কর্নেল বললেন, এর তলায় ডঃ মহাপাত্রের নোট রয়েছে। লিখেছেন, বাগদাদের নিয়ে গবেষণার সময় ওদের একটি লোক-কথায় মির্জা মেহেদি খানের বর্ণিত ঘটনার সূত্র রয়েছে। বাগাদা ওঝারা নাকি বংশপরম্পরায় সেই ধনরত্নের সন্ধান জানে। ওই ওঝাদের কিন্তু কৃত্রিম লেজ থাকে।
ডঃ অর্জুন সিং অভ্যাসমতো হো হো করে হেসে বললে, লোক-কথা? লোক-কথা মানেই। গালগল্প!
১.১৮ কিংবদন্তির শঙ্খচূড়
শেয়ালের ফাঁদ
জয়রামবাবু বললেন, মানুষের মতো মানুষের মুখের ভাষাকেও রোগে ধরে। ষট্গর্ভ কথাটা রোগে ভুগে দাঁড়িয়েছে সাতগড়ায়। এ যেন সুকুমার রায়ের গল্পের মতো ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল! ছিল ষট্রগর্ভ হয়ে গেল সাতগড়া!
খিকখিক করে হাসতে হাসতে লাগলেন আমাদের গৃহস্বামী জয়রাম সিঙ্গিমশাই। এখন আমরা অবশ্য ওঁর গৃহে নেই। ওঁর ফার্ম চক্কর দিয়ে অধিক ফলনশীল ভুট্টাক্ষেতের পাশে একটা নালার ধারে প্রকাণ্ড পাথরে বসে আছি। ডাইনে টিলার মাথায় সূর্য কাত হয়ে গড়াচ্ছে। শেষবেলার নরম রোদে সবুজ শস্য এবং গাছগাছালি ঘুম ঘুম চোখে দাঁড়িয়ে আছে! বাতাস বইছে না। কিন্তু গরমটা কমে গেছে। বাস! এখানে জুনমাসে কী প্রচণ্ড গরম, কল্পনা করা যায় না। এই গরমে কর্নেলের মাথায় বিদঘুটে বাতিক গজিয়ে উঠল। সাতগড়া নিয়ে এলেন টানতে টানতে। এসে থেকে মনটা খালি পালাই পালাই করছে।
সিঙ্গি মশাইয়ের বয়স বোধ করি বাহান্ন-পঞ্চান্নর মাঝামাঝি হবে। চেহারায় পোড় খাওয়া ভাব আছে। স্বাস্থ্যও চমঙ্কার। গায়ে ছাইরঙা স্পোর্টস গেঞ্জি, পায়ে গামবুট, মাথায় নীলচে রোদ-টুপি। একটা গাঁট্টা মারকুটে চেহারার কালো অ্যালসেশিয়ানের চেন ওর ডান হাতের মুঠোয়। বাঁহাতে একটা ছড়ি। কুকুরটা মাঝে মাঝে মুখ তুলে কী যেন দেখছে আর ছুটে যেতে চেষ্টা করছে। আতঙ্কে তার দিকে নজর রেখেছি। কুকুরটা আমার দুচক্ষের বিষ। হতচ্ছাড়া প্রাণীটা যেন তা টের পেয়েছে এবং দু-একবার মনিবের পায়ের কাছ থেকে ঘাড় বেঁকিয়ে লাল চোখে আমাকে গরগর করে শাসাচ্ছে।
আশ্চর্য, কুকুরটা কর্নেলের হাঁটুর কাছটা শুকছে। বুড়োকে কেন ওর অত পছন্দ হয়ে গেল ভেবেই পাচ্ছি না। সে কি ওঁর সায়েবি চামড়া আর সাদা দাড়ির জন্য? শালুক চিনেছে। গোপালঠাকুর!
জয়রামবাবু গর্ভের কাহিনী বলছেন। আমার চোখ-কান-মন কুকুরটার দিকে। একটু পরে কী ভাবে কুকুরটা ছাড়া পেয়ে গেল কে জানে! চেনসুন্ধু দৌড়ে গেল বেঁটে চওড়া পাতাওয়ালা গাছগুলোর দিকে। জায়গাটা ঘন ঘাস, ঝোপঝাড় আর শুকনো পাতায় ঢাকা। জয়রামবাবু একবার ধমক দিলেন, জনি! কাম ব্যাক। তারপর একটু হেসে বললেন, দেখুন না মজাটা! চেন কোথাও আটকে গিয়ে জব্দ হবে।
কুকুরটা ততক্ষণে গতি কমিয়ে একখানে গিয়ে থেমেছে এবং জিভ বের করে সামনে তাকিয়ে। জয়রামবাবু, বললেন, হ্যাঁ—যা বলছিলুম। ষটগর্ভ। তার মানে ছটা গুহা। ওই যে প্রায় ন্যাড়া পাহাড়টা দেখছেন দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, ওখানেই আছে পাশাপাশি ছটা গুহা। পাঁচটা গুহাই ভেতরে ধস ছেড়ে বন্ধ হয়ে গেছে কোন যুগে! একটা অক্ষত আছে।
জিজ্ঞেস করলুম।ভেতরে ঢুকেছেন নাকি?
