গার্ডের শিথিল শরীরের পাশে রেখে দিল জিশান। তারপর ও আর খোকন মিলে মনোহরকে দাঁড় করাল। ওর গালে আলতো চাপড় মেরে সাড় ফেরাতে চাইল।
পাপুয়া তখন ঝুঁকে পড়ে হাসান আর রণজিতের সেবা করছে।
এলিভেটর যখন আটাশ নম্বর ফ্লোরে এসে থামল তখন মনোহর জ্ঞান ফিরে পেয়েছে। ও ফ্যালফ্যালে চোখে জিশানের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ‘কেয়া হুয়া, জিশান ভাইয়া?’
জিশান ছোট্ট করে বলল, ‘লাফড়া।’
তারপর খোকনের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘এর মাথাটা গেছে। চলো, ভালো করে জল-টল না ছেটালে এর কিচ্ছু মনে পড়বে না…।’
খোকন বলল, ‘ঠিক বলেছ!’
জিশান ভাবল, এই যে শকার নিয়ে ও লড়াই করল—এটা কি কিল গেম-এর আর-একটা প্রিলিমিনারি রাউন্ড? ও কি তা হলে আর-একটা রাউন্ডে কোয়ালিফাই করল? আর সেইসঙ্গে মানুষ থেকে পশুর দিকে এগিয়ে গেল আর-একটা ধাপ?
হঠাৎই জিশানের মনে হল, এলিভেটরে ওদের এই দাঙ্গাহাঙ্গামা কেউ দেখে ফেলেনি তো? দেখলেই সর্বনাশ! তখন কী শাস্তি পেতে হবে কে জানে!
এলিভেটরের সিলিং-এর দিকে তাকাল জিশান।
দুটো ছোট্ট টিভি ক্যামেরা ওর নজরে পড়ল।
•
জিশান কতক্ষণ ঘুমোতে পেরেছিল ঠিক মনে নেই। হঠাৎই কেমন একটা অস্বস্তি টের পেল ও। মিনি আর শানুকে নিয়ে যে-স্বপ্নটা দেখছিল সেটা জলের নীচে ডুবে থাকা ছবির মতো ভাসতে-ভাসতে তলিয়ে গেল। একটা মেয়েলি গলা ওকে যেন বারবার ডাকছিল : ‘জিশান! জিশান!’
প্রথমে গলাটা মিনির মতো ঠেকল। তারপর বদলে গেল সেই মেয়েটার গলায় যে রোজ ভোরবেলা ছ’টা বাজলেই ওকে প্লেট টিভির ভেতর থেকে ডাকে—মিষ্টি সুরেলা গলায় ডেকে-ডেকে ওর ঘুম ভাঙায়।
চোখ কচলে বিছানায় উঠে বসল জিশান। অবাক হয়ে দেখল, ওর ঘরের আলোগুলো জ্বলছে।
ও কি তা হলে আলো জ্বেলেই শুয়ে পড়েছিল?
না তো! স্পষ্ট মনে আছে, ও সবক’টা আলোর সুইচই অফ করেছে।
তা হলে আলোগুলো অন করল কে?
হঠাৎই হাসি পেয়ে গেল জিশানের। এই জিপিসি-র গেস্টহাউসে প্রায় সবকিছুই অটোমেটিক। এবং তার সমস্ত মাস্টার কন্ট্রোল সিন্ডিকেটের হাতে। সুতরাং, খুশিমতো ওরা জিশানের ঘরের আলো জ্বালতেই পারে।
ঘরের দেওয়ালে ইনসেট করা ডিজিটাল ঘড়ির দিকে চোখ গেল জিশানের। সময় দুটো। পাশে বাঁকা চাঁদের ছবি—মানে রাত। প্রতিদিন সূর্য যখন ওঠে ঠিক তখন চাঁদের ছবিটা পালটে সূর্য হয়ে যায়। আর সূর্য ডুবলেই সূর্যের ছবি মুছে গিয়ে ফুটে ওঠে চাঁদের ছবি।
এখন যে রাত দুটো সেটা নিশ্চিতভাবে বোঝার জন্য পুবদিকের কাচের জানলাটার দিকে তাকাল জিশান।
সেখানে এখন রাতের অন্ধকার। অন্ধকারে তারা চোখে পড়ছে। আর তার সঙ্গে লাল-নীল জোড়া ধূমকেতুর লেজের কিছুটা করে অংশ।
এবার প্লেট টিভির চেনা সুন্দরীর দিকে তাকাল। মেয়েটি তখন বলছে, ‘ঘুম ভাঙাতে হল বলে দু:খিত, জিশান। কিন্তু তোমাকে এখুনি তৈরি হয়ে নিতে হবে। একটা ইমার্জেন্সি কলে পিস ফোর্সের গার্ডরা তোমাকে নিতে আসবে। ক্রিমিনাল রিফর্ম ডিপার্টমেন্টের মার্শাল শ্রীধর পাট্টা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। তৈরি হওয়ার জন্যে তোমার হাতে মাত্র পাঁচমিনিট সময় আছে, জিশান। তোমার সময় শুরু হচ্ছে এখন…। ও. কে.। গুড বাই অ্যান্ড থ্যাংক য়ু—।’
