–বলুন!
–আমরা যখন রক্ত দেখছি, তখন জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত অমানুষিক চিৎকার শুনতে পেয়েছিলুম। না–চিৎকার বলাও যাবে না। চেরা গলায় আর্তনাদ কিংবা ওইরকম এখটা তীক্ষ্ণ কাঁপাকাঁপা হিংস্র শব্দ–শব্দটা একটানা অন্তত একমিনিট ধরে শোনা গেল। কৃষ্ণকান্তের বন্দুক আছে। ওর ভাই বরদা দুবার ফায়ার করল বন্দুকের। কিন্তু আমরা আর এগোতে সাহস পেলুম না। রক্ত দেখেই ধরে নিয়েছিলুম দীপু কোনও হিংস্র জন্তুর কবলে পড়েছে। বাঘ-ভালুকের কথা শোনা যায় না বটে, কিন্তু জঙ্গল তো! কোত্থেকে এসে জুটলেই হল। তবে সেই অমানুষিক চিৎকারটা কোন জানোয়ারের, তা আমরা এখনও বুঝতে পারিনি।
–তারপর আপনারা কী করলেন?
–সে রাত্রে থানায় খবর দিলুম। পুলিশ রাত্রে জঙ্গলে ঢুকতে রাজি হয়নি। সকালে থানার কজন সশস্ত্র কনস্টেবল নিয়ে বড়বাবু ডোবার পাড়ে রক্ত দেখেই বললেন, –দীপুকে বাঘে তুলে নিয়ে গেছে। ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। এলাকার লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সারা জঙ্গল তোলপাড় করল। কিন্তু দীপুর চিহ্নটুকু খুঁজে পাওয়া গেল না।
কর্নেল কুমুদবাবুর কথা শোনার পর বললেন, — এটাই যদি ঘটনা হয়, তাহলে মিঃ অধিকারী, আপনি নিশ্চয়ই আমার কাছে আসতেন না।
কৃষ্ণকান্ত অধিকারী বললেন, –আপনি ঠিকই ধরেছেন কর্নেলসায়েব! কুমুদ! এবার বাকি অংশটা বলো।
কুমুদবাবু বললেন, — দিন দশেক পরে পোস্টম্যান একটা খাম দিয়ে গেল। খামের ওপরে ইংরেজিতে আমার নাম-ঠিকানা লেখা ছিল! কিন্তু ভেতরে ছিল শুধু একটা রঙিন ফোটো। ফোটোটা দীপুর।
কর্নেল তীক্ষ্ণদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, — আপনার নিখোঁজ ছেলের ফোটো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি অবাক হয়েছিলুম। ফোটোটা উলটে দেখে আরও অবাক হলুম। পিছনে লাল কালিতে লেখা আছে : দীপু বেঁচে আছে। সময় হলেই বাড়ি ফিরবে।
মিঃ অধিকারী বললেন, “অদ্ভুত ব্যাপার! কুমুদ নিজের ছেলের হাতের লেখা চেনে। খামের ওপর ইংরেজি লেখা আর ফোটোর পিছনে বাংলায় লেখা নাকি দীপুর নয়।
কুমুদবাবু বললেন, — হ্যাঁ। দীপুর লেখা নয়। অন্য কেউ লিখেছে। মিঃ অধিকারী বললেন, –খাম আর ফোটোটা কর্নেলসায়েবকে দাও কুমুদ!
কুমুদবাবু বুকপকেট থেকে একটা খাম বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল খাম থেকে ফোটোটা বের করে উলটে-পালটে দেখলেন। তারপর বললেন, — হুঁ। তারপর?
কুমুদবাবু বললেন, — এর কদিন পরে আবার একটা খাম এল ডাকে। একই হাতের লেখা এবার শুধু একটা চিঠি। চিঠিতে লেখা আছে —
মিঃ অধিকারী বললেন, –চিঠিটা বরং কর্নেলসায়েবকে দাও। কুমুদবাবু পকেট থেকে আর একটা খাম বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল চিঠিটা বের করে মৃদুস্বরে পড়তে থাকলেন,
‘দীপুর পড়ার টেবিলে ড্রয়ারের মধ্যে খুঁজে দেখুন একটা অঙ্কের ধাঁধা লেখা আছে। ধাঁধার চারদিকে ৩২ লেখা আছে দেখতে পাবেন। যদি ওটা ড্রয়ারে না থাকে ওর বই আর খাতাগুলো তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবেন। নিশ্চয়ই ওটা পাবেন। পেয়ে গেলে ধাঁধার কাগজটা খামে ভরে হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলে জোবার দক্ষিণপাড়ে একটুকরো ঢিল চাপা দিয়ে গোপনে রেখে আসবেন। সাবধান! পুলিশ কিংবা অন্য কাকেও ঘুণাক্ষরে একথা জানাবেন না। কিংবা নিজেও সেখানে, গোপনে লক্ষ রাখবেন না। তাহলে দীপুকে আর ফিরে পাবেন না।‘
পড়া শেষ করে কর্নেল বললেন, — ধাঁধাটা পেয়েছিলেন?
