একজন আদিবাসী যুবক ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল,–সার! পাপী তার শাস্তি পেয়েছে। এজন্য আপনার কোনও দোষ নেই। প্রভু যীশু বলেছেন, পাপের বেতন মৃত্যু।
আর-একজন কিছু বলতে যাচ্ছে, আচম্বিতে সেই অদ্ভুত গর্জন শোনা গেল। আঁ–আঁ আঁ –আঁ! আঁ-আঁ আঁ!
আদিবাসী যুবকেরা অমনি দিশেহারা হয়ে পালিয়ে গেল। কর্নেল রিভলভার বের করে ব্যস্তভাবে বললেন,–জয়ন্ত! তৈরি থাকো! চারদিকে লক্ষ রাখো! কিন্তু সাবধান! আলো জ্বেলো না।
আমার রিভলভার হাতে ছিল এবং অন্য হাতে টর্চ। চারদিকে সতর্ক লক্ষ রাখলুম। আজ সন্ধ্যায় গর্জনটা থামছে না। গর্জনটা কোনদিক থেকে আসছে, বোঝাও যাচ্ছে না। চাপাস্বরে বললুম,–কর্নেল! কর্নল। এক রাউন্ড ফায়ার করা যাক।
না।–বলে কর্নেল গুঁড়ি মেরে ডানদিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ টর্চের আলো ফেললেন। এক পলকের জন্য ভালুকের মতো কালো কী একটা জন্তুকে ঝোঁপের আড়ালে অদৃশ্য হতে দেখলুম। ভালুকের মতো বলছি বটে; কিন্তু যেটুকু দেখেছি, তাতেই মনে হয়েছে, ওটা ভালুক নয়। শিম্পাঞ্জি কিংবা গরিলার মতো। কিন্তু এই জঙ্গলে শিম্পাঞ্জি বা গরিলা থাকা তো অসম্ভব ব্যাপার।
তবে সেই গর্জনটা থেমে গেছে কর্নেল আলো জ্বালবার পরই। কাজেই ওই অদ্ভুত প্রাণীটাই যে গর্জন করছিল, তাতে ভুল নেই।
এই সময় আমাকে অবাক করে কর্নেল তার বিখ্যাত অট্টহাসি হেসে উঠলেন। বললুম,–কী ব্যাপার? হাসছেন কেন?
কর্নেল ঘাসে বসে চুরুট ধরিয়ে তারপর বললেন,–বসো! পুলিশ যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ বসে থেকে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
আমিও বসলুম। তবে অস্বস্তিটা গেল না। বারবার কর্নেলকে প্রশ্ন করেও তার হঠাৎ অট্টহাসির কোনও উত্তর পেলুম না। কিছুক্ষণ পরে গাছপালার শীর্ষে চাঁদ দেখা গেল। বনভূমিতে জ্যোৎস্না ক্রমশ গা ছমছম করা অনুভূতির সঞ্চার করল। শীতের হাওয়ায় কাঁপন জাগল চারপাশের আলো-ছায়ায়। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, সেই সাংঘাতিক অদ্ভুত প্রাণীটা যেন চারপাশে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং যে-কোনও সময় অতর্কিতে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের সুযোগই দেবে না।
কতক্ষণ পরে আমরা যেদিক থেকে এসেছি, সেইদিকে জোরালো আলোর ঝলকানি দেখতে পেলুম। তারপর সুরেনের ডাক ভেসে এল,–কর্নেলসায়েব! কর্নেলসায়েব!
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–সম্ভবত সুরেনের সঙ্গী জায়গাটা খুঁজে পাচ্ছে না।
বলে তিনি টর্চের আলো জ্বেলে সংকেত দিতে থাকলেন। তারপর জোরালো সার্চলাইটের আলো ফেলতে-ফেলতে এসে গেল ওরা। একজন পুলিশ অফিসার কর্নেলকে স্যালুট ঠুকে বললেন, আপনার খবর আমরা পেয়েছিলুম। আপনি ফরেস্ট বাংলোয় উঠেছেন, সে-খবরও পেয়েছি। যাই হোক, কোথায় গোবিন্দ ব্যাটাচ্ছেলের লাশ?
কর্নেল বললেন,–আপনিই কি অফিসার ইন-চার্জ মিঃ তপেশ সান্যাল?
