কী তথ্য?
শচীনবাবু ছিলেন ম্যাজিশিয়ান। আর জগাই ছিল শ্মশানের…।
হুঁ, ম্যাজিশিয়ানদের বলা হয় জাদুকর। জাদুর সঙ্গে নাকি তন্ত্রমন্ত্রের সম্পর্ক আছে। আবার তন্ত্রমন্ত্রের সঙ্গে তান্ত্রিক এবং তান্ত্রিকের সঙ্গে শ্মশানের সম্পর্ক আছে। কাজেই তোমার তথ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শাস্ত্রীমশাই, মানে দিপুর বাবার কাছে সে-খবর কলকাতায় বসেই পেয়ে গেছি।
চাপা গলায় বললাম, যা-ই বলুন, এই রঘুলাল লোকটিকে আমার পছন্দ হচ্ছে না। খুব ধূর্ত! আমাকে ভয় দেখাচ্ছিল। তাছাড়া ঝিলের ঘাট থেকে বাংলোয় ফেরার সময় কী করে ও টের পেল, অমি সত্যি সত্যিই ভয় পেয়েছি? বলল, আপনি কি ভয় পেয়েছেন? আপনাকে কেমন যেন দেখাচ্ছে ….।
তোমাকে এখনও কেমন যেন দেখাচ্ছে, ডার্লিং! কর্নেল মুচকি হেসে বললেন। ভূতপ্রেত বিশ্বাস করে না যারা, ভূতপ্রেতের ভয় তাদেরই বেশি। বিশেষ করে ভূতের চিঠি ভূতের চেয়ে সাংঘাতিক।
চটে গিয়ে বললাম, ভূতপ্রেত হুমকি দিয়ে চিঠিটা লেখেনি। লিখেছে কোনো মানুষ।
হুঁ, মানুষ। সেই মানুষকে সম্ভবত তান্ত্রিক আদিনাথের ভূত ভর করেছে।
রসিকতা শোনার মেজাজ ছিল না। তবে বরাবর এটা লক্ষ্য করেছি, রহস্য যত জটিল এবং সাংঘাতিক হয়, আমার বৃদ্ধ বন্ধুটিকে রসিকতা তত বেশি ভূতের মতো ভর করে। বিছানায় গিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে দিলাম। ট্রেন আর বাসজার্নির ধকল এতক্ষণে পেয়ে বসেছিল। একটু পরে লক্ষ করলাম, কর্নেল পকেট থেকে একটুকরো ভাঙা চাকতির মতো কী একটা ছোট্ট জিনিস বের করলেন। তারপর কিটব্যাগ থেকে খুদে একটা ব্রাশ আর লোশনের শিশিও বেরোতে দেখলাম। চাকতিটার আধখানা চাঁদের মতো গড়ন। লোশনে ব্রাশ চুবিয়ে ঘষতে থাকলেন কর্নেল! জিজ্ঞেস করলাম, জঙ্গলে মোহর কুড়িয়ে পেয়েছেন বুঝি?।
কর্নেল আনমনে বললেন, মোহরের ভাঙা টুকরো বলতেও পারো! তবে সোনার নয়। সেকেলে মুদ্রাও নয়। কী সব খোদাই কার সিলের টুকরো। কাদা ধুয়ে ফেলেও কিছু বুঝতে পারিনি। দেখা যাক।
কিছুক্ষণ পরে রঘুলালের সাড়া পাওয়া গেল। ওর হাতে টর্চ আর লাঠি দেখলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, সব রেডি রইল স্যার! কিচেনঘরের চাবিটা দিয়ে যাচ্ছি। আমি ভোর ছটায় এসে যাব।
কর্নেলের ইশারায় ওর হাত থেকে কিচেনের চাবি নিয়ে এলাম। ও চলে গেল। কর্নেল ভাঙা সিলটা আতশ কাচে দেখতে থাকলেন। জিজ্ঞেস করলাম, গুপ্তযুগের সিল নাকি?
