ডক্টর সুকুমার সেন বলেছেন, কথ্য সংস্কৃত হইতে কথ্য প্রাকৃত এবং তাহা হইতে বাঙলার উৎপত্তি। ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে কথ্য সংস্কৃতের যে রূপ চলিত ছিল তাহা ক্রমে প্রাচ্য-প্রাকৃতে রূপান্তরিত হয় খ্রীস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দের আগেই। এই প্রাচ্য-প্রাকৃত কালক্রমে বাঙলা-বিহার উড়িষ্যায় যে রূপ ধারণ করিয়াছিল, তাহাকেই বলা হয় প্রাচ্য অপভ্রংশ।
এই প্রাচ্য অপভ্রংশের অর্বাচীনরূপ অবহটঠ। অবহটঠ পরে (আনুমানিক ১০০০ খ্রীস্টাব্দের কাছাকাছি) তিনটি আঞ্চলিক আধুনিক আর্যভাষায় পরিণত হয়। পশ্চিমে বিহারী, উত্তর-পশ্চিমে মৈথিলী এবং পূর্বে বাঙলার উড়িয়া। বিহারী ভাষা হইতে আধুনিক ভোজপুরী (পশ্চিম-বিহারে) ও মগহী (দক্ষিণ-বিহারে) আসিয়াছে। বাঙলা হইতে আরো পরে অসমীয়া উৎপন্ন হইয়াছে।
সংস্কৃত এ নামেই প্রকাশ এটি কথ্য হতে পারে না। এ বিষয়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতই সুচিন্তিত ও সুযৌক্তিক বলে মনে করি। তাঁর মতে লেখ্যবৈদিক ভাষার পাশে কথ্য যে সমকালীন ভাষা ছিল, সেই প্রাচীন বুলি থেকে ক্রমবিবর্তনে আমাদের বাঙলা ভাষা গড়ে উঠেছে। পীঠিকায় এরূপ দাঁড়ায়২৪ :
১. প্রাচীন ভারতীয় আর্য (১২০০ –৮০০ খ্র. পূ.)।
২ প্রাচীন ভারতীয় কথ্য আর্য বা আদি প্রাকৃত (৮০০ –৫০০ খ্রী. পূ.)
৩. প্রাচীন প্রাচ্য প্রাকৃত (৫০০ খ্র. পূ. –২০০ খ্র.)
৪. গৌড়ী প্রাকৃত (অপর মতে মাগধী) (২০০ –৪৫০ খ্র.)
৫. গৌড়ী অপভ্রংশ (অপভ্রষ্ট) (৪৫০ –৬৫০ খ্রী.)
৬. প্রাচীন বাঙলা যুগ (৬৫০ –১২০০ খ্রী.)
ডক্টর সুনীতকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে :
১. ১৫০০/১২০০ –৫০০ খ্র. পূর্বাব্দ। ২. ৬০০ –২০০ খ্র. পূর্বাব্দ। ৩, ২০০ খ্রী. পূ. –২০০ খ্রীস্টাব্দ ৪. ২০০ –৬০০ ৫. ৬০০-১০০০ ৬. ১০০০-১২০০
কথ্যভাষা বিভিন্ন স্তরের, গোত্রের ও অঞ্চলের লোকের মুখে বিচিত্র বিকৃতি লাভ করে। আর কথ্য ভাষা যখন লিখিতও হয়, তখনো কথ্য ও লেখ্য কথায় তফাৎ কম থাকে না। লিখিত কথ্যের ব্যাকরণ চেতনাজাত বিশুদ্ধি ও শব্দচয়ন ও বিন্যাস প্রসূত লাবণ্য কথ্য বুলিতে দুর্লভ এবং কথ্যভাষা বা বুলিই দ্রুত পরিবর্তনশীল। লেখ্য ভাষা কৃত্রিম উপায়ে অবিকৃত রাখার চেষ্টা চলে। তাই লেখ্য ভাষার রূপান্তর অত্যন্ত মন্থর। সেজন্যে আমাদের ধারণায় প্রাচীন ভারতিক কথ্য বুলি থেকে কথ্য প্রাচীন প্রাচ্য প্রাকৃত; তার থেকে কথ্য মাগধী প্রাকৃত এর গৌড়ীয় বিকৃতি, অপভ্রষ্ট; তার থেকে অর্বাচীন অবহটঠ, তার থেকে প্রাচীন বাঙলা, উড়িয়া ও আসামী ভাষা উদ্ভূত হয়েছে।
