সত্যসেবক পত্রিকার বার্তা-সম্পাদকের তাড়া খেয়ে আমি যখন আজমগড় যাওয়া ঠিক করে ফেলেছি, তখন হঠাৎ ইলিয়ট রোড থেকে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ফোন পেলুম।-হ্যাল্লো জয়ন্ত! জরুরি দরকার। এক্ষুনি চলে এস।
অমনি আমার মাথা খুলে গেল। আরে তাই তো! কর্নেলের কথা তো ভুলেই গিয়েছিলুম! এসব ব্যাপারে এই ধূর্ত বুড়ো ঘুঘুর সাহায্য নেওয়া যায়। উনি সামরিক বিভাগে একসময় চাকরি করতেন। যুদ্ধে গেছেন। কত সব রোমাঞ্চকর কীর্তি করেছেন। এখন অবসর জীবনে নানান হবি নিয়ে থাকেন। যেমন—দুর্লভ জাতের পাখি প্রজাপতি পোকামাকড় খুঁজে বেড়ানো, পাহাড়ে জঙ্গলে সমুদ্রে ঘোরাঘুরি। তবে এখন ওঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় উনি প্রাইভেট গোয়েন্দা। নিতান্ত শৌখিন গোয়েন্দা আর কী! ধুরন্ধর কর্নেল এ অব্দি যে কত খুনি আর চোরডাকাত ধরতে সরকারকে সাহায্য করেছেন, তার সংখ্যা নেই। যেখানে রহস্যের গন্ধ, সেখানেই ষাট-বাষট্টি বছরের বুড়ো যেচে পড়ে নাক গলাবেন—এই ওঁর অভ্যাস। এই দাড়ি ও টাকওয়ালা বুড়োর খ্যাতি পুলিশমহলে অসাধারণ।
এমন মানুষ থাকতে আমি ভেবে মরছিলুম! তক্ষুনি ওর বাসায় চলে গেলুম। গিয়ে দেখি, এক অবাঙালি ভদ্রলোকের সঙ্গে উনি কথা বলছেন। ভদ্রলোকটির বয়স চল্লিশ-বেয়াল্লিশ হবে। খুব স্বাস্থ্যবান বলিষ্ঠ চেহারা। সিভিল পোশাকে ছিলেন বলে জানতেও পারিনি যে, উনিই আজমগড়ের সেই পুলিশ সুপার মিঃ রামধন দীক্ষিত!
ব্যস। তারপর আর কী! আকস্মিক যোগাযোগ এমনটি আর দেখা যায় না। আমরা পরদিন সকালেই বেরিয়ে পড়েছিলুম। ছোটনাগপুর অঞ্চলের আজমগড়ে পৌঁছতে আমাদের দুপুর লেগেছে। সেখানে মিঃ দীক্ষিতে কুঠিতে বিশ্রাম ও খাওয়া-দাওয়া সেরে অকুস্থলে পৌঁছেছি, তখন বিকেল চারটে।
সময়টা শীতের। বাপ। কী শীত কী শীত! বিহারের মাঠে দিনে হাঁড়কাপানো এমন শীত যখন, তখন রাতে কী অবস্থা হবে ভেবে ঘাবড়ে গেলুম। জিপে তাঁবু ও রান্নার সরঞ্জাম আনা হয়েছে। একজন রান্নার লোক রয়েছে—তার নাম মাযোরাম। আর আছে জনা চার সশস্ত্র সেপাই।
ওভারকোটটা কেন আনিনি তাই ভাবছি, দেখি কর্নেলবুড় দিব্যি বাদামি রঙের বুশ শার্ট প্যান্ট পরে ঘুরছেন। মাথায় শুধু লাল রঙের টুপি। শীতের বাতাস বইছে প্রচণ্ড। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে উনি চোখে বাইলোকুলার রেখে দেয়ালটা দেখছেন। আশ্চর্য বুড়ো!