–হ্যাঁ সার!
কর্নেল তাকে গোবিন্দের ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখাতে নিয়ে গেলেন। একজন কনস্টেবল হ্যাঁজাগ এনেছিল। এতক্ষণে হ্যাঁজাগটা জ্বালাতে ব্যস্ত হল সে। রীতিমতো সশস্ত্র একটি পুলিশবাহিনী এসেছে। সবাই গোবিন্দের মৃতদেহের দিকে এগিয়ে গেল। হ্যাঁজাগটা জ্বলে ওঠার পর কনস্টেবলটি মৃতদেহের কাছে রাখল। পুলিশ অফিসার ছিলেন আরও দুজন। তারা সার্চলাইটের আলোয় কাছাকাছি ঝোঁপঝাড় খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন। সুরেন এবং তার সঙ্গী একপাশে পঁড়িয়ে ছিল। আমি তাদের কাছে গেলুম। তখন সুরেন চাপাস্বরে বলল,–এর নাম ছকুয়া। পিটার ছকুলাল মুর্মু। একে জিগ্যেস করুন, কী দেখেছিল?
ছকুয়া আস্তে বলল,–সার! আমি ঠাকুরবাবাকে একটুখানি দেখেছি।
বললুম,–কেমন চেহারা ঠাকুরবাবার?
ছকুয়া বলল,–কালো। দুই হাত মাটিতে ঠেকে যাবে, এমন লম্বা। বড়-বড় নখ সার! গোবিন্দকে মেরে হয়তো রক্ত খেত। আমাদের দেখেই ভ্যানিশ হয়ে গেল।
বুঝলুম, যুবকটি শিক্ষিত। তাকে জিগ্যেস করলুম,–তুমি কি আর কখনও ঠাকুরবাবাকে দেখেছ?
ছকুয়া বলল,–না সার! তবে একবার আমার বাবা লুকিয়ে এই জঙ্গেলে গাছের ডালে কাটাতে এসেছিল। বাবা গাছের ওপর থেকে দেখেছিল, ঝোঁপের আড়ালে ঠাকুরবাবা বসে আছে। আর কী আশ্চর্য সার, বাবা কেন মিথ্যা বলবে?
–আশ্চর্যটা কী?
ছকুয়া ফিসফিস করে বলল,–বাবা দেখেছিল, কেষ্টবাবু বন্দুক কাঁধে ঠাকুরবাবার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
অবাক হয়ে বললুম,–সে কী! কেষ্টবাবুকে ঠাকুরবাবা মেরে ফেলেনি?
–সেটাই তো বাবা বুঝতে পারেনি। একটু পরে কেষ্টবাবু চলে গেল। তখন বাবা গাছ থেকে নেমে পালিয়ে গিয়েছিল। কথাটা বাবা কাকেও বলতে বারণ করেছিল। কিন্তু আজ কথায়-কথায় সুরেনকে বলেছি। সুরেন বলল, কথাটা আপনাকে আর কর্নেলকে যেন বলি।
সুরেন বলল, আমার মনে হচ্ছে, ওটা কোনও সাংঘাতিক জন্তু। কেষ্টবাবুর পোষা জন্তু।
বললুম,–ঠিক বলেছে!
এইসময় দেখলুম, আবার জোরাল স্পটলাইট জ্বেলে কারা আসছে। সুরেন বলল, হাসপাতাল থেকে স্ট্রেচার নিয়ে আসছে ওরা। বডি তুলে নিয়ে যাবে। সঙ্গে আর্মড ফোর্সও আছে। ওই দেখুন।
কিছুক্ষণ পরে গোবিন্দের মৃতদেহ স্ট্রেচারে তুলে হাসপাতালের কর্মীরা আর সশস্ত্র পুলিশদলটি চলে যাওয়ার পর অফিসার-ইন-চার্জ তপেশ সান্যাল বললেন,–এখানে আর আমাদের কিছু করার নেই! চলুন কর্নেলসায়েব! আপনাকে আমি ফরেস্ট বাংলোয় পৌঁছে দিয়ে থানায় ফিরব। আমাদের জিপ আর একটা ভ্যান রংলিডিহির কাছে দাঁড় করানো আছে।
