‘আমি দেখেছি : সৌরবর্ষের ষষ্ঠ মাসে চাঁদের প্রথম তিথিতে একজন লোক একটা ঘোড়া নিয়ে সিন্ধুনদের তীরে ত্রিকোণ ভূমিতে উপস্থিত হল। ঘোড়ার পিঠে একটা বাক্স ছিল। সে বাক্সটা শস্যক্ষেত্রের সীমানায় একটি বৃক্ষের নীচে পুঁতে রাখল।‘
বললুম,–‘আমি দেখেছি’-টা কোথায় পাচ্ছেন?
কর্নেল হতাশভঙ্গিতে বললেন,–তা হলে সব প্রাচীন লিপির ইতিহাস তোমাকে শোনাতে হয়। আপাতত সে-সময় হাতে নেই। শুধু জেনে রাখ, সব প্রাগৈতিহাসিক ফলক বা শিলালিপি বা সীলমোহর যা কিছু লেখা আছে, সবের গোড়ার ধরে নিতে হবে, কেউ কিছু বলছেন কিংবা ঘোষণা করছেন। অর্থাৎ প্রত্যেকটি লেখা ব্যক্তিগত উক্তি। আজকালকার মতো নৈর্ব্যক্তিক নয়। কোনো পুরোহিত বা কোনো রাজা বা কেউ না কেউ কিছু স্থায়ীভাবে অন্যান্য মানুষকে জানাতেই ওগুলো লিখেছেন। নিজে না লিখুন, লিপিকারকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন। কাজেই সব লেখার গোড়ায় ‘আমি দেখেছি’ বা ‘আমি বলছি এই কথাটা ধরে নিতেই হবে। এই ফলকে একটা ঘটনার কথা লেখা রয়েছে। কাজেই …।
বাধা দিয়ে বললুম,–বেশ, তাই। তা হলে পাথরের বাক্সেও অবিকল একই লেখা এল কী ভাবে?
–এর একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। সে লোভ সামলাতে না পেরে রাজা হেহয় এবং তার ঘোড়াটিকেও হত্যা করেছিল। তারপর তখনকার প্রথা অনুসারে পালিত পশু হিসাবে ঘোড়ার চোয়াল একটা পাথরের সিন্দুকে ভরে ওই গুহায় সমাধিস্থ করেছিল। ঘোড়ার মাথায় ঝোলানো সীলমোহর বা চাকতিটাও সিন্দুকে রেখে দিয়েছিল। কারণ ওটা ঘোড়াটারই একটা সাজ।
–কিন্তু গুপ্তধন?
–বলছি। পাথরের সিন্দুকের গায়েও একই কথা লিখে রাখার কারণ : নিজের জীবনে যে অদ্ভুত ঘটনা ঘটল, তার একটা বিবরণ আরও স্থায়ীভাবে রেখে যেতে চেয়েছিল সে। এবার গুপ্তধনের প্রসঙ্গে আসি। আমরা দুটো লেখাতেই কিন্তু এমন কোনো আভাস পাচ্ছি না, যাতে নিশ্চয় করে বলা যায় ঘোড়ার পিঠে সোনাদানা হীরা-জহরত ছিল। একটা বাক্স-জাতীয় জিনিস চিত্রলিপির ঘোড়ার পিঠে দেখছি এবং তিনটে ডালওয়ালা গাছের তলাতেও শুধু সেই বাক্সই দেখছি। একই চৌকোণা জিনিস এবং মধ্যিখানে একটা বিন্দুচিহ্ন।
–তা হলে কী এমন অমূল্য জিনিস ছিল বাক্সে, যা রাজা হেহয় কাকেও জানতে দিতে চাননি?
-বোঝা যাচ্ছে না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছি মোহেনজোদাড়োবাসী লোভী ও খুনে লোকটি বাক্সর মধ্যে হিরে-জহরত সোনাদানা না পেয়ে নিরাশ হয়ে কিংবা পাপবোধে অনুতপ্ত হয়েই ঘটনাটা লিখে রেখেছিল।
–ভ্যাট! আরও গোলমাল হয়ে গেল সব। তিব্বতি মঠের পুঁথিতে বলা হয়েছে নাকি, রাজা হেহয় ধনরত্ন নিয়েই আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে।
–তিব্বতি মঠের সাধুরাও কি ওই লোকটির মতো ভুল করতে পারে না?
