মোহনবাবু আমার সমবয়সী যুবক। খুব হাসিখুশি স্বভাবের। সাহসী বলেও মনে হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে এখন এই এলাকায় পাটকাঠি থেকে কাগজ তৈরির কারখানা গড়ার চেষ্টা করছেন। এ এলাকায় প্রচুর পাট চাষ হয়।
মোহনবাবু বললেন, দেখুন কর্নেল, দাদুর কাজ দুদিন পরে হলেও চলবে। কিন্তু আপনাদের সঙ্গ তো আর পাব না! আপনাদের দু’জনের কীর্তিকথা এতকাল কাগজে পড়েছি। হঠাৎ কপালগুণে আপনারা যে এই জঙ্গলে পাণ্ডব বর্জিত এলাকায় এসে পড়বেন, কল্পনাও করিনি। তা আবার আমাদের বাড়িতেই!
কর্নেল সস্নেহে ওর কাঁধে হাত রেখে বললেন, তোমার বাবা এ জেলার প্রখ্যাত শিকারি ছিলেন। ওড়িশার জঙ্গলে যখন মানুষখেকো বাঘ শিকারে গিয়ে প্রমথনাথ মারা যান, আমি তার সঙ্গী ছিলুম। তোমার বয়স তখন খুব কম। তোমাদের কলকাতার বাড়িতে মাঝে মাঝে গেছি অবশ্য।
মোহনবাবু বললেন, মায়ের কাছে সব শুনেছি। দাদুও বলছিলেন।
কথা বলতে বলতে আমরা আরও মাইলটাক এগিয়ে মহিমবাবুর চরের এলাকায় পৌঁছলুম। বাঁ দিকে পদ্মার জল অনেকগুলো বালির ঢিবির আনাচ-কানাচ ঘুরে বয়ে যাচ্ছে। কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে বুঝি মহিমবাবুর চর খুঁজছিলেন। সাইকেল দাঁড় করিয়ে রেখে মোহনবাবু একটা খাড়ির ধারে গিয়ে কাদের ডাকতে থাকলেন।
একটু পরে ফিরে এসে বললেন, চলুন, নৌকো রেডি।
বালি-কাদা ভরা পিছল খাড়িতে একটা পানসি নৌকো নিয়ে মাঝিরা অপেক্ষা করছিল। নৌকো চেপে আমরা চললুম সেই চরের দিকে। চরটা দেখা যাচ্ছিল না। শুনেছি, মহিম হালদার নামে কেউ বহুকাল আগে ওই চরে গিয়ে বসতি করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবার বন্যায় ঘরবাড়ি ভেসে যেত। তারপর থেকে চরটা জনহীন হয়ে পড়ে আছে। শুধু মহিমবাবুর পুরনো একতলা হঁটের বাড়িটা রয়ে গেছে। সেখানে মাঝে মাঝে সীমান্ত বাহিনী গিয়ে ক্যাম্প করে থাকে। এখন সীমান্ত এলাকা শান্ত বলে তারা ওখানে নেই।
ঘণ্টা তিনেক লাগল পৌঁছুতে।
মাঝিরা নৌকোয় থাকল। তারা রান্নাবান্না করবে এখন। আমরা যতক্ষণ থাকব, ওদেরও থাকতে হবে।
ঘন কাশবন আর ঝোঁপঝাড়ে ঢাকা চর। উঁচু গাছের সংখ্যা খুব কম। সবচেয়ে উঁচু জায়গাটা একটা জীর্ণ দালান বাড়ি। সীমান্তবাহিনীর ফেলে যাওয়া কয়েকটা খাঁটিয়া রয়েছে ঘরে। জানালা-দরজা ফেটে রয়েছে। বারান্দায় একটা উনুন দেখতে পেলুম। কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে বললেন, ওটাই বুঝি সেই পীরের চর?
খালি চোখেই দেখা যাচ্ছিল, মাইলটাক দূরে পদ্মার বুকে একটা ঘন সবুজ দ্বীপ। চারদিকে জল। মোহনবাবু হাসতে হাসতে বললেন, হ্যাঁ, কর্নেল, ওখানেই নাকি দুটো বাঘ মানুষের গলায় কথা বলত।
আর রাক্ষুসির বাঁওড় কোন্টা?
