চর্যাগীতি বৌদ্ধ মহাযান মতের উপশাখ তান্ত্রিক বজ্রযান সম্প্রদায়ের বামাচারী-সহজিয়া যোগী-শৈব পন্থের সাধন-ইঙ্গিত সম্বলিত রূপক রচনা। এতে তৎকালীন বিভিন্ন মতের মিশ্রণ ঘটেছে। এ রূপকাশ্রিত হেঁয়ালি সান্ধ্যভাষায় রচিত। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর নাম দিয়েছেন আলো আঁধারী ভাষা। এই ধর্মমত, সাধনতত্ত্ব ও রচনারীতির অনুবর্তন রয়েছে নাথপন্থী, বৈষ্ণব সাহজিয়াং ও বাউলদের মধ্যে! গোরক্ষ-বিজয়ে, বৈষ্ণব সহজিয়া পদে ও বাউল গানে তা আজও সুলভ।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পরে বিজয় চন্দ্র মজুমদার, ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মণীন্দ্র মোহন বসু, ডক্টর অবোধচন্দ্র বাগচি, ডক্টর বিনয়তোষ ভট্টাচার্য, ডক্টর সুকুমার সেন, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, সুখময় মুখোপাধ্যায় ও উড়িয়া-আসামী বিদ্বানেরা চর্যাগীতি সম্বন্ধে বিশেষ আলোচনা করেছেন। এঁদের মতে লঘু-গুরু অনৈক্য রয়েছে বহুবিষয়ে। ডক্টর সুনীতিকুমার ও তাঁর অনুসারীরা চর্যার ভাষার উপর গুরুত্ব আরোপ করে চর্যাগীতিকে দশ থেকে বারো শতকের রচনা বলে মত দিয়েছেন। ডক্টর শহীদুল্লাহ ও তাঁর মতের সমর্থকেরা তিব্বতী সূত্রে প্রাপ্ত চৌরাশী সিদ্ধার আবির্ভাবকালের উপর আস্থা রেখে মনে করেন সাত থেকে এগারো শতকের মধ্যেই চর্যাগীতি রচিত হয়েছিল।
রাহুল সাংকৃত্যায়নের পুরাতত্ত্ব নিবন্ধাবলী, বিনয়ভোষ ভট্টাচার্যের প্রবন্ধ, বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস Dev-ther snon-Po-এর জর্জ রোরিককৃত অনুবাদ The Blue Annals আর Bu Ston Rin-Po. Che-এর E. Obermiller-কৃত অনুবাদের আলোকে সুখময় মুখোপাধ্যায় চর্যালেখক সিদ্ধাচার্যদের আবির্ভাবকাল নির্ণয় করতে প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর অনুমান ৭৫০-১০৫০ সনের মধ্যে চর্যাগীতিগুলো রচিত হয়েছিল। আমরাও তাঁর অনুমান যৌক্তিক বলে মনে করি।
.
০৩.
বাঙালিরা চর্যাপদকে বাঙলা বলেই জানে। এবং বারো শতক অবধি চর্যাপদের রচনাকাল বলে মানে। এর পরে তেরো শতক থেকে চৌদ্দশ পঞ্চাশের মধ্যেকার কোনো বাঙলা রচনার নিশ্চিত নিদর্শন মেলে না; তাই বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসকারগণ মনে করেন, এ সময় বাঙলার কিছুই রচিত হয়নি এবং তারা তুর্কী বিজয়কেই এজন্যে দায়ী করেন। তাঁরা বলেন, বিজয়ের ফলে দেড়শ দুশ কিংবা আড়াইশ বছর ধরে বাঙলা দেশে হত্যা ও ধ্বংসের তাণ্ডব লীলা চলে। তাদের জীবন জীবিকা এবং ধর্ম-সংস্কৃতির উপর বেপরওয়া ও নির্মম হামলা চলে। উচ্চবিত্ত ও অভিজাতদের মধ্যে অনেকেই মরল, কিছু পালিয়ে বাঁচল, আর যারা এর মধ্যে মাটি কামড়ে রইল, তারা ত্রাসের মধ্যেই দিন- রজনী গুনে গুনে রইল। কাজেই নতুন করে কিছু তো হলই না, সাহিত্য-সংস্কৃতির যা ছিল, তাও লোপ পেল। এই হল তাঁদের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত। এসব উক্তির মূলে যে কোনো তথ্য নেই, তা বাঙলার রাজনৈতিক ইতিহাসের সাহায্যেই প্রমাণ করা চলে।
