.
০৪.
এবার বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের কথায় আসা যাক। চর্যাগীতি যে বাঙলা এ বিশ্বাস থেকেই বাঙলা সাহিত্যের তামস-যুগ তত্ত্বের উদ্ভব। অথচ চর্যাগীতি যে প্রাচীন বাঙলা তা আজো সর্বজন-স্বীকৃত সত্য নয়। হিন্দি, মৈথিল, উড়িয়া, অসমীয়াও এর দাবীদার। ডক্টর শহীদুল্লাহ, ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ডক্টর সুকামার সেন, অধ্যাপক প্রিয়রঞ্জন সেন প্রমুখ বাঙালি বিদ্বানেরাও ওদের দাবীর আংশিক স্বীকৃতি দিয়েছেন। সব সিদ্ধার বাড়ি বাঙলায় নয়, বাঙলা তখনো শালীন ও লেখ্য সাহিত্যের ভাষা নয়–আঞ্চলিক বুলি মাত্র। কাজেই উড়িষ্যা, মিথিলা কিংবা আসামের লোকের বাঙলা পদ রচনা করার তখনো সাধ-সাধ্য থাকার কথা নয়। অতএব মানতে হয় যে, চর্যাপদ অর্বাচীন প্রাচ্য (গৌড়ী?) অবহট্ঠে রচিত। সে সময় আঞ্চলিক বিকৃতিজাত সামান্য প্রভেদ থাকলেও উড়িয়া-বিহারী-বাঙলা-আসামী অবহট্ঠ মোটামুটি অভিন্ন ছিল। নাথ-সহজিয়া পন্থের অন্যতম প্রসারক্ষেত্র চন্দ্ররাজদের রাজ্য পূর্ববঙ্গ। কাজেই মানিকচাঁদ-ময়নামতী-গোপীচাঁদের দেশে (আধুনিক কুমিল্লাদি জেলা) বহুল চর্চার ফলে (নেপালেও চর্যাগীতি সম্ভবত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশাদি পূর্ববাঙলার লোকেরাই নিয়ে যান) চর্যাগীতিতে বঙ্গ-গৌড়ীয় বিকৃতি এসেছে। এতেই জোরালো হয়েছে বাঙলার দাবী।
মুনিদত্তের টীকাযুক্ত চর্যাগীতি নেপালে পাওয়া গেছে নেওয়ারী হরফে লিখিত পুথিতেই। বিদেশে বিভাষীর পক্ষে ভিন্ন ভাষার অলিখিত শাস্ত্রের চর্চা সম্ভব নয়। কাজেই চর্যাগীতি নেপালে স্বাভাবিকভাবেই লিখিত ও টীকা-সম্বলিত হয়েছে। কিন্তু আসাম-বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যাতেও তার লেখ্যরূপ ছিল বলে মনে করার সঙ্গত কারণ নেই। নাথ-সহজিয়া পন্থ যোগতান্ত্রিক বজ্রযান বৌদ্ধদের বিকৃত উপশাখা। কাজেই এই উপসম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা বেশি ছিল না এবং তারা স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপন করেনি। অতএব সেকালের বাঙালি–বিহারী-আসামী-উড়িয়া সমাজ-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বের দাবী বা যোগ্যতা এদের ছিল না। সমাজের অন্যান্য সম্প্রদায়ের বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা পাল আমলের মধ্যকাল থেকেই সংস্কৃত চর্চা করত। শাস্ত্রচর্চার ও শাসন পরিচালনের বাহন ছিল সংস্কৃত। তাই প্রাচ্য অবহটঠেরও লেখ্যরূপ মেলে না। গৌড়ী-মাগধী অবহট্ঠেই যদি লেখার রেওয়াজ না থাকে, তাহলে তখনো নিতান্ত অবজ্ঞেয় আঞ্চলিক মুখের বুলি আসামী-বাঙলা-উড়িয়া-বিহারীতেই বা লেখ্য রচনার সম্ভাব্যতা কোথায়? কাজেই এদেশে চর্যাগীতির কোনো লেখ্যরূপ ছিল না এবং এগুলো মুখে মুখে রচিত ও গীত লোকসাহিত্য বা লোকায়ত শাস্ত্ররূপেই চালু ছিল বলে আমাদের ধারণা।