–হ্যাঁ! তা অবশ্য ঠিকই।
এই সময় ফের ফোন বাজল। কর্নেল ফোন তুলে কী শুনে নিয়ে বললেন,–অলরাইট। উই আর রেডি। তারপর ফোন রেখে বললেন,–জয়ন্ত, লাঞ্চের আয়োজন করা হয়েছে। তৈরি হয়ে নাও।…
.
ফকিরসাহেবের কেরামতি
বিকেলে আমরা আবার চলেছি মাহেনজোদাড়োর দিকে। এবার সঙ্গে রীতিমতো মিলিটারি কনভয়। চারটে ট্রাকভর্তি মিলিটারি সামনে ও পিছনে যেন আমাদের জিপটাকে গার্ড দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ তো দেখছি ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে যাওয়ার মতো। আমার অস্বস্তি বেড়ে যাচ্ছিল।
আমাদের জিপে আছেন আর পাঁচজন। কর্নেল, আমি এবং ডঃ তিড়কে বসেছি পেছনে। কর্নেল কামাল খাঁ জিপ চালাচ্ছেন। তাঁর পাশে বসেছেন ডঃ করিম। বুঝতে পারছি, ভারতীয় প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার কড়া আয়োজন করা হয়েছে।
ভারতের অন্যান্য প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা আজ মোহেনজোদাভোর সাত মাইল দূরে একটা বৌদ্ধস্তূপ দেখতে গেছেন। সহকারী নেতা ডঃ দীনবন্ধু আচার্য তাদের নেতা হয়েছে। কারণ মূল নেতা ডঃ তিড়কে আমাদের সঙ্গে এসেছেন।
মোহেনজোদাভোর কাছাকাছি এসে আমাদের জিপ একটা এবড়োখেবড়ো বাজে রাস্তার দক্ষিণে এগোল। বাঁদিকে অজস্র ন্যাড়া টিলার আড়ালে সিন্ধু নদ দেখা যাচ্ছে মাঝে-মাঝে। ডানদিকে রুক্ষ ধু-ধু মরুভূমি বলাই চলে-বালি, পাথর আর কঠিন মাটির দেশ। ছোট-ছোট কাঁটাগাছ আর ক্কচিৎ ঝোঁপঝাড় আছে। সেইসব ক্ষয়াখবুটে ঝোঁপের পাতা মুড়িয়ে খাচ্ছে মস্ত-মস্ত ছাগল আর তাগড়াই গড়নের দুম্বা নামে এক জাতের ভেড়া। কোথাও উটের পিঠে জিনিসপত্র চাপিয়ে দড়ি ধরে ধীরে-সুস্থে চলেছে কোনো মানুষ। মাথায় প্রকাণ্ড পাগড়ি, হাতে একটা লম্বা বর্শা। একখানে জিপসিদের ছোটখাটো একটা দলকে দেখলুম তবু পেতে রান্নাবান্না করছে। ওখানে একটা কুয়ো আছে। একদল ছাগল ভেড়াকে লাইন দিয়ে চৌবাচ্চা থেকে জল খাওয়াচ্ছে রাখালরা। জিপসি মেয়েরা চাকা ঘুরিয়ে জল তুলছে আর অকারণে হাসাহাসি করছে। আমাদের মিলিটারি গাড়িগুলো দেখে কিছুক্ষণ যেন ওরা সবাই ভয় পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
এবার সত্যি বলতে কী কোনো পথই নেই। অসমতল প্রান্তর ও বালিয়াড়ি পেরিয়ে কনভয় চলেছে। ধুলোর মেঘ চলেছে আমাদের সঙ্গে। দম আটকানো অবস্থা।
কর্নেল ও ডঃ তিড়কে চাপাগলায় কী সব আলোচনা করছেন। মাঝে মাঝে পিছু ফিরে সামনের সিট থেকে ডঃ করিমও তাতে যোগ দিচ্ছেন। কিছু বুঝতে পারছি না–শুধু ‘হিটাইট’ শব্দটা বাদে।
এদিকে ধুলোয় ধূসর হয়ে গেছি সবাই। বড্ড বিরক্তিকর লাগছিল যাত্রাটা। একসময় কর্নেলের উদ্দেশে না বলে পারলুম না, আর কতদূর?
