ভয়ে ভয়ে হকুম মেনে একটা কলা ভেঙে নিলাম। খিদেও প্রচণ্ডরকম। কলাটা খুব সুস্বাদু, স্বীকার না করলে পাপ হবে। দুই মিনিহুন গম্ভীর মুখে আমার খাওয়া দেখলে কিছুক্ষণ। তারপর সেইরকম বিদঘুঁটে হুঁ হুঁ করে চলে গেল। দরজাটা আবার দেয়ালের সঙ্গে মিশে গেল।
তাহলে এদের যতটা খারাপ ভেবেছিলাম, ততটা মোটেও নয়। বরং ভদ্র বলেই মনে হচ্ছে। আমি ক্ষুধার্ত টের পেয়ে খাদ্য দিয়ে গেল যখন।
কিন্তু জলতেষ্টা পেয়েছে যে। এবার যদি এককাদি ডাব দিয়ে যেত, কী সুখের না হত। এসব দ্বীপে নারকোল গাছের জঙ্গল হয়ে আছে। লোকের বাগান থেকে এ ব্যাটারা নিশ্চয় কলাগুলো চুরি করে আনে। ডাব পেড়ে আনে না কেন?
কী কাণ্ড! ওরা কি মনের কথা টের পায়? দরজাটা খুলে গেল। তারপর সত্যি সত্যি দুটো মিনিহুন। (এরা নিশ্চয় আগের দুজনই) এক কাঁদি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ডাব এনে বলল,–হুঁ হুঁ হুঁ, হিঁ হিঁ হিঁ উঁয়া উঁয়া।
মুখে মিঠে হাসি রেখে বললাম,–খেতে তো বলছ। কিন্তু ডাব কাটার অস্তর চাই যে। ছুরিটুরি নেই তোমাদের।
ইশারায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলাম। ওরা মুখ তাকাতাকি করল। তারপর দুজনে একটা করে ডাব পটাপট ছেড়ে আর বোঁটার দিকটা হ্যাঁচকা দিকটা হ্যাঁচকা টানে ওপড়ায়। জল ছলকে পড়ে। কী দারুণ জোর ওদের গায়ে!
প্রাণভরে ডাবের জল খেলাম–পর পর তিনটে। পেট ফুলে ঢোল হল। হাত নেড়ে বললাম,–থাক্ থাক্। এই যথেষ্ট হয়েছে বন্ধুরা।
ওরা এবার পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ভূতুড়ে হেসে উঠল, হিঁ হিঁ হিঁ। পিলে চমকানো হাসিরে বাবা। বললাম,–থা। থাক্। আর হাসে না।
ওরা পিটপিটে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
বললাম,–হ্যাঁ–অসংখ্য ধন্যবাদ আমার খুদে বন্ধুরা। এবার দয়া করে আমাকে বাইরে পৌঁছে দাও দিকি।
কে জানে কেন, ওরা আমাকে জিভ ভ্যাংচাতে শুরু করল। দেখে তো বেজায় ভড়কে গেলাম। কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম,–আচ্ছা আচ্ছা। আর বেরুবার নাম করব না। দোহাই বাবা, আর অমন বিচ্ছিরি ভেংচি কাটে না।
ওরা এবার আমাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে শুরু করল। আমেরিকায় বুড়ো আঙুল দেখানোর খুব আনন্দের এবং বন্ধুতার ব্যাপার। আমি ওদের বুড়ো আঙুল দেখাতে থাকলাম। তখন ওরা সাদা দাঁত বের করে ফের হেসে উঠল, হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ।
এক সময় দরজা খুলে গেল এবং তুম্বো চেহারার এক মিনিহুন ঢুকে হুঁ হুঁ করে কিছু বলল। তখন আমার খুদে বন্ধুদ্বয় আমার দুহাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল।
করিডোরে সুন্দর একফালি পথ। সেইরকম আলো জ্বলছে। তলায় তেমনি কার্পেট বিছানো রয়েছে। কিছুদূর চলার পর সামনের দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে দেখি প্রকাণ্ড হলঘরের মধ্যে প্রায় শ’খানেক মিনিহুন গম্ভীরমুখে বসে রয়েছে। উঁচু বেদির ওপর যে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাকে দেখে চমকে উঠলাম।