– আজ্ঞে না। অগত্যা কী করব, অনেক ভেবেচিন্তে একটা চিঠি লিখে জঙ্গলের ভেতর ডোবার পাড়ে রেখে এসেছিলুম। লিখেছিলুম, ওটা খুঁজে পাচ্ছি না। দয়া করে আমাকে আরও দু’সপ্তাহ সময় দেওয়া হোক।
-তারপর? ঠিক দু-সপ্তাহ পরে আবার একটা চিঠি এল ডাকে। ওটা পেয়েছি কি না জানতে চেয়েছে।–বলে কুমুদবাবু আবার একটা খাম কর্নেলকে দিলেন।
মিঃ অধিকারী বললেন, — কুমুদ আবার সময় চেয়ে চিঠি রেখে এসেছিল। তার কিছুদিন পরে আমি হংকং থেকে ফিরলুম। কুমুদ আমাকে সব ঘটনা বলল। তখন আমাদের রেঞ্জের পুলিশের ডি. আই. জি. সুকুমার ভদ্রের কাছে কুমুদকে নিয়ে গেলুম। মিঃ ভদ্র হেসে উড়িয়ে দিলেন। পাত্তাই দিলেন না। বললেন, ছেলে বাবার সঙ্গে দুষ্টুমি করছে। আর কিছুদিন অপেক্ষা করুন। দীপু ঠিকই বাড়ি ফিরে আসবে।
কুমুদবাবু বলেন, –ওঁকে কিছুতেই বোঝাতে পারিনি, দীপু তেমন ছেলে নয়। জঙ্গলে রক্তের ব্যাপারটাও ডি. আই. জি. সায়েব গ্রাহ্য করলেন না। বললেন, — তাঁর কাছে এই কেসে রায়গড় থানার পুলিশ-রিপোর্ট আছে। ডোবাটার কাছে আদিবাসীদের ওঝারা নাকি গোপনে মুরগি বলি দেয়।
মিঃ অধিকারী বললেন, –সেটা অবশ্য ঠিক। জঙ্গলের পূর্বে আদি বস্তি আছে। ছোটবেলায় দেখেছি ওরা জঙ্গলে গিয়ে ধামসা বাজিয়ে নাচ-গান করে পুজো দিত। আজকাল ওরা খ্রিস্টান হয়ে গেছে। তা বলেও পুরোনো প্রথা কেউ গোপনে মেনে চলতেই পারে। যাই হোক, কর্নেলসায়েবকে অনুরোধ, দীপুর অন্তর্ধান রহস্যের একটা কিনারা করুন।
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ওঁরা দুজনে চলে গেলেন। তারপর বললুম, –রীতিমতো রহস্যজনক ঘটনা কর্নেল! বিশেষ করে অঙ্কের ধাঁধা এবং ৩২ সংখ্যাটার মধ্যে নিশ্চয় কোনও মূল্যবান জিনিসের সম্পর্ক আছে।
কর্নেল দীপুর ফোটোটা খুঁটিয়ে দেখছিলেন। হঠাৎ তিনি সেই খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে ‘নিখোঁজ’ শীর্ষক ছবিটা দেখতে থাকলেন। তারপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতশ কাঁচ বের করে দুটো ছবি মিলিয়ে দেখে সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, — বত্রিশের ধাঁধার আর একটা দিক খুবই অদ্ভুত জয়ন্ত! খবরের কাগজে ছাপা নিখোঁজ দীপককুমার রায়ের ছবি আর রায়গড়ের কুমুদবাবুর নিখোঁজ ছেলে সুদীপ্ত ওরফে দীপুর ছবি হুবহু মিলে যাচ্ছে।