অতএব আমাদের অনুমান এই যে, চর্যাগীতি লিখিত রচনাও নয়, বাঙলাও নয়–অর্বাচীন গৌড়ী-মাগধী অবহট্ঠ এবং মৌখিক রচনা। কেবল ডক্টর শহীদুল্লাহ আর ডক্টর সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ই নন, ডক্টর সুকুমার সেনও বলেছেন, অসমীয়া ভাষীদের দাবী অযৌক্তিক নয়, কেননা ষোড়শ শতাব্দী অবধি বাঙলা ও অসমীয়া দুই ভাষায় বিশেষ তফাৎ ছিল না এবং উড়িয়া আসামীদের সঙ্গে বাঙলার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আদিতে এই তিনটি একই ভাষা ছিল। দ্বাদশ ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর হইতে মূল ধারা হইতে ওড়িয়া বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। কাজেই ভাষার এক সাধারণ স্তর থেকে বাঙলা, ওড়িয়া, মৈথিল ও অসমীয়ার উদ্ভব। ডক্টর সুকুমার সেন এর নাম দিয়েছেন প্রত্ন-বাঙলা-অসমীয়া-ওড়িয়া। এই সাধারণ স্তর আমাদের ধারণায় অর্বাচীন অবহট্ঠ বা আধুনিক ভাষাগুলোর লক্ষণ ফুটনকালীন অবহট্ঠ। অতএব চর্যাগীতি কেবল বাঙলার নয়, উক্ত অপর ভাষাগুলোরও সাধারণ ঐতিহ্য এবং এর ভাষা আলোচ্য সবকয়টি ভাষার জননী।
তবে অধিকাংশ চর্যাগীতি বাঙলা দেশের আবহে এবং বাঙালি র রচিত তাতে সন্দেহ নেই। বাঙলাদেশ, বঙ্গাল জাতি, পঁউয়া (পদ্ম) খাল, বঙ্গ প্রভৃতির উল্লেখ, সাধারণের প্রাত্যহিক জীবন থেকে নেয়া রূপপ্রতীক-তুলা-ধূনা, নৌকা চালান, মদ চোলাই করা, নদীঘাট থেকে জলভরা, সাঁকো তৈরি করা, দাবা খেলা, শবরবৃত্তি, গোয়ালবৃত্তি প্রভৃতির রূপক সেকালের নিম্ন ও নিঃস্ব শ্রেণীর সমাজ-চিত্র দান করছে। এমনটি বৈষ্ণব পদাবলীতেও মেলে না, সেখানে রাধা-কৃষ্ণ সমাজ ও বাস্তব জীবনকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছেন।
ধর্মমত প্রচারের কিংবা রাজ্যশাসনের বাহন না হলে আগের যুগে কোনো বুলিই লেখ্য সাহিত্যের ভাষায় উন্নীত হত না। আদি যুগে সংস্কৃতই ছিল পাক-ভারতের ধর্মের, শিক্ষার, দরবারের, সাহিত্যের, সংস্কৃতির ও বিভিন্ন অঞ্চলে লোকের ভাব-বিনিময়ের বাহন। তাই কোনো অঞ্চলের মধ্যে আর্য-ভারতিক বুলিই লেখ্য-ভাষার মর্যাদা কিংবা শালীন সাহিত্যের বাহন হবার সুযোগ পায়নি। বৌদ্ধ ও জৈন মত প্রচারের বাহনরূপেই প্রথম দুটো বুলি–পালি ও প্রাকৃত সাহিত্যিক ভাষার স্তরে উন্নীত হয়। তারপর অনেক কাল রাষ্ট্র শাসন কিংবা ধর্মপ্রচারের কাজে লাগেনি বলে আর কোনো বুলিই লেখ্য-ভাষার মর্যাদা পায়নি। পরে সাহিত্যের প্রয়োজনে নাটকে শৌরসেনী, মারাঠী ও মাগধী প্রাকৃত ব্যবহৃত হতে থাকে। আরো পরে রাজপুত রাজাদের প্রতিপোষকতায় শৌরসেনী অপভ্রষ্ট বা অবহট্ঠ সাহিত্যের ভাষার রূপ পায়।
