প্রথম-প্রথম জিশানের আরাম লাগছিল, কিন্তু দশ-পনেরো সেকেন্ড পার হতেই চিড়বিড়ে চুলকুনি জিশানকে অস্থির করে তুলল। কিন্তু তা সত্বেও ও দাঁতে দাঁত চেপে ওই অদ্ভুত চুলকুনি সহ্য করতে লাগল।
ব্যাপারটা ক্রমেই তীব্রতায় বাড়তে লাগল। মিষ্টি এবং তীব্র চুলকুনি। তাতে কোনও জ্বালা নেই, কোনও যন্ত্রণা নেই। কিন্তু জায়গাটা চুলকোতে না পারার কষ্ট জিশানকে ক্ষিপ্ত করে তুলল। ওর হাত-পা শক্ত বাঁধনে বাঁধা জেনেও ও হাত-পায়ের বাঁধন ছাড়াতে চাইল। তাতে যা হওয়ার তাই হল। স্টিল ব্যান্ডের সঙ্গে ঘষটানিতে ওর কবজি এবং গোড়ালির গাঁট ছড়ে যেতে লাগল।
শ্রীধর পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে জিশানের দশাবিপর্যয় লক্ষ করছিলেন আর মুচকি-মুচকি হাসছিলেন।
জিশানের দেহটা ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে শূন্যে উঠছিল আর শব্দ করে মসৃণ টেবিলে আছড়ে পড়ছিল। একইসঙ্গে ও মাথা ঝাঁকাচ্ছিল এপাশ-ওপাশ। আর ওর হাতের আঙুলগুলো বারবার বাতাস আঁকড়ে ধরছিল। মনে হচ্ছিল, ও বাতাসের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে, আপ্রাণ বাঁচতে চেষ্টা করছে।
জিশান পাগলের মতো ছটফট করছিল বটে কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও আর্ত শব্দ করতে চাইছিল না। কারণ, শ্রীধর পাট্টার সামনে এই প্রায়-উলঙ্গ অবস্থায় অসহায়ভাবে চিৎকার করাটা প্রায় প্রাণভিক্ষার কাতর অনুনয়ের মতো শোনাতে পারে। সেটা জিশান কিছুতেই করতে চায় না। তাই ও প্রাণপণে আত্মসম্মান রক্ষার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু তা সত্বেও চাপা গোঙানির মতো একটা শব্দ জিশানের গলার ভেতর থেকে উথলে উঠছিল।
বিছুটিপাতা গায়ে ঘষলে কীরকম চুলকোয় জিশান জানে না। কিন্তু ও নিশ্চিতভাবে বলতে পারে, এই ঝিকিমিকি তরলের ক্ষমতা বিছুটিপাতার চেয়েও অনেক বেশি। কারণ জিশানের সর্ব অঙ্গে চুলকুনির এমনই ফুলঝুরি ছুটছিল যে, ওর মস্তিষ্ক ঠিক-ঠিকভাবে চিন্তা করতে পারছিল না।
তবুও জিশান মিনি আর শানুর কথা ভাবতে লাগল।
শ্রীধর পাট্টা ওকে জিগ্যেস করলেন, ‘বাবু জিশান, কাল রাতে তুমি জিপিসির বাইরে বেরিয়েছিলে?’
যে-চিৎকার জিশান এতক্ষণ ধরে প্রাণপণে চেপে রেখেছিল সেটাই শ্রীধরের প্রশ্নের উত্তর হয়ে আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের মতো ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এল : ‘না! না! না! না! না!’
শ্রীধর চওড়া হাসলেন : ‘তুমি তা হলে কাল রাতে তোমার কোয়ার্টার ছেড়ে বেরোওনি?’
আবার ছিটকে বেরোল সেই লাভাস্রোত : ‘না-না-না-না-না!’
জিশান পান্ডার কথা ভাবছিল। ওর সেই অভিব্যক্তিহীন ঠান্ডা দৃষ্টি। যে-দৃষ্টিতে স্থির প্রতিজ্ঞা ঝিলিক মারছিল। অথচ ওর শরীর তখন অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত।
জিশান হিমশীতল চোখে শ্রীধরের দিকে তাকাল। মনে-মনে ভাবল, ও যেন বেরিয়ে এসেছে নিজের দেহের বাইরে। শূন্যে ভেসে বেড়াতে-বেড়াতে ও তাকিয়ে দেখছে নিজের ছটফটানো শরীরের দিকে। দেখছে শ্রীধরের অহঙ্কার। ওঁর ক্ষমতা আর প্রভুত্ব মেশানো বেপরোয়া অভিব্যক্তি।
নিজের অনুভূতির সুইচ অফ করে দিল জিশান। অন্তত অফ করে দিতে চেষ্টা করল। মনে-মনে ভাবল, আর কতক্ষণ এই অমানুষিক অবস্থা চলবে কে জানে!
