কর্নেল আনমনে বললেন—আমারই বুদ্ধির ভুল! আঃ তখনই যদি…
কর্নেল! আবার হেঁয়ালি করছেন আপনি!
কর্নেল স্থিরদৃষ্টে পুলিশ সুপারের দিকে তাকিয়ে বললেন-অজিতেশ! জনা চার-পাঁচ বুদ্ধিমান এবং অভিজ্ঞ অফিসার নিয়ে তুমি এখনই আমার সঙ্গে এস। আমার ধারণা, বড্ড দেরি হয়ে গেছে! তবু চেষ্টা করতে দোষ কী?
অজিতেশ তক্ষুনি পুলিশ অফিসারদের ডেকে জিপে উঠতে বললেন। তারপর কর্নেলকে ডেকে বললেন—আমরা রেডি। চলে আসুন কর্নেল।
কর্নেল জিপের সামনে অজিতেশের পাশে বসে বললেন—সোজা আমার বাংলোয় চলো। ওখানে জিপ রেখে আমরা যথাস্থানে রওনা দেব।
জিপ প্রচণ্ড বেগে ছুটল। আলো আর ভিড়েভরা বাজার এলাকা ছাড়িয়ে জিপ নদীর ধারে সরকারি বাংলোয় পৌঁছোল। কর্নেল বললেন—সবাই আমার সঙ্গে আসুন। কোনও শব্দ করবেন না টর্চ রেডি রাখুন। কেউ যেন গুলি ছুঁড়বেন না। সাবধান! যদি কেউ আক্রমণ করে, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা। তবে কেউ আক্রমণ করবে বলে মনে হয় না!
অজিতেশ ও পুলিশ অফিসাররা কর্নেলকে অনুসরণ করলেন।
কর্নেল অন্ধকারে নদীর দিকে হাঁটছিলেন। সেই গাবতলায় পৌঁছে একটু দাঁড়ালেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন—নদীর ওপারে যেতে হবে আমাদের। দেখবেন, কেউ যেন জলে না
পড়েন।
কুয়াশার মধ্যে মিটমিটে নক্ষত্রের আলো নদীর জলে কোথাও কোথাও ঝিকমিক করছে। সাবধানে বালির চড়া পেরিয়ে সবাই ওপারে পৌঁছলেন।
সামনে বাঁশবন নিঃঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে। বাঁশের পাতা থেকে শিশির পড়ার টুপটাপ শব্দ শোনা যাচ্ছে। একবার পাচা ডেকে উঠল বিশ্রী শব্দে। তারপর গোরস্থানের ওদিকে
শেয়াল ডাকতে লাগল।
কর্নেল আগে, পুলিশ অফিসাররা পেছনে। কাঁটাঝোপে বারবার কাপড় আটকে যাচ্ছে। আছাড় খেতে হচ্ছে। শুকনো পাতা শিশিরে ভিজে গেছে বলে জুতোর শব্দ হচ্ছে না। কিছুটা চলার পর কর্নেল দাঁড়ালেন। কান পেতে কী যেন শোনার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু কোনও শব্দ শোনা গেল না। আবার কিছুটা এগিয়ে কর্নেল ফিসফিস্ করে বললেন—রেডি! টর্চ জ্বালাতে হবে। ওয়ান টু থ্রি…
সঙ্গে সঙ্গে সাতটা টর্চ জ্বলে উঠল।
সেই উজ্জ্বল আলোয় দেখা গেল, জায়গাটা একটা গোরস্থান। আর সেখানে একদঙ্গল শেয়াল মাটি শুকছে একটা সদ্যখোঁড়া কবরের কাছে। তাদের চোখগুলো নীল।
হঠাৎ আলোয় তারা ভড়কে গিয়ে চোখের পলকে গা ঢাকা দিল। কর্নেল সদ্যখোঁড়া কবরটার কাছে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।
অজিতেশ বলে উঠল—কী ব্যাপার কর্নেল? এর মাথামুণ্ডু কিছু যে বুঝতে পারছি না।
কর্নেল মাটির কবরের গর্তে আলো ফেলে হতাশস্বরে বললেন-দেরি হয়ে গেছে! আজিমুদ্দিনের মমি-মুণ্ডু এখানেই লুকিয়ে রেখেছিল সে। মদনবাবুকে খুন করে বাকসোটা হাতিয়ে সোজা এখানে এসেছিল। তারপর মমি-মুণ্ডুটা তুলে নিয়ে গোপন জায়গায় চলে গেছে। এতক্ষণে নিশ্চয় সে মুণ্ডু থেকে চাবি খুঁজে বের করেছে এবং বাকসো খুলে রত্নটিও পেয়ে গেছে।
অজিতেশ উত্তেজিত ভাবে বললেন—কর্নেল! কর্নেল! কী সব বলছেন আপনি? কার কথা বলছেন?
