বললুম, “কিন্তু নিয়ে যাবেন কী করে? সাঙ্ঘাতিক ওজন। আপনার রোবট ধুন্ধুমারকে সঙ্গে আনা উচিত ছিল।”
“ধুন্ধু’র আজকাল বড় দুষ্টুমি জেগেছে, বুঝলেন?” বিজ্ঞানী গম্ভীর হয়ে বললেন, “এটা পেলে হয়তো ক্রিকেট খেলতে শুরু করে দেবে। আসলে আজকাল চারদিকে যেরকম ক্রিকেট নিয়ে বাড়াবাড়ি! ধুন্ধু’র দোষ নেই। বাগান থেকে খেলার মাঠটা দেখা যায়। ক্রিকেটবল অনেক সময় বাগানে এসে পড়ে। ধুন্ধু কুড়িয়ে ছুঁড়ে দেয়। হতভাগা এক্কেবারে ভুলে গেছে যে, সে মানুষ নয়, মেশিন। মানুষের মধ্যে বেশিদিন থাকলে যা হয়!”
কর্নেল বললেন, “তা হলে ওটা ট্রাকে চাপিয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যাক। নাকি ভবেশবাবুর পালোয়ান ভাগনেকে ওবেলা আসতে বলব? সে-ই কিন্তু জিনিসটা এতদূর বয়ে এনেছে।”
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত একটু হেসে বললেন, “বিকল্প ব্যবস্থা না করেই কি এসেছি ভাবছেন?” তিনি একটা ইঞ্চি ছয়েক লম্বা যন্ত্র দেখালেন। “দেখতে পাচ্ছেন? বলুন তো এটা কী?”
কর্নেল চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে মাথা দোলালেন।
“এ. জি. এল.। আমার আবিষ্কার।” চন্দ্রকান্ত হাসলেন। “মহাকাশের কোথাও দাঁড়িয়ে এটার সাহায্যে পৃথিবীকে ছুঁড়ে ফেলতে পারি মশাই! অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি লিফটার। যা-তা জিনিস নয়। এটা দিয়ে যদি জয়ন্তবাবুকে ছুঁই, উনি ভরহীন এবং ওজনহীন হয়ে পড়বেন।”
বললুম, “বাঃ! বেশ মজা তো!”
“মজা!” বাঁকা হেসে বিজ্ঞানী বললেন, “ভরহীন হলে কী অবস্থা হবে, বুঝতে পারছেন? ওজনহীন হলে না-হয় পাখির মতো উড়ে বেড়াবেন। কিন্তু ভরহীন হলে? পরমাণু কেন, স্রেফ কণিকা-উপকণিকা হয়ে চূর্ণবিচূর্ণ অবস্থায় স্পেসে বিলীন হয়ে যাবেন। আপনার টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
আঁতকে উঠে বললুম, “সর্বনাশ!”
চন্দ্রকান্ত আরও ভয় পাইয়ে দিয়ে বললেন, “ফোটনেও পরিণত হতে পারেন।”
কর্নেল বললেন, “চন্দ্রকান্তবাবু, তা হলে আপনার এ. জি. এল. ওই আজব বলটি ছুঁলে তো কেলেঙ্কারি!”
“না। এই লাল সুইচটা দেখছেন। এটা পদার্থের ভরকে জিরোতে পরিণত করে। জয়ন্তবাবুর সঙ্গে আমি একটু জোক করছিলুম। যাই হোক, এই সুইচটা টিপব না! টিপব এই সাদা সুইচটা। এটা ওজনকে জিরো করে দেবে। ভর এবং ওজনের মধ্যে সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। অথচ দেখুন, এই শর্মা সেই অসাধ্যসাধন করেছে।” বলে চন্দ্রকান্ত থলের মুখটা খুলে আজগুবি বলটার গায়ে যন্ত্রটা চেপে ধরলেন।
অমনি একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল।
বিদঘুঁটে বলটা শূন্যে ভেসে উঠল এবং বাঁই করে খোলা জান.. দিয়ে উধাও হয়ে গেল। চন্দ্রকান্ত চেঁচিয়ে উঠলেন, “যাঃ! পালিয়ে গেল! পালিয়ে গেল!” তারপর জানলায় গিয়ে উঁকি দিলেন।
কর্নেলের গলায় সবসময় বাইনোকুলার ঝোলে। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে জানলায় গিয়ে বাইনোকুলার চোখে তুললেন। তারপর সেখান থেকে ব্যস্তভাবে ছাদের সিঁড়ির দিকে চললেন।
ছাদে কর্নেলের বাগান, গোয়েন্দাপ্রবর হালদারমশাই যেটির নাম দিয়েছেন শূন্যোদ্যান। সেখানে অদ্ভুত, বিকট, বিদঘুঁটে গড়নের সব উদ্ভিদ। ক্যাকটাস, অর্কিড, আরও কত বিচিত্র গাছপালা। সেই শূন্যোদ্যানে পৌঁছে দেখলুম চন্দ্রকান্ত তার যন্ত্রগুলোর এটা টিপছেন, ওটা টিপছেন এবং কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে পশ্চিমের আকাশ দেখছেন। এপ্রিলের উজ্জ্বল নীল আকাশে অবাধ শূন্যতা। দেখতে দেখতে চোখ টাটিয়ে গেল আমার।
একটু পরে বাইনোকুলার নামিয়ে কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, “মনে হচ্ছে গঙ্গা পেরিয়ে হাওড়ায় গেল। ওখানে প্রচুর লোহালক্কড়ের দোকান আছে অবশ্য। দেখা যাক।”
চন্দ্রকান্ত ব্যস্তভাবে বললেন, “না। না। ওটার গতি সেকেন্ডে প্রায় হাজার কিলোমিটার। এই দেখুন। আমার ধারণা, এতক্ষণে ওটা সাহারা মরুভূমিতে পৌঁছে গেছে। আমার এখনই ল্যাবে ফেরা উচিত। কমপিউটারের সামনে বসতে হবে। প্রচুর হিসেবনিকেশ করতে হবে, প্রচুর!”
