‘জয় রুম’-এর মেঝেতে কৃত্রিম ঘাসের গালিচা পাতা। তার রং আর ধরন এমন যে, আসল ঘাসও হার মানবে। নাচতে-নাচতে তরুণ-তরুণীদের কেউ-কেউ—অথবা, কিশোর-কিশোরীদের কেউ কেউ—সেই ঘাসের মেঝেতে শুয়ে পড়ছিল। আবার একটু পরেই শরীর ভাঁজ করে ঝটকা মেরে উঠে পড়ছিল। তারপর নাচছিল।
হঠাৎই মিউজিক স্তিমিত হল। লুকোনো কোনও স্পিকার থেকে একটি মেয়ের মিষ্টি গলা শোনা গেল। গলাটা একইসঙ্গে মিষ্টি এবং নেশাতুর।
‘ফোকস, নাউ উই স্টপ ডান্স অ্যান্ড মিউজিক। নাচ আর বাজনা এবার শেষ। শুরু হবে হলোগ্রাম ফাইট গেম। তোমাদের হট ফেবারিট শো…।’
ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গে খুশির হল্লা শোনা গেল। ছায়া-ছায়া মানুষগুলো ‘জয় রুম’-এর মাঝখান থেকে সরে গেল দেওয়ালের দিকে। ফলে মাঝখানটায় বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়ে গেল।
তারপর মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। রঙিন ধোঁয়ার সুতোগুলোর বেশিরভাগটাই কোনও লুকোনো সাকশান ফ্যান যেন মুহূর্তে গিলে নিল। এবং সেগুলো মিলিয়ে যেতেই ঘরের মেঝেতে দুটো আলোকিত শরীর জন্ম নিল।
লেসার দিয়ে তৈরি দুটো হলোগ্রাম শরীর। একটা লাল, অন্যটা নীল। দুটো শরীরই চাপ-চাপ পেশি দিয়ে তৈরি। ওদের পরনে শুধু ধপধপে সাদা দুটো জাঙ্গিয়া।
শরীর দুটোর মাঝে চার-পাঁচ হাতের দূরত্ব। ওরা লড়াইয়ের ভঙ্গিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে রয়েছে।
স্কিন টাইট কালো পোশাক পরা আট-দশজন লোক ‘জয় রুম’-এ ঢুকে পড়ল। ওদের বুকে ‘জয় রুম’-এর ফ্লুওরেসেন্ট লোগো জ্বলজ্বল করছে। ওরা ইলেকট্রনিক প্যানেল বসানো চারটে কাউন্টার মূর্তি দুটোকে ঘিরে বসিয়ে দিল। ফলে লড়াকু দুজন যোদ্ধার জন্য একটি চৌকোনা এরিনা তৈরি হয়ে গেল। ঘরের হুল্লোড় করা ছেলেমেয়েগুলো ইলেকট্রনিক প্যানেলের কাছে ভিড় করে এসে দাঁড়াল।
এখুনি হলোগ্রাম ফাইট গেম শুরু হবে। শুরু হবে লাল আর নীলের লড়াই। র্যান্ডমাইজ করা সফটওয়্যার যোদ্ধা দুজনকে পরিচালনা করবে। দাবার চালের মতো লড়াইয়ের ছোট-ছোট চাল অ্যাক্টিভেট করবে। তবে কখন কোন চাল অ্যাক্টিভেটেড হবে কেউ বলতে পারবে না। তার কারণ র্যান্ডমাইজেশান।
কিন্তু এর পরেও একটা মজা আছে।
লড়াই দেখতে-দেখতে যে-কোনও দর্শক কন্ট্রোল প্যানেলের বোতাম টিপে লড়াইয়ের কোনও একটা মুভ অ্যাক্টিভেট করতে পারে। এর ফলে সফটওয়্যার জেনারেটেড র্যান্ডম সিকোয়েন্সের ধরন বদলে যেতে পারে। এবং তখন লড়াইটা হয়ে উঠবে আরও আনপ্রেডিক্টেবল।
স্বাভাবিকভাবেই এই হলোগ্রাম যোদ্ধা দুজন কখনও ক্লান্ত হয় না। তবে ওরা হাঁপায়, ওদের শরীরে ঘাম দেখা দেয়। স্পেশাল টেকনিক দিয়ে এগুলো ডিজাইন করা হয়েছে ফাইট গেমটাকে রিয়েলিস্টিক করার জন্য।
এই লড়াই চলবে ঠিক এক ঘণ্টা। তাতে যে-হলোগ্রাম ফাইটার পয়েন্টে জিতবে তার শরীরটা এরিনার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকবে। অন্যজন শুয়ে পড়বে মেঝেতে। উইনারের হয়ে যারা ইলেকট্রনিক প্যানেলে বোতাম টিপে লড়াইয়ের মুভ অ্যাক্টিভেট করেছে তাদের প্রাইজ দেওয়া হবে। তাদের চিনে নেওয়া হবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট অটো-ম্যাচ টেকনিকের মাধ্যমে।
এ ছাড়া এই দুজন ফাইটারকে নিয়ে বাজি ধরায় কোনও বাধা নেই।
হলোগ্রাম ফাইট গেম শুরু হল। তার সঙ্গে মানানসই সাউন্ড এফেক্ট।
সঙ্গে-সঙ্গে নেশাতুর মানুষগুলো হাত-পা ছুড়ে চিৎকার শুরু করল।
‘রেড! রেড!’
