.
নয়
সুরেন বেরুতে যাচ্ছিল। কর্নেল বললেন,–বসো সুরেন! খামোকা ছুটোছুটি করে লাভ নেই।
মাখনবাবু অবাক হয়ে বললেন, কী বলছেন কর্নেলসায়েব! রমা সুটকেস নিয়ে উধাও হয়ে গেলে আর কোনওদিন সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করাই যাবে না!
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না মাখনবাবু! আপনাদের বাড়ির দিকে লক্ষ রাখতে বলেছিলুম পুলিশকে। না–পোশাকপরা পুলিশ নয়। সাদা পোশাকে ছদ্মবেশে তারা ওত পেতে আছে পালাক্রমে। এতক্ষণ আপনার ভ্রাতৃবধূকে সুটকেসসহ পুলিশ পাকড়াও করে ফেলেছে।
মাখনবাবু আশ্বস্ত হয়ে বললেন,–বাঃ! এ একটা কাজের মতো কাজ করেছেন আপনি। কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–আপনাকে একটা অনুরোধ, মাখনবাবু!
–বলুন! বলুন!
–আপনার ভাই উপেন দত্তের ঘরটা তো তালাবন্ধ।
–হ্যাঁ। তবে আপনি বললে তালা খোলার চেষ্টা করতে পারি। বাজারে নানকু নামে একটা পড়ে। সুরেন তাকে চেনে।
কর্নেল বললেন,–সুরেন! তুমি নানকুকে ডেকে আনো শিগগির!
সুরেন বেরিয়ে গেল। তারপরই মাখনবাবুর মেয়ে তপতী ভেতরের দরজায় উঁকি মেরে বলল, –বাবা! অরুদা এসে কাকিমার কথা জিগ্যেস করছে। কী বলব!
মাখনবাবু বললেন,–ওকে বসতে বল্। যাচ্ছি।
কর্নেল জিগ্যেস করলেন,–অরু কে?
আজ্ঞে, আমার ভাগনে।-বলে মাখনবাবু কণ্ঠস্বর চাপলেন : ভাগনে বলে অরুণের পরিচয় দিতে লজ্জা করে। উপেন ওকে নষ্ট করেছিল। অরুণ গোবিন্দের জুটি।
আমার মনে পড়ে গেল, হালদারমশাই গোবিন্দ আর উপেন দত্তের ভাগনেকে ফলো করে এসেছেন কলকাতা থেকে। বললুম,–কর্নেল! এই অরুণই গোবিন্দের সঙ্গে কলকাতা থেকে উপেনবাবুর জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে।
মাখনবাবু বললেন,বরং অরুকে এখানে ডাকি কর্নেলসায়েব।
কর্নেল বললেন,–থাক। আপনি গিয়ে দেখুন সে কী বলছে। তারপর দরকার মনে করলে এখানে ডেকে আনবেন।
–খিড়কির দরজা দিয়ে ঢুকেছে অরু। তার মানে, পুলিশের ভয়ে সে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে।
বলে মাখনবাবু ভেতরে ঢুকে গেলেন। কর্নেলের চুরুট নিভে গিয়েছিল। লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে আস্তে বললেন,–হালদারমশাইয়ের জন্য দুর্ভাবনায় আছি। থানায় টেলিফোন করে আমাকে তার খবর দেওয়ার কথা আছে। কিন্তু কুমারবাহাদুরকে তাঁর পূর্বপুরুষের সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলুম।
বললুম,–পাণ্ডুলিপিসহ রমা দত্তকে পুলিশ এতক্ষণ নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছে।
এইসময় বাড়ির ভেতরে মাখনবাবুর চড়া গলায় কথাবার্তা শোনা গেল,–ছোটমামির হয়ে তুই ঝগড়া করতে এসেছিস? তোর লজ্জা করে না হতভাগা! তোর ছোটমামিকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল তো আমি কী করব? আরে! ও কী করছিস তুই? উপেনের ঘর খুলছিস কেন? চাবি কোথায় পেলি? অরু! ঘর খুলবিনে বলে দিচ্ছি।
কর্নেল ভেতরে ঢুকে গেলেন। তাকে অনুসরণ করলুম। উঠোনের মাঝখানে একটা ইঁদারা। তার ওধারে একটা একতলা নতুন বাড়ি। দোতলা করার জন্য লোহার শিক উঁচু হয়ে আছে ইতস্তত। মধ্যিখানে খোলা সিঁড়িতে পলেস্তারা এখনও পড়েনি। একটা ঘরে তালা খুলছে বলিষ্ঠ চেহারার একজন যুবক। গায়ের রং তামাটে। মাথায় ফিল্মহিরোদের স্টাইলে ছাঁটা চুল। গায়ে নীল টিশার্ট, পরনে জিনস। সে শেষ তালাটা খুলেছে, তখনই কর্নেল গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
সে চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর কর্নেলকে দেখে বলল,–কাঁধ ছাড়ুন বলছি। কর্নেল তার কাঁধে আরও চাপ দিয়ে একটু হেসে বললেন, তোমার ছোটমামার ঘরের চাবি তুমি কোথায় পেলে?
