কর্নেল চোখ না খুলেই বললেন, “শুয়ে পড়া ডার্লিং! অনেক রাত হয়েছে।”
হালদারমশাই বিরক্ত হয়ে বললেন, “এ কি ঘুমনোর সময় কর্নেল-স্যার?”
“চাংকোবাহাদুরের বেডরুম এটা। শুয়ে পড়ুন।” আবার কর্নেলের নাক-ডাকা শুরু হল।
সম্রাট চাংকোর রাজকীয় বিছানার দিকে তাকিয়ে হালদারমশাই বললেন, “হঃ!” তারপর হঠাৎ বিকট হাই তুলে সেদিকে এগিয়ে গেলেন এবং শুয়ে পড়লেন।
ভোঁদাই হাই তুলে বলল, “দাদা! বিচ্ছিরি ঘুম পাচ্ছে কেন বলুন তো? আমি শুই?”
বলে সে মেঝেতেই চিতপাত হল। তারপর টের পেলুম আমারও ঘুম পাচ্ছে। সম্রাট চাংকোর বেডরুমে কি ঘুমের ওষুধ ছড়ানো আছে?
একটা গদিআঁটা আসনে বসে হেলান দিলুম। তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি। কী একটা চাঁচামেচিতে সেই ঘুম যখন ভাঙল, তখন বুঝলুম আমাকে একটা গোরিলা-মানুষ কাতুকুতু দিচ্ছে। এক লাফে উঠে দাঁড়ালুম। গোরিলা-মানুষটা ক্ষান্ত হল সঙ্গে-সঙ্গে। সম্রাট চাংকো রাগে ফুঁসছেন। দাঁত কিড়মিড় করছেন। বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত ফিক-ফিক করে হাসছেন কেন জানি না। ভেঁদা-পালোয়ান মেঝেয় বসে আছে। দুটো গোরিলা-মানুষ তাকে কাতুকুতু দিচ্ছে। কিন্তু তার পেশী ফুলে ঢোল। সুবিধে করতে পারছে না ওরা। যত কাতুকুতু দিচ্ছে, পালোয়ান তত পেশী ফোলাচ্ছে।
আর হালদারমশাইকে কাতুকুতু দিচ্ছে অন্তত একডজন গোরিলা-মানুষ। কিন্তু ওঁর ঘুম ভাঙছে । তাই সম্রাট চাংকো হাত দুটো ছুঁড়ে খুব চ্যাঁচামেচি করছেন।
ঘরে কর্নেলকে দেখতে পেলুম না। গজকুমার সিংয়ের জন্য একটা চমৎকার বিছানা পাতা হয়েছে। তিনি ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু ওঁর ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করছে না কেউ। সম্রাট চাংকোর বন্ধুর নাতি। তাই কি এই খাতির?
সম্রাট চাংকো গর্জন করলেন, “ক্র্যাম্বো হ্রাম্বো ল্যাম্বো!”
গোরিলা-মানুষেরা হালদারমশাইকে এবার চ্যাংদোলা করে তুলল। বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তকে ফিসফিস করে বললুম, “সর্বনাশ! একটা কিছু করা উচিত আমাদের।”
বিজ্ঞানী চোখের ইশারায় আমাকে চুপ করতে বললেন। সম্রাট চাংকো তার বিছানা ঝেড়ে সাফ করে শুয়ে পড়লেন। তারপর জড়ানো গলায় বললেন, “ভ্রাম্বো লাম্বো নাম্বো।”
গোরিলা-মানুষেরা সঙ্গে-সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সম্রাট চাংকো নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে থাকলেন। বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত বললেন, “এই মন্সের অপেক্ষায় ছিলুম। চলে আসুন, জয়ন্তবাবু! চাংকোর ল্যাবে যাই।”
ভোঁদা আমাদের সঙ্গ নিয়ে বলল, “ওই দাদা যে পড়ে রইলেন?” চন্দ্রকান্ত ফিক করে হেসে বললেন, “আমাদের পৃথিবীর ভাষায় উনি মড়া–স্রেফ ডেড বডি।” চমকে উঠে বললুম, “সর্বনাশ! তা হলে গজকুমার সিং নাম বলেছিলেন, সেটাই সত্যি!”
সেই ল্যাবে পৌঁছে চন্দ্রকান্ত জবাব দিলেন, “উনি একজন যথার্থ মৃত মানুষ। কাজেই ওঁকে নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই।”
অবাক হয়ে বললুম, “কী আশ্চর্য! আপনার নিশ্চয় কোনো ভুল হচ্ছে।”
“নাহ।” বলে চন্দ্রকান্ত ডাকলেন, “কর্নেল! আপনি কোথায়?”