এক, উত্তরভারতে আগেই তুকী বিজয় ঘটেছিল, সেখানে শতাব্দব্যাপী রক্ত ও আগুনের বিভীষিকার কথা শোনা যায় না; বাঙলা তো দিল্লীর সুলতানের অভিপ্রায় ক্রমেই বিজিত হয়। লক্ষণসেন বাধা দেয়ার চেষ্টা না করেই পালিয়ে গেলেন, কাজেই বখতিয়ার বিনাযুদ্ধেই পেলেন উত্তরবাঙলার অধিকার। যেখানে রাজা কিংবা প্রজা রুখে দাঁড়ায়নি, সেখানে অহেতুক পীড়ন চালানোর কথা নয়। প্রায় একশ বছরেরও অধিককাল ধরে তুর্কীরা বাঙলা দেশের এক তৃতীয়াংশেরও কম অঞ্চলেই আধিপত্য করেছে। পশ্চিমবঙ্গ ছিল উড়িষ্যার গঙ্গাবংশীয় রাজাদের শাসনে আর পূর্ববঙ্গও ছিল সেন-সামন্তদের অধীনে। বাঙলা ভাষায় তখন সাহিত্যরচনার রেওয়াজ থাকলে হিন্দুশাসিত এসব অঞ্চলের সাহিত্য পাওয়া যেত।
দুই, ১২০৪ থেকে ১৫৩৮ সন অবধি ৩৫৫ বছরের মধ্যে বিখতিয়ার খলজী থেকে গিয়াসুদ্দীন মাহমুদ শাহ্ ওর্কে আবদুল বদর অবধি, History of Bengal vol II-এর অনুসরণে] হিন্দু পীড়ক ও অত্যাচারী শাসক হচ্ছেন বখতিয়ার খলজী (১২০৪-০৬), আলী মর্দান (১২১০-১৩), মালিক তাজুদ্দীন আরসালান খান (১২৫৯-৬৫), সোনার গাঁয়ের ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ (১৩৩৮ ৫০) এবং শামসুদ্দীন মুজাফফর ওর্ফে সিদিবদর (১৪৯১-৯৩)। এঁদের রাজত্বকালে একুনে বিশ বছর। অবশিষ্ট ৩১৫ বছরের ফসল কী!
তিন, সেনরাজারা নিম্নবর্ণের লোকদের লেখাপড়া করার সুযোগ দেননি।
চার, ব্রাহ্মণ্যবাদী ও উচ্চবর্ণের বৌদ্ধেরা সংস্কৃতেই লিখতেন, তাই তুর্কী বিজয়ের আগেকার কোনো বাঙলা রচনার উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায় না।
পাঁচ, শৌরসেনী ছাড়া অন্য কোনো অবহট্ঠেই লিখবার রেওয়াজ ছিল না। গৌড়ী অবহট্ঠে লিখবার রেওয়াজ চালু না হয়ে থাকলে বাঙলাতেও থাকার কথা নয়।
ছয়, এ সময় বাঙলা পদাদি রচিত হলে প্রাকৃত পৈঙ্গল ও সদুক্তি কর্ণামৃতে সংকলিত হত। অথবা এরূপ বাঙলা সংকলন থাকত।
সাত, মুসলমানেরা নিশ্চয়ই বেছে বেছে বাঙলা বইগুলোই নষ্ট করেনি, বাঙলায় বই থাকলে সেন-দরবারে রচিত কাব্য ও শাস্ত্রগ্রন্থের সঙ্গে এগুলোও থাকত। তুর্কী অধিকারেও নিশ্চয়ই সব বাড়ি ও সব মন্দির জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়া হয়নি। এছাড়া হিন্দুশাসিত অঞ্চল তো ছিলই।
আট, এ সময় বাঙলায় কিছু রচিত হলেও আগুন-পানি-উই-কীটে ধ্বংস করেছে অথবা জনপ্রিয়তা হারিয়ে তথা পাঠকের অভাবে অযত্নে লোপ পেয়েছে। তাই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, শেখ শুভোদয়া বা চর্যাগীতির একাধিক পুথি পাওয়া যায়নি।