‘ব্লু! ব্লু!’
একইসঙ্গে দর্শকদের অনেকেই কন্ট্রোল প্যানেলের বোতাম টিপে ‘রেড’ আর ‘ব্লু’-র জন্য লড়াইয়ের নানানরকম মুভ অ্যাক্টিভেট করছিল। আর কালো পোশাক পরা লোকগুলোর কাছে গিয়ে টাকা দিয়ে বাজি ধরছিল।
সিমানও চুপ করে ছিল না। উত্তেজনা আর আগ্রহ নিয়ে যুযুধান ফাইটার দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিল। আর থেকে থেকেই উল্লাসের চিৎকার করে কন্ট্রোল প্যানেলের বোতাম টিপছিল। ওর চোখে হলোগ্রাম ফাইটারদের লাল-নীল ছায়া চঞ্চলভাবে নড়ছিল।
সিমানকে দেখে মনে হচ্ছিল, এই লড়াইটাই ওর একমাত্র পৃথিবী। একটু আগেই ও ‘রেড’ ফাইটার জিতবে বলে আট হাজার টাকা বাজি ধরেছে। যদি ও জেতে তা হলে হাতে-হাতে পাবে ষোলো হাজার টাকা। তাতে আরও কিছুদিন আনন্দ আর ফুর্তি করা যাবে। বাবার কাছ থেকে ইদানীং হাতখরচের টাকা পেতে একটু অসুবিধে হচ্ছে।
এ-কথাটা মনে হতেই সিমানের মধ্যে একটা বিরক্তির ভাব উথলে উঠল।
লড়াই ক্রমে ভয়ংকর হয়ে উঠতে লাগল। যোদ্ধা দুজন হলোগ্রাম ইমেজ হলে হবে কী, ওদের শরীর রক্ত-মাংসের শরীরের মতোই ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল। হাতে-কপালে কেটে গিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল। মুখ দিয়ে যন্ত্রণার ‘উ:! আ:!’ শব্দও বেরোচ্ছিল।
ঘরের প্রায় সিলিং-এর কাছাকাছি শূন্যে ভেসে আছে একটা হলোগ্রাম স্কোরবোর্ড। তাতে ডিজিটাল হরফে নীল এবং লাল রঙে যথাক্রমে ব্লু এবং রেড-এর পয়েন্ট দেখা যাচ্ছে। লড়াইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পয়েন্ট বাড়ছে—কখনও লালের, কখনও নীলের।
সবকিছু মানুষের মতো হলেও হলোগ্রাম ফাইটাররা লড়াই করছিল অতিমানবের মতো। এমন সব মার কিংবা মারপ্যাঁচ ব্যবহার করছিল যা একমাত্র সিনেমার স্পেশাল এফেক্টের মাধ্যমে দেখানো সম্ভব। ওদের লড়াইয়ের অভিনব মুভগুলো দেখতে-দেখতে দর্শকের দল উত্তেজনায় চিৎকার করছিল।