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে জবাব দিতে যাচ্ছেন, হঠাৎ গোরস্থানের অন্যপ্রান্ত থেকে কার বিকট চিৎকার শোনা গেল—ইয়া পির মুশকিল আসান! যাহা মুশকিল তাহা আসান!
টর্চের আলো গিয়ে পড়ল ওদিকে। দেখা গেল সেই কালো আলখেল্লা ও কালো টুপিরা ফকির হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে।
অজিতেশ অবাক হয়ে বললেন, আরে! এ তো দেখছি পিরের মাজারের সেই পাগলা ফকির! এ আবার এখানে জুটল কেন?
কর্নেল বললেন–চুপ। ফকির কী বলে আগে শোনা যাক।
ফকির নির্ভয়ে গটগট করে চলে এল সামনে। তারপর বলল—বাবালোক! সরকারের টর্চের ব্যাটারি কি খুব সস্তা হয়ে গেছে? না কি কোম্পানিকা মাল, দরিয়ামে ডাল! কর্নেলসাহাব! ওনাদের বলুন, বেফায়দা আলো জ্বেলে লাভ কী? এটা গোরস্থান। এখানে পিদিমের আলোই মানায়।
বলে সে তার হাতের লণ্ঠনটি রেখে আলখেল্লার ভেতর থেকে দেশলাই বের করে জ্বালল। কর্নেল বললেন—টর্চ নিভিয়ে ফেলুন আপনারা!
তারপর ফকিরকে বললেন—ফকির সায়েব! আপনার কথাই সত্যি হল। হেকিম লতিফ খাঁ সত্যি আজিমুদ্দিনের মুণ্ডু চুরি করে এনে এই কবরে লুকিয়ে রেখেছিল। তারপর …
বাধা দিয়ে ফকির বলল—তারপর বাকসো চোরকে খুন করে বাকসোও হাতিয়েছে। এই তো?
কর্নেল বললেন—আপনি তাহলে সবই জানেন দেখছি!
বেটা আমি সর্বচর। সব জায়গায় ঘুরে বেড়াই। তো সেলাম পুলিশসায়েব! আপনিও এসেছেন। দেখছি। লেকিন লতিফ খাঁকে আর ছুঁড়ে বের করতে পারবেন? সে এখন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!
অজিতেশ কী বলতে যাচ্ছিলেন, কর্নেল তাকে থামিয়ে বললেন— ফকিরসায়েব! আপনার অজানা কিছুই নেই। লতিফ খাঁ এখন কোথায়, আপনি নিশ্চয় জানেন!
ফকিরের মুখ বিকৃত হয়ে গেল। সে বলল—তাকে ধরে ফেলব বলে আমিও তার পিছু নিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাটা খুব ধূর্ত। অন্ধকারে ঘুরপথে এগিয়ে আমাকে বোকা বানিয়ে দিয়েছে। তবে যেখানেই লুকিয়ে বাকসো খুলে আজব মণি বের করুক, তাকে আমি পাকড়ে ফেলব।
বলেই ফকির গতকাল সন্ধ্যার মতো আলখেল্লার ভেতর থেকে কী একটা বের করে লণ্ঠনের ওপর ছড়িয়ে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে দুর্গ সাদা একরাশ ধোঁয়ায় সারা গোরস্থান ঢেকে গেল। কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন—সরে আসুন! সরে আসুন সবাই। বিষাক্ত গ্যাসে মারা পড়বেন।
