কথাটা শুনতে পেয়ে চণ্ডী বলল,–কাল সন্ধ্যাবেলায় দেখেছিলুম এক সাধুবাবা এসে জুটেছেন।
কর্নেল আমার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন,–তাহলে জয়ন্তের ইচ্ছে পূর্ণ হোক। সুবিমল! কোথায় সেই শ্মশানঘাট? শর্টকাটে যেতে চাই কিন্তু!
সুবিমল বলল,–তাহলে নদীর ধারে বাঁধের পথে চলুন। ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে একটুখানি এগোতে হবে।
পূর্ববাহিনী বেহুলার দক্ষিণ তীরে বাঁধের দুধারে ঘন গাছপালা আর ঝোঁপঝাড়, একটা জেলেবসতি বাঁদিকে চোখে পড়ল। একটা একতলা ঘরের মাথায় টাঙানো আছে ‘বাবুগঞ্জ-ঝাঁপুইহাটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, লেখা সাইনবোর্ড। কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পর নদীর ব্রিজের এদিকটায় দুধারে দোকানপাট আর ভিড়। ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে আবার বাঁধ এবং গাছের সারি। তারপর নদী যেখানে উত্তরে বাঁক নিয়েছে, সেখানে উঁচু জমির ওপর একটা বিশাল বটগাছ। কর্নেল মাঝে-মাঝে বাইনোকুলারে হয়তো পাখি দেখছিলেন। সুবিমল বলল,–এসে গেছি স্যার!
চওড়া উঁচু জায়গাটা ছাইভর্তি। ঘাসে ঢাকা বটতলার ওদিকটায় ইতস্তত চিতার ছাই। সেই ছাই উত্তরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। বাঁধ থেকে সেখানে কয়েক পা এগিয়ে তারপর ‘সাধুবাবা’ কে চোখে পড়ল। সামনে ধুনি জ্বেলে গায়ে কম্বল জড়িয়ে তিনি বসে আছেন। হা-গোয়েন্দাপ্রবরই বটে! আমাদের দেখামাত্র তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
সুবিমল একটু দূরে হাঁটু মুড়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করছে দেখে হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু · কর্নেল চোখের ইঙ্গিতে আমাকে দূরে থাকতে বললেন। আমি আস্তে বললুম,–সুবিমলবাবু! সাধুবাবা খুব রাগী মানুষ মনে হচ্ছে। পাশেই ত্রিশূল পোঁতা। কিছু বলা যায় না, হঠাৎ ত্রিশূল ছুঁড়ে মারতে পারেন। চলুন, ওপাশে ওই নিমগাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। কর্নেলের ব্যাপার তো জানেন! উনি সাধুদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তুলতে পারেন।
নিমতলায় দাঁড়িয়ে লক্ষ করলুম। কর্নেল অবিকল সুবিমলের মতো হাঁটু মুড়ে নমো করলেন। তবে টুপিপরা মাথা মাটিতে ঠেকানোর অসুবিধে আছে। তারপর দেখলুম, দুজনে কী সব কথা হচ্ছে।
সুবিমল সতর্কভাবে একটু হেসে ফিসফিস করে বলল,–বুঝলেন জয়ন্তবাবু! সাধুবাবা কর্নেলসায়েবকে বিদেশি সায়েব ভেবেছেন। আমি সাধুবাবাদের এই ব্যাপারটা দেখেছি। সায়েব-মেমদের খাতির করে।
একটু পরে কর্নেল এসে বললেন,–সাধুবাবার আশীর্বাদ নিয়ে এলুম।
আমি বললুম,–তাহলে আমিও আশীর্বাদ নিয়ে আসি?
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–সাধুবাবা প্রতিদিন মাত্র একজনকে আশীর্বাদ করেন। তারপর যারা যায়, তাদের অভিশাপ দেন। ভাগ্যিস আজ সারাদিন ওঁর কাছে কেউ যায়নি। নইলে আমাকে অভিশাপ দিতেন। এ এক সাঙ্ঘাতিক সাধু। চলোলা সুবিমল। এখান থেকে কেটে পড়ি।
সুবিমল বাঁধে উঠে বলল,–জয়ন্তবাবু নিশ্চয় মড়ার খুলিগুলো দেখতে পেয়েছেন?