অরুণ এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। পারল না। বলল,–বড়মামা! তুমি জানো এই ভদ্রলোক কে?
বাড়ি একেবারে স্তব্ধ। মাখনবাবুর স্ত্রী, মেয়ে আর দুই ছেলে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। মাখনবাবু গর্জে উঠলেন,উনি তোর যম। হতচ্ছাড়া বাঁদর! তোর এত সাহস উপেনের ঘরে ঢুকতে চাস? শিগগির বল কে তোকে চাবি দিল?
অরুণ খেঁকিয়ে উঠল,–তুমি ভেবেছে, ছোটমামা মরে গেছে বলে মিথ্যামিথ্যি ছোটমামিকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়ে এই বাড়ি দখল করবে?
কর্নেল বললেন, তুমি ঘরে ঢুচ্ছ কেন অরুণ?
অরুণ বলল,–ছোটমামি আমাকে তার ঘরে থাকতে বলেছে। আমি বাড়ি পাহারা দেব। আপনি জানেন না স্যার, বড়মামা ছোটমামার বাড়ি দখল করে ছোটমামিকে তাড়িয়ে দেবে।
কর্নেল তার কাঁধ থেকে হাত তুলে নিয়ে বললেন,–ঠিক আছে, তোমার ছোটমামি যখন তোমাকে চাবি দিয়েছে, তখন তুমি তার ঘরের মালিক। মাখনবাবু! আপনি অরুণকে বাধা দেবেন না।
বলে কর্নেল একটু সরে দাঁড়ালেন। অরুণ শেষ তালাটা খুলে ঘরে ঢুকল। আমি ততক্ষণে বারান্দায় উঠে কর্নেলের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। ঘরের ভেতর আবছা আঁধার। লক্ষ করলুম, অরুণ খাটের ম্যাট্রেসের তলা থেকে একটা কাগজের প্যাকেট বের করল। কর্নেল চুরুট কামড়ে ধরে বললেন,–চলো জয়ন্ত! এঁদের পারিবারিক ব্যাপারে আমাদের নাক না গলানোই উচিত।
সেই সময় প্যাকেটটা বগলদাবা করে অরুণ বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করছিল। আচম্বিতে কর্নেল তার বগলের ফাঁক থেকে প্যাকেটটা টেনে নিলেন। তারপরই দেখলুম, অরুণের হাতে একটা ছুরি ঝকমক করে উঠেছে। মাখনবাবু বোবাধরা গলায় শুধু বলে উঠলেন,–এই! এই!
কর্নেল তৈরিই ছিলেন। গোবিন্দকে ধরাশয়ী করার পদ্ধতিতে অরুণের পেটে লাথি ঝাড়তেই সে ককিয়ে উঠে বারান্দায় পড়ে গেল। কর্নেল যথারীতি তার দিকে রিভলভার তাক করলেন। এবার আমি কাল বিকেলের মতো হতবুদ্ধি হয়ে যাইনি। অরুণের ছুরিটা ছিটকে পড়েছিল। দ্রুত কুড়িয়ে নিলুম। অরুণ কুঁকড়ে গিয়ে গোঙাচ্ছিল। কর্নেলের লাথিটা জোরালো ছিল। প্যাকেটটা আমাকে দিয়ে অরুণের চুল ধরে কর্নেল তাকে দাঁড় করালেন। তারপর তাকে ঘরের ভেতর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন। চাবির গোছা চৌকাঠের কাছে পড়ে ছিল। কর্নেল দরজা বন্ধ করে তিনটে তালা এঁটে নেমে এলেন। বললেন,–মাখনবাবু! আপনার ভাগনের জন্য চিন্তা করবেন না। আমি থানায় গিয়ে পুলিশকে বলছি। আপনি এবং আপনার বাড়ির সবাই যা দেখেছেন, পুলিশকে আশা করি তা-ই বলবেন।
