স্ট্রেচার দুটো নিয়ে ওরা পাঁচজন চলে যেতেই স্যাটেলাইট ফোন পকেটে ঢোকালেন শ্রীধর। তারপর হাততালি দিয়ে হাত ঝাড়লেন। বেরিয়ে এলেন ‘ভিজিটর’ রুম ছেড়ে।
এবার রঙ্গপ্রকাশের সঙ্গে ওঁর ইকনমিক ইনডেক্স নিয়ে কথা বলতে হবে।
কনফারেন্স রুম নাম্বার ওয়ানে শ্রীধর পাট্টা যখন এসে ঢুকলেন, তখন ওঁকে দেখে রঙ্গপ্রকাশের মনে হল এতক্ষণ ‘ভিজিটর’ রুমে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো শ্রীধরের জীবনে যেন ঘটেনি—তিনি এতটাই স্বাভাবিক।
শ্রীধরও রঙ্গপ্রকাশকে দেখছিলেন। দেখে বুঝতে চাইছিলেন, শ্রীধরের শত্রু প্রতিরোধের অদ্ভুত পদ্ধতির লাইভ ডেমনস্ট্রেশান রঙ্গপ্রকাশ ঠিকঠাক দেখেছেন কি না।
রঙ্গপ্রকাশ যে সেটা দেখেছেন সেটা ওঁর মুখচোখের চেহারা দেখেই বুঝতে পারলেন শ্রীধর। কিন্তু সামান্য হেসে অত্যন্ত স্বাভাবিক সুরে বললেন, ‘আসুন, ডক্টর—বসুন। আমাদের বাকি আলোচনাটুকু সেরে নিই। ওই যে, ইকনমিক ইনডেক্স…।’
আবার মুখোমুখি বসলেন দুজনে।
‘ইকনমিক ইনডেক্সটাকে আপগ্রেড করার ব্যাপারে আপনি কিছু ভাবছেন?’ গায়ের কালো টি-শার্ট থেকে কাল্পনিক ধুলো ঝাড়তে-ঝাড়তে শ্রীধর পাট্টা জিগ্যেস করলেন।
রঙ্গপ্রকাশ কিছুক্ষণ আমতা-আমতা করলেন। বোধহয় সঠিক উত্তর খুঁজতে চাইছিলেন। তারপর বললেন, ‘ভেবেছি…তবে ডেফিনিট পথ কিছু খুঁজে পাইনি। ভাবছি…ভাবছি কারও কাছে লোন নেব…।’
‘যদি তাই মনে হয় তা হলে নিন।’ ভুরু উঁচিয়ে বললেন শ্রীধর, ‘কিন্তু দেখবেন, আপনাকে লোন দিতে গিয়ে তার ই-আই-টা যেন ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে না চলে যায়।’
ক্রিটিক্যাল ভ্যালু। কী সুন্দর কথা! সব জিনিসেরই বোধহয় একটা ক্রিটিক্যাল ভ্যালু থাকে। জীবনেরও। ভাবলেন ডক্টর।
যেমন শ্রীধরের মতে জিশানের দাম ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে। না, ভুল ভেবেছেন রঙ্গপ্রকাশ। শ্রীধরের কাছে বোধহয় সবার জীবনের দামই ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে। শুধু নিজের জীবনটা ছাড়া।
‘না, স্যার।’ শ্রীধরের মন্তব্যের জবাব দিলেন, ‘সেটা আমি খেয়াল রাখব…।’
খেয়াল রাখবেন বটে, কিন্তু রঙ্গপ্রকাশ টাকা ধার নেবেন কার কাছে? মনে-মনে বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজনের তালিকার ওপরে অনুসন্ধানী নজর বুলিয়ে নিলেন।
না:, সেরকম কেউ নেই। এমনকী শ্বশুরবাড়ির কথাও ভাবলেন। সেখানেও সমাধান অমিল। কারণ, পর্ণমালাদের বাড়ির অবস্থা এমন যে, রঙ্গপ্রকাশকে ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর ওপরে তুলতে গেলে ওদের ইকনমিক ইনডেক্স ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে চলে যাবে।
এ ছাড়া, কারও কাছ থেকে লোন পেলেও রঙ্গপ্রকাশের আরও একটা সমস্যা রয়েছে। সিমানের যা লাইফস্টাইল তাতে লোন নেওয়া টাকা উড়িয়ে দিতে ও খুব বেশি সময় নেবে না। ই-ল্যান্ড আর কমপিটিশানের গেমগুলোই ওর দফারফা করে দেবে।
একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বুক ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল। আর মাত্র তিন মাস সময়। মানে নব্বই দিন। তার মধ্যে আজ একটা দিন পার হয়ে গেল। বাকি থাকবে উননব্বই দিন। তার মধ্যে যা হোক কিছু একটা করতে হবে।
শ্রীধর যেন ডক্টরের হিসেবটা মনে-মনে পড়ে ফেললেন। বললেন, ‘আজকের দিনটা বাদ দিলে আর মাত্র উননব্বই দিন…। কাউন্ট ডাউনটা খেয়াল রাখবেন, ডক্টর…।’
আচ্ছা, শ্রীধরকে কি সিমানের কথা বলা যায়? বলা যায় উড়নচণ্ডী নেশাতুর ছেলের কথা? ওঁর কথা শুনে শ্রীধর হাসবেন না তো?