বললুম,–হ্যাঁ! দেখলুম, কত খুলি গাছের শেকড়ে আটকে আছে।
সুবিমল হঠাৎ ফুঁসে উঠল। ওই হতভাগা প্রজাদের অভিশাপেই তো মুখুজ্যেদের জমিদারি ধ্বংস হয়ে গেছে।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জমিদারিপ্রথা উচ্ছেদ করা হয়েছিল স্বাধীনতার পরে, হতভাগ্যদের অভিশাপ দেরি করে লেগেছিল।
–দেরি কী বলছেন স্যার! প্রথম মুখুজ্যের ঠাকুরদার আমলেই নাকি সাংঘাতিক কাণ্ড হয়েছিল। তখন আমার জন্মই হয়নি। ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনের কথা বইয়ে পড়েছি। আপনারা তো আমার চেয়ে বেশি জানেন। বাবার মুখে শুনেছিলুম, আগস্ট মাসে তখন প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল ক’দিন ধরে। একরাত্রে স্বদেশিবাবুরা জমিদারের খাজাঞ্চিখানা লুঠ করেছিলেন। অনেক ধনরত্নও নাকি লুঠ হয়েছিল। শোনা কথা, জয়গোপালবাবুর ঠাকুরদা ছিলেন খাজাঞ্চিবাবু। ঝড়জলের জন্য তিনি বাড়ি যেতে পারেননি। তাঁকে বেঁধে রেখে লুঠ চলেছিল। শেষরাত্তিরে বিনয়বাবু-খাজাঞ্চি, কোনোভাবে বাঁধন খুলে পালিয়ে আসেন। তবে শোনা কথা স্যার। খাজাঞ্চিবাবু নাকি বিপ্লবীবাবুদের লুঠ-করা জুয়েলসের কিছুটা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। তাই নিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড বেধেছিল। পুলিশ বিনয়বাবুকে জেল খাটাতে চেয়েছিল। প্রমাণের অভাবে তিনি খালাস পান। তবে জমিদারবাবুদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন।
কর্নেল বললেন,–তারপর?
–বছর আট-দশ পরে বিনয়বাবু বাবুগঞ্জে ফিরে আসেন। জমিদারবাবুদের অবস্থা ততদিনে পড়ে গেছে। দালানকোঠা মেরামতের অভাবে ধ্বসে পড়েছে। ওই যে বলছিলুম, অভিশাপ!
–তাহলে জয়গোপালবাবুর ঠাকুরদা নিরাপদে বাড়ি-ঘর তৈরি করে বসবাস করতে পেরেছিলেন?
–হ্যাঁ স্যার। এখনও সেই তিনকামরা একতলা বাড়ি আছে।
–চলো সুবিমল! সেই বাড়িটা বাইরে থেকে দেখে বাবুগঞ্জের ভিতর দিয়ে বাংলোয় ফিরব। ব্রিজের কাছে আসতেই দেখলুম, একটা লোক লাঠি হাতে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে এদিকে আসছে। গায়ে সোয়েটার। মাথায় মাফলার জড়ানো। আর পরনে যেমন-তেমন প্যান্ট, পায়ে চপ্পল, লোকটা যে নেশা করেছে, তা বোঝা যাচ্ছিল। সুবিমলকে দেখেই সে বলে উঠল,–এই যে বাবা হারাধন।
সুবিমল ধমকের সুরে বলল,–মাতলামি করবে না প্রবোধদা! দেখছ না আমার সঙ্গে কারা আছেন?
জয়গোপালবাবুর মুখে তার পিসতুতো ভাই প্রবোধের কথা শুনেছিলুম। এই সেই প্রবোধ। সে জড়ানো গলায় হেসে বলল,–মাইরি সুবিমল! আমার খালি ভুল হয়! ছেলেকে দেখলেই বাপের নাম বলে ফেলি। হ্যাঁ! তুমি ঝাঁপুইহাটির হারাধনের ছেলে সুবিমল। বাবা সুবিমল! সাবধান! জুতো হারিয়ো না যেন! জুতো হারাতে-হারাতে শেষে নিজেই হারিয়ে যাবে! মাইরি বলছি! আমাদের গোপাল! জয়গোপালের জুতা হারাত না? শেষে আজ শুনি সে নিজেই হারিয়ে গেছে। হিমি কেঁদেকেটে থানাপুলিশ করে বেড়াচ্ছে। এই বাবা সায়েব! গিভ মি টেন রুপি! ওনলি টেন।
