তুমি কি প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করো?
নাহ। ওসব স্রেফ গুলতাপ্পি। ঠাকুরদা কী সব বোগাস গল্প ফেঁদে গেছেন, আমি একটুও বিশ্বাস করি না। বাবাও বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু হঠাৎ দু-দুটো নরবলির ঘটনা। তারপর পাতালঘর থেকে সিন্দুকের তালা ভেঙে কে কঙ্কাল সরাল। তাই বাবার মাথা খারাপ হয়ে গেল। কর্নেল। পাতালঘরের কথা আমি ঠাকুরমার কাছে শুনেছিলাম। কিন্তু সিন্দুকে যে কঙ্কাল আছে, তা আমি জানতাম না। নরবলির ঘটনার পর একরাত্রে বাবা আমাকে আর ভজুয়াকে ডেকে চুপিচুপি পাতালঘরে ঢুকলেন। পাতাল ঘরের দরজার তালা কিন্তু ভাঙা ছিল না। গতকাল সন্ধ্যায় বাবা আপনার কাছে সব কথা খুলে বলেননি।
হয়তো কঙ্কগড়ে গেলে বলবেন ভেবেছিলেন।
দীপক চাপা গলায় বলল, সিন্দুকের ভিতর কঙ্কাল সত্যিই ছিল কি? আমার বিশ্বাস হয় না। অতকালের পুরোনো কঙ্কাল। আস্ত থাকার কথা নয়। অথচ সিন্দুকে একটুকরো হাড়ও পড়ে নেই।
ভজুয়াকে কেউ ওভাবে খুন করবে কেন? তোমার কী ধারণা?
দীপক একটু চুপ করে থাকার পর বলল, সম্ভবত ভজুয়া কিছু জানত। তার মানে, শচীনদা আর জগাইকে কে বা কারা ওভাবে খুন করেছে, সে জানতে পেরেছিল। কারণ জগাই খুন হওয়ার পর ভজুয়া আমাকে বলেছিল, খামোখা একজন সাধুসন্ন্যাসী মানুষের বদনাম রটাচ্ছে লোকে। তার আত্মা স্বর্গে বাস করছেন ভগবানের কাছে। ভজুয়া বলেছিল, শিগগির সে এর বিহিত করবে।
ভজুয়া বলেছিল?
হ্যাঁ। দাদুর জ্যাঠামশাই সম্পর্কে ভজুয়ার খুব শ্রদ্ধা ছিল। তার ঠাকুরদার বাবা নাকি ওঁর সেবা করত। দীপক হঠাৎ একটু নড়ে বসল। মনে পড়ে গেল! গত মাসে দোতলা থেকে অনেক রাতে আমি ঝিলের ধারে জঙ্গলের ভেতর আলো দেখেছিলাম। ছেলেবেলা থেকে আমি তো আসানসোলে পড়াশোনা করেছি। কক্ষগড়ে সবসময় থাকিনি। তো সকালে মাকে কথাটা বললাম। মা বললেন, ওই জঙ্গলে আলো নতুন কিছু নয়। মা-ও নাকি অনেকবার দেখেছেন। আমি কিন্তু এতকাল পরে ওই একবার।
বললাম, কিসের আলো? মানে –টর্চ না হারিকেন?
না। মশালের আলো বলে মনে হয়েছিল।
কর্নেল চোখে হেসে বললেন, প্রেতাত্মারা টর্চ বা হারিকেন জ্বালে না জয়ন্ত!
দীপক বলল, আপনি কি ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করেন?
প্রকৃতিতে রহস্যের শেষ নেই দিপু!
দীপক যেন একটু বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল! বলল, আমি চলি তা হলে।
আচ্ছা এসো।
দীপক বেরিয়ে গেলে বললাম, কঙ্কগড়ের সাংঘাতিক ভূতটা আপনাকে পেয়ে বসেছে মনে হচ্ছে। ভূত বা প্রেতাত্মার সঙ্গে প্রকৃতির কী সম্পর্ক?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, আছে। প্রকৃতি চির-আদিম। ভূতপ্রেতও আদিম শক্তি, ডার্লিং!
.
০২.