দূরের টেবিলে বসে গণপত আচারিয়া জিশানের প্রতিটি প্রতিক্রিয়া খুঁটিয়ে লক্ষ করছিলেন আর নোট নিচ্ছিলেন। মাঝে-মাঝে চক্রপাণির সঙ্গে চাপা গলায় কীসব আলোচনা করছিলেন।
চক্রপাণি হঠাৎই এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘অ্যামেজিং এনডিয়োর্যান্স! আর কেউ এতটা সহ্য করতে পারত না…।’
আচারিয়া বললেন, ‘তা হলে কি আমাদের কেমিক্যালটা ততটা স্ট্রং হয়নি? কিন্তু আমরা নরম্যাল কোনও মানুষকে যে-অ্যামাউন্টের কেমিক্যাল অ্যাপ্লাই করে রেজাল্ট পাই জিশানকে তার অ্যাপ্রক্সিমেটলি থ্রি টাইমস অ্যাপ্লাই করেছিলাম। তাতেও তো দেখছি…।’
‘এখন এসব ডিসকাশন থাক—’ আচারিয়াকে থামিয়ে দিলেন চক্রপাণি। চাপা গলায় বললেন, ‘মার্শাল এসব কথা শুনলে প্রবলেম হতে পারে। বরং আমরা এই কনক্লুশানই জানাব যে, জিশান পালচৌধুরী নরম্যাল মানুষ নয়—ওর এনডিয়োর্যান্স ফ্যাক্টর অ্যাবনরম্যালি হাই। জিশান ইজ অ্যান একসেপশান…।’
চক্রপাণির কথায় সায় দিয়ে আচারিয়া চুপ করে গেলেন। তারপর কবজির ঘড়ির দিকে তাকালেন। ছোট্ট করে বললেন, ‘টাইম ইজ আপ—।’
এ-কথা বলার দশ-বারো সেকেন্ডের মধ্যেই জিশানের চুলকুনি কমতে লাগল। ও চোখ বুজে হাঁপাতে লাগল। ওর বুক ওঠা-নামা করতে লাগল। হাপরের শব্দ বেরোতে লাগল মুখ দিয়ে।
শ্রীধর পাট্টার মুখের সূর্যোদয়ের মুচকি হাসি মিলিয়ে গিয়েছিল। তার বদলে সূর্যাস্ত নেমে আসছিল। হিমশীতল ইস্পাতের প্রলেপ ছড়িয়ে পড়ছিল মুখের ওপরে।
হারতে শ্রীধরের ভালো লাগে না। কিন্তু নিতান্তই যদি হারতে হয় তা হলে পরমুহূর্ত থেকেই পরের লড়াইয়ের জন্য তৈরি হতেও জানেন তিনি।
সুতরাং শ্রীধর চোয়াল শক্ত করলেন। দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের দিকে ইশারা করলেন। বললেন জিশানের বাঁধন খুলে দিতে। তারপর ধীরে-ধীরে পা ফেলে আচারিয়া আর চক্রপাণির টেবিলের কাছে ফিরে গেলেন।
স্টিল ব্যান্ডের বাঁধন খুলে যেতেই জিশান টেবিলে উঠে বসল। মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁপাতে লাগল। ওর শরীরে সামান্য জ্বালা-জ্বালা ভাব চিড়বিড় করছিল। ও কবজির ছড়ে যাওয়া জায়গার জ্বালা কমাতে কবজি দুটো কয়েকবার চেপে-চেপে ধরল, হাত বোলাল পায়ের গোড়ালির গাঁটের কাছটায়। হাত বুলিয়ে আর হাত চেপে শুশ্রূষা করতে চাইল। তারপর পাছায় ভর দিয়ে শরীরটাকে নব্বই ডিগ্রি ঘুরিয়ে টেবিল থেকে নেমে দাঁড়াল। লক্ষ করল, ওর ফরসা শরীর বেশ লালচে হয়ে গেছে।