‘একটা কথা বলব, স্যার?’
‘কী কথা?’ ভুরু কুঁচকে তাকালেন শ্রীধর : ‘বলুন…।’
শ্রীধর জানেন, রঙ্গপ্রকাশ কখনওই নিজের জন্য কোনও সুবিধে চান না। শ্রীধরের পার্সোনাল থেরাপিস্ট হওয়ার সুবাদে তিনি শ্রীধরের অনেক কাছাকাছি আসার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে অনেক সুযোগ চাওয়ারও সুযোগ পেয়েছেন—কিন্তু চাননি।
মানুষটার জন্যে শ্রীধরের করুণা হল। আত্মসম্মান আর আত্মমর্যাদা বড় জ্বালা!সবসময় অন্তরে-অন্তরে জ্বালিয়ে মারে। দেখি মানুষটা কী বলতে চায়। ভাবলেন শ্রীধর। যদি কোনও সুযোগ চায় বা টাকা ধার চায় তা হলে শ্রীধর এককথায় দিয়ে দেবেন। আজ কেন যেন ডক্টর বিশ্বাসের প্রতি শ্রীধরের দক্ষিণ্যের একটা ঝোঁক চেপেছে।
‘আমার ছেলেকে ফেরানো যায় না?’ রঙ্গপ্রকাশের গলাটা সর্বহারার মতো শোনাল।
শ্রীধর পাট্টা কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। প্রশ্নটার অর্থ ওঁকে পাশ কাটিয়ে গেল।
‘ফেরানো মানে?’
‘ফেরানো মানে…’ রঙ্গপ্রকাশ মরিয়া হয়ে বলতে শুরু করলেন। কার সামনে তিনি কী বলছেন সেটা ভুলে গেলেন : ‘সিমান…মানে, আমার ছেলে…ও…ও খুব বাজে রাস্তায় চলে গেছে। ও নেশা করে। সুপারগেমস কর্পোরেশনের কমপিটিটিভ গেমসগুলোয় পাগলের মতো বাজি ধরে। ওকে…ওকে দেখে মনে হয়…মনে হয়…ওটাই জীবন। এসব ছাড়া জীবনে আর কিছু নেই। ওর…ওর নেশার খিদে মেটাতে গিয়ে আমার সমস্ত সেভিংস তলানিতে এসে ঠেকেছে। আমার ই. আই. ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে নেমে গেছে।’ দু-হাতে মাথা আঁকড়ে ধরলেন রঙ্গপ্রকাশ। কান্নার দমক ছিটকে বেরোতে চাইল গলা দিয়ে। ওঁর চোয়াল দুটো ব্যথা করছিল, চোখ জ্বালা করছিল। কান্না চেপে কোনওরকমে বললেন, ‘স্যার, বিশ্বাস করুন…আমাদের তিনজনের জীবনটাই ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে নেমে গেছে। সিমানকে যদি ফেরাতে পারি তবেই আমি আর পর্ণমালা সবচেয়ে বেশি খুশি হব। বুঝব, আমাদের তিনজনের লাইফ ইনডেক্স ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর ওপরে উঠেছে। সেই জীবনগুলোকে নিয়ে বাঁচা যায়।’ মাথা থেকে হাত সরালেন রঙ্গপ্রকাশ। সজল চোখে শ্রীধরের দিকে তাকালেন। স্থান-কাল-পাত্র ভুলে আচমকা আবেগে শ্রীধরের হাত দুটো চেপে ধরলেন : ‘স্যার, প্লিজ হেল্প করুন। আমার…আমার ছেলেটাকে ফেরানোর পথ বলুন। ওকে বাঁচান। প্লিজ, স্যার…।’
