কাউন্ট ডাউন শেষ হতে-না-হতেই খেলা শুরু।
মুখোমুখি প্ল্যাটফর্মে বসা প্রতিযোগী দুজন ঝাঁপিয়ে পড়ল প্ল্যাটফর্ম থেকে। টারজানের মতো শূন্যে দোল খেয়ে তারা উল্কার মতো ধেয়ে এল পরস্পরের দিকে। জিমের মাঝামাঝি জায়গায় এসে ওদের মারাত্মক সংঘর্ষ হল।
তারপর চলতে লাগল দাঁত-নখ লড়াই।
আচমকা পরদায় প্রাোজেকশান বন্ধ করে দিলেন ইনস্ট্রাকটর। বললেন, ‘সবাই নিশ্চয়ই খেলাটা বুঝতে পেরেছেন?’
জিশান লক্ষ করল, ইনস্ট্রাকটরের জামায় বোতামের কাছে মউমাছির মতো ছোট্ট ক্লিপ-অন মাইক্রোফোন লাগানো। লুকোনো কোনও সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে জিশানরা ওঁর কথা স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছিল।
‘তাড়াতাড়ি বলুন, খেলাটা আপনারা সবাই বুঝতে পেরেছেন কি না—।’
জিশানরা সকলেই হাতের ইশারায় জানাল, হ্যাঁ, ওরা বুঝতে পেরেছে।
‘…খেলাটায় নিয়ম বলে কিছু নেই। শিকল ধরে প্ল্যাটফর্ম থেকে ঝাঁপ দেওয়ার পর আপনারা যে যেমনভাবে খুশি লড়াই করতে পারেন। যদি কেউ শিকল শক্ত করে ধরে রাখতে না পেরে নীচে পড়ে যান তা হলে ডিসকোয়ালিফায়েড হওয়ার কোনও ভয় নেই। অটো-এলিভেটরের হেলপ নিয়ে আপনারা আবার শিকল ধরে প্ল্যাটফর্মে গিয়ে বসবেন—ঝাঁপ দেবেন।’ ইনস্ট্রাকটর ওদের দশজনকে একে-একে দেখলেন। তারপর হেসে বললেন, ‘এই খেলাটায় সুবিধে হচ্ছে, এর কোনও টাইম লিমিট নেই। টেক ইয়োর ওন টাইম টু ফিক্স ইয়োর অপোনেন্ট।’
দু:খে হাসি পেয়ে গেল জিশানের। কোনও টাইম লিমিট নেই! শিকলে ঝুলতে-ঝুলতে পশুর মতো লড়ে যাও প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে। শিকলে বাড়ি খাও, মাথা ফাটাও—নিজের অথবা অন্যের। শিকল থেকে পড়ে গেলেও কোনও অসুবিধে নেই। তখন আবার প্ল্যাটফর্মে চড়ে বসতে হবে। নতুন করে শুরু করতে হবে লড়াই। যদি অবশ্য জিমের মেঝেতে পড়ে গিয়ে শরীরটা আস্ত থাকে!
মোদ্দা কথা হল, ডিজিটাল রেজাল্ট চাই : এক অথবা শূন্য, জয় অথবা পরাজয়। আর এত সত্বেও এর নাম খেলা—গেম!