অবিকল সেই দেবীমূর্তির মতো চেহারাও। গায়ের রঙ উজ্জ্বল সোনালি। কোঁকড়ানো লাল একরাশ চুল মাথায়। পরনে ঝলমলে হলুদ রঙের আলখাল্লার মতো পোশাক।
আমাকে বেদির সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে মিনিহুনদ্বয় সরে গিয়ে ভিতে বসে পড়ল। বেদির মহিলাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতেই বুঝতে পারলাম স্বর্গের কোনো দেবী টেবী নন মোটেও মেমসাহেব না হয়ে যান না।
আমার অনুমান সত্যি হল তখনি। মহিলাটি আমেরিকান উচ্চারণের ইংরাজিতে বলে উঠলেন,–আই অ্যাম দা ফায়ার-গডেস পিলি। আমি অগ্নিদেবী পিলি। সারা প্রশান্ত মহাসাগরের পলিনেশীয় দ্বীপগুলোতে এক সময় আমার স্বামী সূর্যদেব কনটিকি এবং আমার পুজো হত। বর্বর ইউরোপীয় জাতির লোক আমাদের পুজো বন্ধ করে দিয়েছে। তাই ওদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি। আমার হিংস্র হায়েনার দল ওদের সামনে পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। টুকরো-টুকরো করে খেয়ে ফেলে। ওয়েইকাপালির দরজায় খুলি এবং হাড়ের পাহাড় গড়ে তুলেছি। দেখে যেন ওদের শিক্ষা হয়।
আঁতকে উঠে বলে ফেললাম, মাননীয় মহোদয়া! আমি মোটেও ইউরোপীয় নই। আমি একজন ভারতীয়। আমার চেহারা আর গায়ের রঙ দেখুন।
কথাগুলো ‘অগ্নিদেবী’ কানে নিলেন বলে মনে হল না। হেসে উঠলেন। বড় হিংস্র হাসি। আর তার কালো কুচকুচে খুদে ভক্তবৃন্দও একসঙ্গে বিকট ভূতুড়ে হাসি হাসতে লাগল- হিঁ হঁ হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ …
.
শয়তানের কবলে
কিন্তু ততক্ষণে আমার মাথায় অনেক প্রশ্ন জেগেছে। কে এই ‘অগ্নিদেবী পিলি’? বুঝতে পারছি, ইনি একজন মেমসাহেব তো বটেই, এবং আমেরিকান। কারণ মারকিন মহিলাদের মতো নাকিসুরে ইংরেজি উচ্চারণ করছেন। তা ছাড়া ওই ইংরেজিও আমেরিকান ইংরেজি। প্রায় মাসচারেক আমেরিকায় থেকে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে, ব্রিটেন কানাডা আর আমেরিকা তিনটি দেশেই ইংরেজি ভাষায় লোকেরা কথা বললেও বেশ খানিকটা তফাত আছে। ভাষায় উচ্চারণ বাচনভঙ্গিতে অনেক অমিল।
তারপরের প্রশ্ন, জ্যোৎস্নাকেও নিশ্চয় মিনিহুনরা তখন আমার মতো করে পাকড়াও করেছিল। তাকে কোথায় রেখেছে? আমাদের ধরে আনার উদ্দেশ্যই বা কী?
অপোগণ্ড জীবগুলোর ভূতুড়ে হাসি থামতেই চায় না। অগ্নিদেবী চেঁচিয়ে ধমক দিলে তবে থামল। তখন সাহস করে বললাম, মাননীয়া অগ্নিদেবী! আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করলেন না যে আমি একজন ভারতীয়?
অগ্নিদেবী গর্জে উঠলেন,–ভারতীয় হও আর যেই হও–তোমার সভ্য দুনিয়ার লোকেরা আমার শত্রু। তোমরা বিশ্বাসঘাতক স্বার্থপর ধূর্ত। আমি তোমাদের ঘৃণা করি … ঘৃণা করি … ঘৃণা করি …