কর্নেলের সাড়া এল যেন আমাদের পায়ের তলা থেকে, “চলে আসুন! পেয়ে গেছি।”
চন্দ্রকান্ত খুঁজছিলেন। মেঝের দিকে দৃষ্টি। একখানে একটা চৌকো গর্ত দেখতে পেয়ে বললেন, “এই যে!” সেই গর্তের ভেতর সিঁড়ি নেমে গেছে, নীল আলো জ্বলছে। আমরা তিনজনে নীচে নেমে গিয়ে দেখি, এ-ও আর-এক ল্যাব। সেখানে শ্রীমান ধুন্ধু চিত হয়ে শুয়ে আছে। বিজ্ঞানী তার কানে মোচড় দিয়ে ওঠালেন।
কিন্তু একটা আশ্চর্য ব্যাপার চোখে পড়ল। সারবন্দী কাঁচের কফিনের ভেতর কী আর কে ভেসে আছে একটা করে মৃত মানুষ। কর্নেল বললেন, “চন্দ্রকান্তবাবু! চাংকোর কীর্তি দেখুন!”
চন্দ্রকান্ত সপ্রশংস ভঙ্গিতে বললেন, “জেনেটিক্সে চাংকোর মাথা বরাবরই ভালো খেলত। অপূর্ব! পৃথিবীর সব বেওয়ারিশ লাশ এক্সরে-ল্যাসোর সাহায্যে তুলে নিয়ে এসে প্রাণ দিচ্ছে। কিন্তু স্টেজগুলো লক্ষ করছেন কি?”
বললেন, “হ্যাঁ। প্রাণ দিয়ে চাংকো তাকে পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষে পরিণত করছেন। আমরা যেসব গোরিলা-মানুষ দেখলুম, তারা ক্রোম্যাগনন প্রজাতির। বিবর্তনতত্ত্বকে নিয়ে চাংকো খেলা করছেন। অসাধারণ প্রতিভাধর বিজ্ঞানী!”
“গজকুমারবাবুকেও গোরিলা-মানুষ করবে চাংকো।” বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত দুঃখিতমুখে বললেন, “আমার বড্ড খারাপ লাগছে ভাবতে।”
কর্নেল হাসলেন, “খারাপ লাগলেও কী আর করা যাবে, বলুন! পৃথিবীর নিয়ম হল, সেখানে যে মরে যাবে, সে চিরমৃত। এই গ্রহে সে জীবিত হচ্ছে, এটা মন্দ না। আহা, প্রাণ জিনিসটা বড় সুন্দর। তা একেবারে হারিয়ে যাওয়ার চাইতে এ তো ভালোই!”
বিজ্ঞানী দাড়ি চুলকে বললেন, “এ আমার সাবজেক্ট নয়। আমি অ্যাস্ট্রো-ফিজিসিস্ট। কাজেই বায়োলজি, ফিজিওলজি বা জেনেটিক্সে আমার মাথাব্যথা নেই। চলুন, ফেরা যাক। ধুন্ধু, ট্রাও ট্রাও!”
ভোঁদা বলে উঠল, “ডিটেকটিভদ্রলোককে মেরে গোরিলা-মানুষ করবে না তো? ওঁকে কোথায় নিয়ে গেল, দেখা উচিত স্যার।”
চন্দ্রকান্ত নড়ে উঠলেন, “তাই তো! কর্নেল শিগগির চলুন! ডিটেকটিভদ্রলোকের কথা একবারে ভুলে গেছি। ধুন্ধু! বড্ড শব্দ করছ! টুও ট্রও ট্রও।”
কিছুক্ষণ পরে আমরা চত্বরে বেরিয়ে দেখি, হালদারমশাইকে গোরিলা-মানুষেরা একটা পাথরের স্তম্ভে বেঁধেছে এবং বড়-বড় পাথরের চাই ছুঁড়ছে। আঁতকে উঠেছিলুম। কিন্তু পাথরগুলো হালদারমশাইয়ের গায়ে লেগে ঝুরঝুর করে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। হুঁ, মাধ্যাকর্ষণ কম। তাই এখানকার পদার্থের ওজন কম। শুধু এই বলগুলো ছাড়া। যদি গোরিলা-মানুষেরা বল ছুঁড়ে মারে? চন্দ্রকান্তকে ফিসফিস করে কথাটা বলতেই উনি ধুন্ধুকে লেলিয়ে দিলেন। কিন্তু তাকে ওরা গ্রাহ্য করল না। কর্নেল ডাকলেন, “হালদারমশাই! হালদারমশাই!”