কক্ষগড়ে আমরা উঠেছিলাম সরকারি ডাকবাংলোয়। বাংলোটি পুরনো ব্রিটিশ আমলে তৈরি। গড়নে বিলিতি ধাঁচ। কিন্তু অযত্নের ছাপ আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে আছে। লনের ফুলবাগান আর চারপাশের দেশি-বিদেশি গাছপালা একেবারে জঙ্গুলে হয়ে গেছে। চৌকিদার রঘুলাল দুঃখ করে বলছিল, নতুন সার্কিট হাউস হওয়ার পর সরকারি কর্তারা এলে সেখানেই ওঠেন। সেখানে জায়গা না পেলে তবে কদাচিৎ কেউ এখানে জোটেন। আসলে বসতি থেকে বেশ খানিকটা দূরে বলেই এই দুরবস্থা।
তবে নীচেই সেই বিশাল ঝিল এবং পাশে জঙ্গলের শুরু। তার ওধারে একটা নদী আছে। তার মানে, একসময় ঝিলটি নদীর অববাহিকার একটা স্বাভাবিক জলা ছিল। ইদানীং অনেকে একে ‘লেক’ বলতে শুরু করেছে। খনি অঞ্চলের শিল্পনগরী থেকে দল বেঁধে অনেকে পিকনিক করতেও আসে। রঘুলাল বলছিল, নরবলির পর পিকনিক বন্ধ হয়ে গেছে। সন্ধ্যার অনেক আগে এদিকটা জনহীন হয়ে পড়ে। রঘুলালও সূর্যাস্তের আগে বাড়ি চলে যায়। তবে কর্নেলস্যার যখন এসেছেন, তখন রাত্তিরটা এখানে কাটাতে তার ভয় নেই। এই সায়েবকে সে ভালোই চেনে। এর আগে কতবার উনি এখানে এসেছেন।
আমরা পৌঁছেছিলাম বিকেল চারটে নাগাদ। আমাকে বিশ্রাম করতে বলে কর্নেল একা বেরিয়েছিলেন। বাংলোর বারান্দা থেকে লক্ষ করছিলাম, উনি বাইনোকুলারে পাখি টাখি দেখতে-দেখতে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেলেন। রঘুলাল একটা থামে হেলান দিয়ে বসে কঙ্কগড়ের গল্প করেছিল। তান্ত্রিক আদিনাথের অলৌকিক কীর্তিকলাপের কথাও বলছিল। আদিনাথের কঙ্কালের ধড় ও মুণ্ডের কাহিনিও তার জানা। ধড় ও মুণ্ড জোড়া লাগলে তান্ত্রিক আদিনাথ যে সশরীরে আবার আবির্ভূত হবেন, এটা সে বিশ্বাসও করে এবং তবে ধারণা, এই কাজটা কেউ করতে পেরেছে এতদিনে। তাই তান্ত্রিকবাবা নিজের কাজে নেমে পড়েছেন।
বললাম, কিন্তু তান্ত্রিকবাবা তো শুনেছি ১০৮টা নরবলি দিয়ে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। আবার কেন উনি নরবলি দিচ্ছেন?
রঘুলাল বাংলা বলতে পারে বাঙালির মতোই। মাথা নেড়ে বলল, না স্যার! ১০৮টা নরবলির আগে উনি নিজেই বলি হয়েছিলেন। শুনেছি, তিনটে নরবলি বাকি ছিল। এতদিনে হয়ে গেল।
এই লোক তিনটিকে তুমি চিনতে?
চিনব না কেন স্যার? প্রথমে বলি হলেন শচীনবাবু। উনি ম্যাজিক দেখাতেন।
ম্যাজিশিয়ান ছিলেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ। এ-দেশ ও-দেশ ঘুরে ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াতেন। তো তারপর গেল জগাই। জগাই শ্মশানে মড়া পোড়াত। শেষে গেল ভজুয়া। জমিদারবাড়ির কাজের লোক। জমিদারি আমাদের ছোটোবেলায় উঠে গেছে। তা হলেও জমিদারবাড়ি নামটা টিকে আছে। তবে দেখলে বোঝা যায় কী অবস্থা ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা বুঝুন, তান্ত্রিকবাবা ছিলেন ওই জমিদারবাড়ির লোক। শুনেছি, বিষয়সম্পত্তি ছেড়ে জপতপ নিয়েই পড়ে থাকতেন।