কী? গুপ্তযুগ? কর্নেল নিঝুম সন্ধ্যারাতের পুরোনো ডাকবাংলোর স্তব্ধতা ভাঙচুর করে অট্টহাসি হাসলেন। হুঁ, ওই এক পুরাতাত্ত্বিক বাতিক জয়ন্ত! মাটির তলায় কিছু পাওয়া গেলেই সটান গুপ্তযুগ। তার আগে বা পরে নয়! তবে এটাই আশ্চর্য! এটা পুরো একটা সিলের আধখানা মাত্র। সিলটা আধখানা কেন, এটাই প্রশ্ন।
এই সময় আচমকা বাংলোর আলো নিভে গেল। কর্নেল তখনই টর্চ জ্বেলে বললেন, ফায়ারপ্লেসের ওপর থেকে হারিকেনটা এনে জ্বেলে দাও জয়ন্ত! লোডশেডিং প্রেতাত্মাকে বাংলোয় আসার সুযোগ করে দিতে পারে, কুইক! তাঁর কণ্ঠস্বরে স্বভাবসিদ্ধ কৌতুক। কিন্তু আমার গা ছমছম করতে লাগল।
ইংরেজ আমলের বাংলা। কাজেই ফায়ারপ্লেস আছে। ঝটপট হারিকেন জ্বেলে এনে টেবিলে রাখলাম। দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিলাম। কর্নেল বললেন, চলো! বরং বারান্দায় বসে জ্যোৎস্নায় প্রকৃতিদর্শন করা যাক।
বেরিয়ে গিয়ে দেখি সুন্দর জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে। ঝিলের জল ঝিলমিল করছে। গাছপালা তোলপাড় করে বাতাস বইছে। সেই অস্বস্তিকর অনুভূতি আবার ফিরে এল। ভয়ের চোখে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছিলাম। হাতে টর্চ এবং পকেটে রিভলবার তৈরি। আস্তে বললাম, সত্যি লোডশেডিং, নাকি কেউ মেইন সুইচ অফ করেছে দেখে আসা উচিত। কারণ ওই তো দূরে আলা দেখা যাচ্ছে।
কর্নেল বললেন, ছেড়ে দাও! জ্যোৎস্নায় পুরোনো পৃথিবীকে ফিরে পাওয়া যায়। তাছাড়া জ্যোৎস্নায় একটা নিজস্ব সৌন্দর্যও আছে। কোন কবি যেন লিখেছিলেন, এমন চাঁদের আলো/মরি যদি সেও ভাল/ সে মরণ স্বরগ সমান।
বিরক্ত হয়ে বললাম, মৃত্যটা প্রেতাত্মার হাতে হওয়া বড় অপমানজনক। আমরা মানুষ।
ডার্লিং! তা হলে দেখছি এই আদিম পরিবেশ তোমাকে প্রেতাত্মায় বিশ্বাসী করতে পেরেছে।
বোগাস! আসলে আমি বলতে চাইছি…
বলার আগে দেখে নাও। ওই দ্যাখো, ডান দিকে ঝোপের আড়ালে প্রেতাত্মা উঁকি দিচ্ছে!
ভ্যাবাচাকা খেয়ে সেইদিকে টর্চের আলো ফেললাম। কয়েক সেকেন্ডের জন্য বোধবুদ্ধি হারিয়ে গেল। দক্ষিণ-পশ্চিমের ঢালের মাথায় উঁচু ঝোপজঙ্গল। একখানে ঝোপ থেকে মুখ বের করে আছে সত্যিই একটা কঙ্কাল। খুলি থেকে কাঁধ অবধি দেখা যাচ্ছে।
সঙ্গে-সঙ্গে টর্চ টেবিলে রেখে রিভলবার বের করে ছুঁড়লাম। কর্নেল আমার কাঁধ ধরে নাড়া দিলেন। জয়ন্ত! জয়ন্ত! করছ কী?
এবার টর্চ জ্বেলে দেখি কঙ্কাল অদৃশ্য। উত্তেজিতভাবে বললাম, অবিশ্বাস্য! অসম্ভব!
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে চাপা স্বরে বললেন, সব ভেস্তে দিলে তুমি! আমাদের কাছে ফায়ার আর্মস আছে জেনে গেল প্রেতাত্মাটা। এবার ও খুব সাবধান হয়ে যাবে।
বলে কর্নেল টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে ঝোপটার দিকে এগিয়ে গেলেন। ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ চারদিকে আলো ফেলে তন্নতন্ন খুঁজে ফিরে এলেন। একটু হেসে বললেন, যা ভেবেছি তাই। একটা কথা বলি, ডার্লিং! এখানে কোথাও যা কিছু ঘটুক, কখনও মাথা খারাপ করে ফেলবে না। বিশেষ করে গুলি ছোঁড়াটা চলবে না।