“হ্যাঁ, প্রচুর। তবে যন্ত্রে হইব না। এ সায়েন্টিস্টের কাম না মশায়! ডিটেকটিভের হাতে ছাইড়া দেওনই ভালো।”
ঘুরে দেখি, সিঁড়ির দিক থেকে এগিয়ে আসছেন গোয়েন্দা কে. কে. হালদার। মুখে রহস্যময় হাসি। কর্নেল বললেন, “খবর বলুন হালদারমশাই! এতক্ষণ আপনার জন্য হা-পিত্যেশ করছি!”
হালদারমশাই আগে একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর চাপা স্বরে বললেন, “ভবেশ রক্ষিত লোকটা ভালো না। পুলিশ-সোর্সে আগে খবর নিয়েছিলাম। তিনবার চোরাই মালের দায়ে ধরা পড়েছিল।”
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। কোনো বিদায়সম্ভাষণ করলেন না। বুঝলুম, বাড়ি ফিরেই ল্যাবে ঢুকবেন।
কর্নেল বললেন, “চলুন হালদারমশাই! নীচে গিয়ে কফি খেতে-খেতে আপনার তদন্ত রিপোর্ট শোনা যাক।”
একটু পরে ড্রয়িংরুমে বসে প্রচুর দুধে প্রায় সাদা কফি ফুঁ দিয়ে খেতে-খেতে প্রাইভেট গোয়েন্দা কৃতান্তকুমার হালদার তার তদন্ত রিপোর্ট দিলেন।
আজকাল কোনো জিনিসই ফেলনা নয়। পুরনো ছেঁড়া জামাকাপড় বা জুতো, কৌটো-শিশি-বোতল, অ্যালুমিনিয়ামের টুটাফাটা পাত্র থেকে শুরু করে গেরস্থালির পরিত্যক্ত সমস্ত আবর্জনা কেনবার জন্য লোকেরা অলিগলি হাঁক দিয়ে বেড়ায়, “বিক্কিরিওলা! বিক্কিরি-ই-ই-ই!” হালদারমশাই বিক্কিরিওলা সেজে ভবেশবাবুর বাড়ি গিয়েছিলেন। ভবেশ-গিন্নি খুব জাঁদরেল মহিলা। বিক্কিরিওলা বড্ড বেশি খোঁজখবর নিচ্ছে দেখে ডাকাতের চর ভেবে পালোয়ান ভাগনেকে ডাক দেন। ভাগ্যিস, তখন সে মামার সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। উনি পুলিশে ফোন করতে যাচ্ছেন আঁচ করেই গোয়েন্দা কেটে পড়েন। তবে আজব বলটার কথা ততক্ষণে জানা হয়ে গেছে। হ্যাঁ, সত্যি একটা প্রচণ্ড ভারী খুদে বল বাথরুমে পড়েছিল। গত রাতে বাড়ির আনাচেকানাচে ভূতেরা উৎপাতও করেছে বটে। কিন্তু সন্দেহজনক ব্যাপার হল, বড়বাজারে ভবেশবাবুর দোকানে ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে যে-লোকটা ওই ভুতুড়ে বল বেচতে গিয়েছিল, তার চোখ ট্যারা এবং গতকাল বিকেলে ভবেশবাবুর বাড়ির কাছাকাছি একটা গলিতে যে-লোকটাকে সিঁটিয়ে মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়, তার চোখও ট্যারা। কাজেই হালদারমশাই থানা থেকে হাসপাতালের মর্গ ছোটাছুটি করে বেড়িয়েছেন। তার হাতে এখন বড় তথ্য মৃত লোকটির নামধাম।
