জ্যোৎস্না বলল,–যাঃ! বাঁদর কালো হয় নাকি? তা ছাড়া বললেন ভীষণ ঠাণ্ডা হাত। হবেই তো। মিনিহুন সমুদ্রেও মাছের মতো ঘুরে বেড়ায় কিনা। এখন নভেম্বরে সমুদ্রের জল ঠাণ্ডা না?
গল্প করতে করতে কফির অর্ডার দিলাম ফোনে। সেইসময় বব ফুলবাবু সেজে ঘরে ঢুকল। নকশাকাটা ঘিয়ে রঙের ঢিলে কুর্তা আর আঁটো জিনস পরা। জ্যোৎস্নাকে দেখে বলল,–হাই!
জ্যোৎস্না বলল,–হাই!
এই হল মারকিন সম্ভাষণ। বব বলল,–খুড়োমশাই পুলিশ দফতরে গেলেন। হোটেলের ম্যানেজার খুব ভয় পেয়ে গেছে। কোকো পামে এই প্রথম চুরি বিশবছর পর। বিশ বছর আগে একবার এক পর্যটকের জুতো চুরি গিয়েছিল এক পাটি কেডস! যাই হোক, বাইরে রোদ্দুরের ফুল ফুটছে। ঘরে বসে থাকার মানেটা কী?
বললাম,–বসো। কফি আসছে। খেয়ে বেরুব। তারপর বাংলায় জ্যোৎস্নাকে বললাম, জ্যোৎস্না, তোমার সময় হবে তো?
জ্যোৎস্না বলল,–অঢেল সময়। আপনাকে নিয়ে ঘুরে সব দেখাব বলেই তো এসেছি।
বব ভুরু কুঁচকে বলল,–তোমরা মাতৃভাষায় আমাকে গাল দিচ্ছ কি?
বললাম,–সরি বব! ভুল হয়েছে। আমরা তোমার সামনে বাংলা বলব না। কারণ সেটা অভদ্রতা হয়।
একটু পরে পলিনেশীয় পরিচারিকা কফি নিয়ে এল। কফির সঙ্গে প্রকাণ্ড এক প্লেট বাদাম ফাউ হিসেবে। এ বাদাম, জ্যোৎস্না জানালো, এ স্বর্গোদ্যানেরই ফসল। চিবুলে ছানার স্বাদ পাওয়া যায়। আমার জিভে নারকোল মনে হল। পরিচারিকাটি পলিনেশীয়দের মতোই বেঁটেখাটো মোটাসোটা। গায়ের রঙ উজ্জ্বল বাদামি। চ্যাপটা মুখ এবং নাকটা সরু। হঠাৎ দেখলে জাপানি মনে হতে পারে। তবে কাল থেকে পথঘাটে অনেক খাড়ানাকওয়ালী মেমসায়েবের মতো মেয়েও দেখেছি–তারাও পলিনেশীয়। কারুর গায়ের রঙ কালোও। কিন্তু সবসময় মুখে হাসিটি লেগে আছে।
জ্যোৎস্না আমাদের অবাক করে পলিনেশীয় ভাষায় ওর সঙ্গে কথা বলতে লাগল। মেয়েটি চলে গেলে বললাম,–বাঃ জ্যোৎস্না! তুমি ওদের ভাষা শিখে ফেলেছ দেখছি?
জ্যোৎস্না বলল,–অল্পস্বল্প। জয়ন্তদা, ওকে জিজ্ঞেস করলাম টিহো নামে কাকেও চেনেনা নাকি–আদিম রাজার বংশধর টিহো? ও বলল,–টিহো এখানেই চাকরি করে। এ হোটেলের বেল ক্যাপ্টেন সে। অর্থাৎ পোর্টারদের সর্দার। হোটেলে লোক এলে তার নির্দেশে মেলম্যানরা ব্যাগেজপত্তর ঘরে পৌঁছে দেয়। হোটেল ছাড়লে ঘর থেকে ব্যাগেজ নিয়ে গিয়ে গাড়িতে ওঠায়। এসব ওদের দায়িত্ব।
বললাম,–জানি। টিহোর কথা কী বলল বলো।
জ্যোৎস্না বলল,–টিহোকে সকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বব এবং আমি একসঙ্গে বলে উঠলাম,সে কী!
হ্যাঁ। মেয়েটির নাম ওলালা। ওর ধারণা, টিহো সানফ্রান্সিসকোতে তার মারকিন বউটার কাছে ফিরে গেছে। টিহোবুডোর সংসারটি বেজায় বড় সেখানে। একগাদা নাতিপুতিও আছে। সবাই একসঙ্গে থাকে।
বললাম,–টিহো বয়সে বুড়ো নাকি?