মোহনবাবু আঁতকে ওঠার ভান করে বললেন, তাও কানে গেছে? ওই দেখুন-পীরের চরের ডান দিকে পদ্মা খানিকটা ঢুকে গেছে বিলের মতে-দেখতে পাচ্ছেন? ওটাই সেই ভূতুড়ে বাঁওড়।
কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে হঠাৎ বললেন, আশ্চর্য তো!
আমরা দুজনে এক গলায় বললুম, কী?
একটা স্পিড-বোট।
মোহনবাবু কর্নেলের কাছ থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন বাইনোকুলার। দেখতে দেখতে বললেন, তাই তো! আমাদের সীমান্ত বাহিনীর গোটা দুই স্পিডবোট আছে বটে, সে তো সেই লালগোলা ক্যাম্পে। তাছাড়া এ স্পিডবোটের গড়নও অন্যরকম।
আমি বললুম, বাংলাদেশের নয় তো?
কর্নেল বললেন, না। কারণ স্পিডবোটে একটা স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকা আছে। আর একটা মড়ার খুলি এবং তার তলায় আড়াআড়ি দুটো হাড়ও আঁকা। তার মানে, সাবধান! আমি সাক্ষাৎ মৃত্যু!
বলেন কী! অজানা ভয়ে বুকটা ধড়াস করে উঠল আমার।
মোহনবাবু বললেন, স্পিড-বোটে জনা চার লোক বসে আছে। ওরে বাবা! একটা সাব মেশিনগান ফিট করা আছে দেখছি। কর্নেল! কর্নেল! ওরা পীরের দিকে এগোচ্ছে।
কর্নেল বললেন, যা যার যেখানে খুশি। আমরা তো পাখির ব্যাপারে এসেছি! ইয়ে–ডার্লিং জয়ন্ত! তাহলে এবার সঙ্গের খাদ্যগুলোর সত্ত্বার করে নিয়ে বেরুনো যাক। রোদ্দুরটা খাসা। আবহাওয়াও মোলায়েম। ওই দেখ, কত পাখি! জয়ন্ত! বিশ্বাস করো, একসঙ্গে এত জলচর পাখি কখনও দেখিনি! অভূতপূর্ব। বিস্ময়কর!
.
দুই
অভূতপূর্ব এবং বিস্ময়করই বটে। এমন লক্ষ লক্ষ, নাকি কোটি কোটি জলচর পাখির সমাবেশ কোথাও দেখিনি। যতদূর চোখ যায়, খালি পাখি আর পাখি। তাদের চেঁচামেচিতে কান পাতা দায়। জল থেকে এখানে ওখানে বালির চর জেগে রয়েছে। সেইসব চরে অসংখ্য পাখি বিশ্রাম করছে। ঝাঁকে ঝাকে আকাশে উড়ছে। আবার ছল-ছলাৎ শব্দে জলে নামছে। মনে হচ্ছে একটা দীর্ঘ চাবুক আকাশ থেকে কেউ সপাং করে জলে মারল।
বন্দুকের আওয়াজ করলে কর্নেলের সেই ‘বখাঁস’ দর্শন হবে না। তাই উনি আমাকে আর মোহনবাবুকে দক্ষিণে যেতে বলে একা গেলেন চরের উত্তর দিকে। কাশবনের আড়ালে ওঁর টুপিটি দেখা যাচ্ছিল। আমরা চরের দক্ষিণ দিকে ঢালুতে নেমে আর ওঁকে দেখতে পেলুম না।
কিছুক্ষণের মধ্যে মোহনবাবুর সঙ্গে এত ভাব হয়ে গেল যে, আমরা পরস্পরকে তুমি বলতে শুরু করলুম এবং নাম ধরে ডাকাডাকি চলল।
মোহন বলল, আজকাল এত বেশি জলচর পাখি নির্ভয়ে এ তল্লাটে এসে জুটছে কেন জানো? এদিকে কেউ পা বাড়ায় না বলে। এসব পাখি মারা বেআইনি। কিন্তু সেজন্য নয়। প্রথম কথা, বর্ডার বাহিনীর নিষেধাজ্ঞা আছে। দ্বিতীয় কথা হল, পীরের চর আর রাক্ষুসির বাঁওড় সম্পর্কে লোকের ভীষণ আতঙ্ক। যারা এদিকে একা-দোকা এসেছে, তারা কেউ ফিরে যায়নি।