একটা শুকনো নদীর তলায় আমাদের তাঁবু খাটানো হচ্ছে। জিপটা ঢালু পাড় গড়িয়ে নামাতে অসুবিধা হয়নি। ওপারে উঠে উঁচু জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি। দেয়ালটা দেখছি। আন্দাজ ছসাতশো মিটার দূরে একটা বিশাল স্কুপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালটা। গুর্গিন খাঁর দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। কে এই গুর্গিন খা? কর্নেল তাও জানেন। মোঘল আমলের এক দুর্ধর্ষ শাসনকর্তা। তার ছেলের নাম ছিল আজম খাঁ। যার নামে ছমাইল দূরের ওই শহর আজমগড়। দুর্গের সব ভেঙেচুরে গেছে। শুধু এই ষাট ফুট লম্বা বিশ ফুট উঁচু একটামাত্র পাথুরে দেয়াল খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে অবাক লাগে।
আশেপাশে অনেক ঢিবি আছে। ধ্বংসাবশেষ আছে। ঝোপঝাড়ও প্রচুর। কিছু ক্ষয়াখবুটে গাছও চোখে পড়ল। তার ওধারে ধু ধু মাঠ। দূরে কিছু পাহাড়। কাছাকাছি কোনও বসতি দেখতে পেলুম না শুনলুম একদল রাখাল গোরু-মোষ চরাতে একটা বাথান করেছিল ওখানে। তারাই প্রথমে ভূতুড়ে কাণ্ডটা দেখে এবং পালিয়ে যায়। তারপর থেকে দিনদুপুরেও কেউ এদিকে পা বাড়ায় না। কোন কোম্পানি সীসের খনির খোঁজে এসেছিল। রাতারাতি তাবু গুটিয়ে পালিয়ে বাঁচে।
কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে দেয়ালটাই হয়তো দেখছিলেন। মিঃ দীক্ষিত ও আমি কথা বলছিলুম! শীতের বেলা হু-হু করে পড়ে যাচ্ছে। শীগগির অন্ধকার এসে যাবে। আজ বরং অপেক্ষা করা যাক। কাল সকালে ওখানে গিয়ে সবকিছু খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা যাবে। আমরা দুজনে এসব কথাই আলোচনা করছিলুম। হঠাৎ দেখি কর্নেল এগোচ্ছেন। মিঃ দীক্ষিত বললেনএখনই—যাচ্ছেন নাকি? উনি কোনও জবাব দিলেন না। যেন সম্মােহিতের মতো চোখে দূরবীনটা রেখে হেঁটে যাচ্ছেন। আমি একটু হেসে চাপা গলায় বললুম—যাক না বুড়ো। ভূতে ঘাড় মটকে মিঃ দীক্ষিত হাসলেন। কিন্তু মুখটা কেমন করুণ দেখাল। বললেন—আসুন জয়ন্তবাবু। আমরাও যাই!
অগত্যা আমরা দুজনেও পা বাড়ালুম। তারপর অবাক হয়ে দেখি, বুড়ো দৌড়তে শুরু করেছেন। আমরা পরস্পর তাকাতাকি করলুম। আমরাও দৌড়ব নাকি? কিন্তু দেখতে দেখতে ততক্ষণে কর্নেল ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য। তখন আমরা হন্তদন্ত ছুটলুম।
ঝোপঝাড় পেরিয়ে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। বড় বড় পাথর পড়ে আছে। কিন্তু কর্নেলের পাত্তা নেই। বেমালুম উবে গেলেন যে! মিঃ দীক্ষিত ডাকলেন—কর্নেল! কর্নেল সাহেব! কোনও সাড়া এল না। বললুম—ছেড়ে দিন। বুড়োর স্বভাবই এরকম। ঠিক এসে পড়বেনখন।
তখন সূর্য ড়ুবেছে। শীতও ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। হাঁটতে-হাঁটতে আমরা গেলুম সেই দেয়ালটার কাছে। উঁচু ঢিবির কাছে রয়েছে। তাকাতেই আমার গা শিউরে উঠল। মনে হল দেয়ালটা যেন হিংস্র চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। চোখের ভুল ছাড়া কিছু নয়। ঢিবির ওপর ওঠা শুরু করলুম। সেই সময় মিঃ দীক্ষিত মনে পড়িয়ে দিলেন—আমাদের সঙ্গে টর্চ নেই।
অতএব বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। ঢিবিতে উঠে দেখলুম একটা প্রশস্ত পাথরের মেঝে। ফাটলে ঘাস গজিয়ে আছে। সামনে পূর্বে-পশ্চিমে লম্বা দেয়ালটা আন্দাজ বিশ ফুট উঁচু। মনে হল, ওটা কমপক্ষে দুগজ চওড়া। সুতরাং ওর ওপর দৌড়াদৌড়ি করা সম্ভব বইকি। এক জায়গায় একটা মস্ত ফাটল দেখছিলুম। সেখানে একটা শুকনো কোনও গাছের গুড়ি ও শেকড় মেঝে অবধি নেমে এসেছে। গাছটা যেভাবেই হোক, মারা গেছে কবে এবং ডগার দিকটা ক্ষয়ে ভেঙে গেছে সম্ভবত। দীক্ষিত বললেন—দেখুন জয়ন্তবাবু, মনে হচ্ছে—কেউ ইচ্ছে করলে ওই গাছটা বেয়ে দেয়ালের ওপর উঠতে পারে। তাতে সায় দিলুম।