‘ও.কে.। টেক ইয়োর পজিশন। যার-যার জায়গামতো দাঁড়িয়ে যান আপনারা। এদিকে পাঁচজন, আর ওদিকে পাঁচজন। কুইক—উঠে পড়ুন অটো-এলিভেটরে।’
জিমের যন্ত্রগুলো যন্ত্রের মতোই কাজ করতে লাগল। জিশান অনেক হিসেব কষে এমনভাবে একদিকে গিয়ে দাঁড়াল যাতে ওকে মনোহর সিং-এর মুখোমুখি না পড়তে হয়।
ও খেয়াল করল, মনোহরও বোধহয় একই চিন্তা করে জিশানের সঙ্গে একইদিকের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
জিশানের সঙ্গে মনোহরের চোখাচোখি হল। মনোহর হেসে চোখ মারল জিশানকে। তারপর ‘দেখি, নসিবে কী আছে!’ গোছের ভাব করে হাত আর ঠোঁট ওলটাল।
অটো-এলিভেটর জিশানদের তুলে দিল প্রায় চল্লিশ ফুট ওপরের প্ল্যাটফর্মে। তারপর অদ্ভুত একটা যন্ত্র শিকলের প্রান্তগুলো ওপরে তুলে পৌঁছে দিল জিশানদের হাতের কাছে।
ইনস্ট্রাকটরের সিগনালের সঙ্গে-সঙ্গে ডিজিটাল কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেল।
জিশান তাকাল বিপরীতদিকের মাচায় বসা ওর প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে।
ছেলেটার নাম শিবপদ। শিকলের প্রান্তটা ধরে লাফ দেওয়ার জন্য ওত পেতে বসে আছে। দূরত্বটা অনেক বেশি হওয়ার জন্য স্পষ্ট করে ওকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আগে শিবপদকে লক্ষ করেছে জিশান। বেশ লম্বা, ফরসা, গাল ফোলা, কবজি দুটো শিরা-ওঠা—চওড়া, ঘন-ঘন চোখের পাতা ফ্যালে। আর গলায় একটা রুপোর চেন।
জিপিসিতে এসে থেকে জিশানরা রোজ নিয়মমাফিক ব্যায়াম করে। রোজকার সেই ওয়ার্কআউটের সময় জিশান লক্ষ করেছে, শিবপদ সবসময় চুপচাপ থাকে।
ওর সঙ্গে একবার আলাপ করতেও চেষ্টা করেছিল জিশান। ব্যায়াম করার ফাঁকে ওর কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বলেছিল, ‘আমার নাম জিশান…।’
ছেলেটা তখন পাওয়ার বিল্ডারে কাজ করছিল। যন্ত্রটায় হ্যাঁচকা মারা থামিয়ে ও চোখ পিটপিট করে তাকিয়েছিল জিশানের দিকে। তারপর থতিয়ে বলেছিল, ‘আমি শিবপদ…আলাপ করে কী লাভ! বরং ঝামেলা বাড়বে।’
‘ঝামেলা! কীসের ঝামেলা?’ জিশান ওর কথাটা বুঝতে না পেরে জিগ্যেস করেছিল।
তোয়ালে দিয়ে গায়ের ঘাম মুছে শিবপদ বলেছিল, ‘আজ নয় কাল তো মুখোমুখি লড়াইয়ে নামতে হবে। বেশি আলাপ হয়ে গেলে তখন লড়তে প্রবলেম হবে।’
স্পষ্ট বিদায়ের ইঙ্গিত।
কিন্তু তা সত্বেও হাল ছাড়েনি জিশান। শিবপদর চোখদুটোকে বড় করুণ বলে মনে হয়েছিল ওর। তাই আবার প্রশ্ন করেছিল, ‘তুমি এখানে কেমন করে এলে?’
‘বলব না।’ সরাসরি আপত্তি করেছিল শিবপদ, ‘দয়া করে নিজের জায়গায় যাও…মন দিয়ে ওয়ার্কআউট করো…শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার চেষ্টা করো।’
কথা শেষ করে শিবপদ আবার ব্যায়ামে মন দিয়েছিল। পাওয়ার বিল্ডারের রড ধরে দ্রুত ছন্দে হাপর টানার কাজ শুরু করে দিয়েছিল।
জিশানের যে কী জেদ চেপে গিয়েছিল!
ও নাছোড়বান্দার মতো জানতে চেয়েছিল, ‘বাড়িতে কে-কে আছে তোমার?’
‘বলব না!’
তারপর জিশানের প্রশ্নবাণের হাত থেকে বাঁচার জন্য চেঁচিয়ে একজন ইনস্ট্রাকটরকে ডেকেছিল, ‘স্যার, আমাকে একটু দেখিয়ে দেবেন…।’
জিশান আর দাঁড়ায়নি। সরে এসেছিল শিবপদর কাছ থেকে।
এখন শিবপদকে দেখে জিশানের মনে হল, ও ঠিকই বলেছিল : বেশি আলাপ হয়ে গেলে লড়তে প্রবলেম হবে।
ডিজিটাল কাউন্ট ডাউন খুব তাড়াতাড়ি শূন্যের দিকে ছুটছিল।
জিমের টঙে বসে জিশান দেখল, মাথায় কালো টুপি আর সাদা ট্র্যাক-সুট পরা তিনজন লোক ঢুকে পড়েছে জিমে। ওদের ভুঁড়ির কাছে ঝোলানো ল্যাপটপ কম্পিউটার। আর ট্র্যাক সুটের বুকের কাছটায় লাল হরফে লেখা ‘Observer’।