আমাদের বাঙলা কিংবা সংস্কৃত অবিমিশ্র আর্যভাষা নয়। অনেক অনার্য শব্দ, ধ্বনি, রূপতত্ত্ব বা পদরূপ Morphology ও বাক্যরীতি বা পদক্রম syntax এ ভাষা গোড়া থেকেই আত্মস্থ করেছে। এগুলোর উত্তরাধিকার তো রয়েইছে, তাছাড়া প্রাকৃত, অপভ্রষ্ট ও নব্য ভারতীয় বুলিও বিভিন্ন স্তরে নানা অনার্য উপকরণ-উপাদান নিয়ে হয়েছে পুষ্ট। এমনি করে সংস্কৃত যুগে উত্তরভারতীয় অনার্য, বিদেশী পহলভী ও গ্রীক শব্দ সংস্কৃত শব্দ-সম্ভারকে ঋদ্ধ করেছে। বাঙলায় এসব ছাড়াও দেশী কোল, দ্রাবিড়, মোঙ্গল, মুণ্ডা, বিদেশী ফারসি এবং এর মাধ্যমে আরবি ও তুর্কী; আর পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজি এবং এর মাধ্যমে ইয়োরোপীয় ল্যাটিন আদি যাবতীয় ভাষার শব্দ, একালে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠার ফলে পৃথিবীর উল্লেখ্য সব ভাষারই দু-চারটি করে শব্দ বাঙলা ভাষায় প্রবেশ করেছে বা করছে। বাঙলা শব্দসম্পদকে পাঁচ শ্রেণীতে ভাগ করে দেখানো হয়: তৎসম. (সংস্কৃত সম), তদ্ভব (সংস্কৃত জাত), অর্ধ বা ভগ্ন তৎসম (বিকৃত সংস্কৃত সম), দেশী (কোল, মুণ্ডা, দ্রাবিড়, মোঙ্গল) ও বিদেশী। এদের মধ্যে ফারসি শব্দের সংখ্যা প্রায় চার হাজার, এবং বাঙলা শব্দকোষের শতকরা চার ভাগ, ইয়োরোপীয় তথা ইংরেজি শতকরা প্রায় দুই ভাগ (চিকিৎসা ও যন্ত্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রায় পঞ্চাশ ভাগ)।
.
০২. – আশ্চর্যচর্যাচয় বা চর্যাগীতি
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ-গ্রন্থাগার থেকে এক পুথি আবিষ্কার করেন। এটি একটি পদ বা গীতির সঙ্কলন গ্রন্থ। প্রকাশকাল ১৩২৩ সন। পুথিটি মুনি দত্ত নামের এক পণ্ডিতের সংস্কৃত টীকা সম্বলিত। এই সঠিক গ্রন্থের টীকাকার-প্রদত্ত নাম চর্যাচর্যবিনিশ্চয় (অবস্য চর্যাচর্য বিনিশ্চয় রূপে লিপীকৃত)। এজন্যে পদসগ্রহের শুদ্ধ নাম আশ্চর্যচর্যাচয় ছিল বলে অনুমান করা হয়। আমাদের আলোচনার ভাষায় চর্যাগীতি বা চর্যাকোষ। সঙ্কলন গ্রন্থে মোট একান্নটি গান ছিল। মুনিদত্ত একটা বাদ দিয়েছেন। প্রাপ্ত পুথিতে তিনটি পদ খোয়া গেছে; অপর একটির অর্ধেক নেই। কাজেই সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ ও তেইশ জন পদকারের নাম পাচ্ছি। তবে ভণিতায় যার নাম রয়েছে তিনিই রচয়িতা এমন অনুমান করা চলে না। কেউ কেউ গুরুর নামে ভণিতা দিয়েছেন। তা বুঝি নামের সঙ্গে গৌরবসূচক পা-এর যোগে। কতগুলি স্পষ্টতই ছদ্মনাম। যেমন কুকুরী, বীনা, তন্ত্রী, ডোম্বী, তাড়ক, কঙ্কন, শববৃ°। এঁদের কেউ কেউ প্রখ্যাত চোরাশী সিদ্ধার অন্তর্ভুক্ত (চোরাশী অঙুলি পরিমিত দেহে সাধনায় সিদ্ধ যে, সে-ই চোরাশী সিদ্ধা]।