সিঙ্গিমশাই বললেন, যতবার ঢোকার চেষ্টা কেউ করেছে, ততবারই সাপের তাড়া খেয়ে পালিয়েছে। আমাকে তো তাড়া করে আমার ফার্ম অবধি এসেছিল। সে কে মারাত্মক অভিজ্ঞতা।
কী সাপ?
শঙ্খচূড়। জয়রামবাবু একটু হাসলেন। বললেন, গুলি করে মেরে ফেলিনি কেন? আপনারা তো দেখেছেন, বিষধর সাপ আমি মারি না, ধরি। এক্সপেরিমেন্ট করি। বিশেষ করে ওই শঙ্খচূড় সাপটাকে ধরার জন্য কত যে চেষ্টা করেছি, ব্যর্থ হয়েছি। সাপটা মশাই মানুষের চেয়ে ধূর্ত। কর্নেল সায়েবি এবার যদি কিছু করতে পারেন।
বলে উনি কর্নেলের দিকে ঘুরলেন। আমিও ঘুরে কর্নেলের দিকে তাকালাম। ওহে ধুরন্ধর ঘুঘু বুড়ো, তাই তোমার এই ভয়ঙ্কর জুন মাসে সাতগড়া আগমন। চোখে চোখ পড়লে প্রকৃতিবিদ বৃদ্ধ কাঁচুমাচু হাসলেন। তারপর একটু কেশে বললেন, ইয়ে—মিঃ সিংহ, আপনারা গল্প করুন। আমি নালার ধারটা ঘুরে আসি।
পাথরটা থেকে লাফ দিয়ে নেমে সোজা নালার ধারে কর্নেল কিছুটা এগোলেন। তারপর হাঁটু দুমড়ে বসলেন। তারপর ওঁর চিরাচরিত খেলা শুরু হয়ে গেল। একবার এদিকে একবার ওদিকে গুড়ি মেরে এগোচ্ছেন, কখনও কাত হয়ে প্রায় শুয়ে পড়েছেন ঘাসের ভেতর-এবং চোখে বাইনোকুলার। অ্যালসেশিয়ানটা হকচকিয়ে গেছে যেন বুড়োর কাণ্ড দেখে। গরগর করে দুঠ্যাঙে বসে দুঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে কুকুরী পদ্ধতিতে।
সিঙ্গিমশাই অবাক হয়ে বললেন, কী ব্যাপার বলুন তো জয়ন্তবাবু?
মুচকি হেসে বললুম আবার কী? কোনও বিরল প্রজাতির পাখি-টাখি দেখেছেন।
তাই বলুন। বলে জয়রামবাবু প্যান্টের পকেট থেকে পাইপ বের করলেন।
আমার চোখ কর্নেলের দিকে যতটা না, ততটা কুকুরটার দিকে। একটু পরে দেখি, কর্নেল বেঁটে গাছগুলোর দিকে দৌড়ুচ্ছেন। ফাঁকা ঘাসজমিটায় গিয়েই কর্নেল আচমকা অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি দারুণ চমকে উঠলুম। এ যে অবিশ্বাস্য ব্যাপার! চারদিকে অনেকটা ফাকা ওখানে। জলজ্যান্ত একটা মানুষকে জাদুকর যেমন স্টেজে অদৃশ্য করে দেয়, এও যেন তেমনি।
জয়রামবাবুও পাইপ সাফ করতে করতে দেখেছিলেন ব্যাপারটা। ওঁর চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠতে দেখলুম। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন, সর্বনাশ! অ্যালসেশিয়ান ততক্ষণে কর্নেলের শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার জায়গায় পৌঁছে গেছে এবং গরগর করে ঘাস শুকছে। জয়রামবাবু পাথর থেকে লাফ দিয়ে দৌড়তে শুরু করলেন। আমিও ভ্যাবাচাকা খেয়ে ওঁকে অনুসরণ করলাম।