জ্যোৎস্না বলল,–হা-তাই তো বলল ওলালা।
বব বলল,–ওঃ হো! মনে পড়েছে। রিসেপশানে গম্ভীর চেহারার এক বুড়ো পলিনেশীয়কে দেখেছিলাম। ওহে জায়েন্টো, আমার এ কথাও মনে পড়েছে এতক্ষণে তুমি রিসেপশানের সামনে দাঁড়িয়ে তোমার রহস্যময় সিগারেট কৌটোটা বের করেছিলে এবং সিগারেট টানছিলে।
জ্যোৎস্না চোখ বড় করে বলল,–তাহলেই সব রহস্য ফাঁস হয়ে গেল জয়ন্তদা। টিহোবুড়ো তখনই জিনিসটা দেখে চমকে উঠেছিল। তারপর …
সে হঠাৎ থেমে কী ভাবতে লাগল। তারপর ফের বলল,–দেখুন, জয়ন্তদা! কাল বলছিলাম না আপনাকে? মিনিহুনরা রাজা হোলাহুয়াকে খুব খ্যাতি করত বলে কিংবদন্তি আছে। আমার মনে হচ্ছে, টিহোর সঙ্গে মিনিহুনদের যোগাযোগ থাকা সম্ভব। একজন মিনিনকে সে ডেকে এনেছিল হোটেলে।
বব হাসতে হাসতে বলল,–তোমরা বাঙালিরা বড় কল্পনাপ্রবণ জাত। যাগে বাইরে কত রোদ্দুর। ঘরের ভেতর বসে বিদঘুঁটে আলোচনা করে লাভটা কী? চলো, বেরিয়ে পড়ি।
.
ওয়েই কাপালির ভেতরে
ঝলমলে রোদ্দুরের দিন। তাই খাড়ির মাথায়, পার্কে, কিংবা খাড়ির নীচে যেখানে নেমে যাওয়ার পথ আছে এবং পাথরের চওড়া চাতালে সমুদ্রের জল লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, সেখানে নাচগানের আসর জমে উঠেছে। প্রতি আসরে ফুলের পোশাক পরা পলিনেশীয় মেয়েরা তো আছেই–পৃথিবীর নানা দেশের লোকেরাও রঙিন পলিনেশী পোশাক পরে নাচছে। আঁতকে উঠলাম দেখে, তোলপাড় করা জলেও লম্বাটে ছিপনৌকোর মতো ক্যানো ভাসিয়েছে দুঃসাহসীরা।
ববের মারকিন রক্ত লাফিয়ে উঠল সেই দৃশ্যে। বলল,–হাই জোনা। চলো আমরা নীচে নেমে যাই। তারপর একটি ক্যানো ভাড়া করে নাকানিচুবানি খেয়ে আসি।
জ্যোৎস্না বলল,–দারুণ জমবে। চলুন জয়ন্তদা।
আমি আঁতকেই ছিলাম। মিনমিনে গলায় বললাম,–দ্যাখো জ্যোৎস্না, আমি পশ্চিমবঙ্গের ঘটি। পাহাড়জঙ্গল যদিবা চষে বেড়াতে পটু, জল দেখলেই আমি বেড়ালের মতো ভয় পাই। তমি বাঙাল মেয়ে। জলের দেশের জলকন্যা। তোমার পক্ষে যা সম্ভব, আমার পক্ষে তা অসম্ভব।
বব খপ করে আমার হাত ধরে বলল,–এসো। তোমাকে আমরা সাঁতার শেখাবো।
জ্যোৎস্না খিলখিল করে হেসে উঠল। বব একটা প্রায় খাড়া ফাটল দিয়ে আমাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল। মাধ্যাকর্ষণেরও টান আছে। তাই নীচের একটা চাতালে পৌঁছতে মিনিট দুইয়ের বেশি লাগল না। অথচ চাতালটা প্রায় হাজার ফুট নীচে।
চাতালের কিনারায় সমুদ্রের জল এসে ফণা তুলছে। ছড়িয়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে। কেমন একটা আঁশটে গন্ধ জলের। অসংখ্য সমুদ্রপাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। ডাকাডাকি করছে। জলের গর্জন, পাখির ডাক, তার ওপর হাওয়াইয়ান নাচগান ও বাজনার চোটে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। খাড়িটা প্রায় সিকি কিলোমিটার চওড়া। সামনে তুলকালাম জলে চাপচাপ সাদা ফেনা দুলছে। তার তলায় পাথর আছে। নৌকোর তলা এক ধাক্কায় ফুটো হবার সম্ভাবনা; তার মধ্যে পলিনেশীয় মাঝির হাঁটু অব্দি নাগাদের মতো রঙিন লুঙি জাতীয় পোশাক এবং মাথায় হলুদ টুপি পরে বৈঠা চালাচ্ছে। ওদের নৌকো চালানোর দক্ষতা দেখে তাক লাগছিল।
