বাঙালি যে গোত্র-সঙ্কর জাতি তা সবই স্বীকার করেন। সঙ্করজাতির ভাষাও মিশ্রভাষা হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা পুরোপুরি হয়নি। বাঙলা ভাষায় এদেশের সব গোত্রীয় অধিবাসীর বুলির উপাদান থাকলেও এর মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে আর্যভাষার এক বুলি ভিত্তি করে।
নৃতাত্ত্বিক পরিভাষা ব্যবহার না করে সাধারণভাবে বলা যায়, এদেশের অধিবাসী হচ্ছে কোল, মুণ্ডা, দ্রাবিড় ও মোঙ্গল গোত্রীয় লোক। কাজেই অনুমান করতে হবে যে আধুনিক বাঙলা নামের আর্যবুলির আগে এদেশে বিভিন্ন গোত্রীয় বুলিগুলো চালু ছিল; এবং গোত্রগুলোর পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের ও লেনদেনের প্রয়োজনে হয়তো কোনো প্রবল কিংবা সংখ্যাগুরু গোত্রের ভাষা Lingua Franca-রূপে ব্যবহৃত হত। কিন্তু তার কোনো আভাস পাইনে। এতে বোঝা যায় তাদের যে কেবল লিখন-পদ্ধতি জানা ছিল না তা নয়, তাদের সাংস্কৃতিক মানও নিতান্ত আদিম পর্যায়ে ছিল। মুণ্ডা, কুরুক, বোরো, সাঁওতাল, নাগা, খাসী, কুকী প্রভৃতি গোত্রের আজকের দিনের ভাষায় ও আচারে-সংস্কারে তার পরোক্ষ আভাস মেলে। কবে যে এদেশে আর্য-বসতি ও আর্যপ্রভাব শুরু হয়, ইতিহাস তা সঠিক বলতে পারে না। তবে খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে বিশেষ করে জৈন-বৌদ্ধ মত প্রচারের জন্যেই বাঙলা দেশে আর্য অনুপ্রবেশ ঘটে। সম্প্রতি ডক্টর সুকুমার সেন বলেছেন এদেশে আর্যভাষা অন্ততপক্ষে খ্রীস্টপূর্ব অষ্টম-সপ্তম শতাব্দী হতে প্রচলিত আছে। তার এ মতের সমর্থনে তিনি ইরান হইতে ভারতবর্ষে আর্যভাষা ও সংস্কৃতি দুই বা ততোধিক ধারায় আসিয়াছিল এবং অর্বাচীন ধারার কাছে ব্রাত্য নামে অভিহিত প্রাচীন ধারার ব্রাত্যরাই বাঙলা দেশে আর্য-সংস্কৃতির প্রথম বাহক ছিল বলিয়া মনে করেন। অনার্য ভাষা ও সংস্কৃতির নিদর্শনের বিরলতাই তাঁকে সম্ভবত অনুমানে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের ধারণায়, জৈন-বৌদ্ধমত প্রচারসূত্রেই বাঙলা দেশে উল্লেখ্য আৰ্যবসতি ঘটে এবং এ সময় থেকেই জৈন-বৌদ্ধমতের মাধ্যমে এদেশবাসী আর্যভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে। এই দুই মতবাদের উদ্ভব-ক্ষেত্র ছিল বিহার। আধুনিক বিহার গড়ে উঠেছে সেকালের অঙ্গ, বিদেহ ও মগধ রাজ্য নিয়ে। দেব-দ্বিজ ও বেদদ্বেষী জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মমত হচ্ছে আর্য ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অনার্য অভ্যুত্থান। গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং অনার্য বংশ-সস্তৃত; তা তার জন্মস্থান, বংশের নাম ও চেহারা থেকে বোঝা যায়। অনেক জৈন তীর্থঙ্করের জন্মস্থান, সাধনা আর প্রচারক্ষেত্রও বাঙলা দেশ তথা পশ্চিমবঙ্গ। অতএব কারুর অস্বীকৃতির আশঙ্কা না করেই বলা চলে, আজীবক ও জৈন-বৌদ্ধমত সম্বল করেই উত্তর-পূর্ব ভারতের আর্যভাষা ও সংস্কৃতি বাঙলা দেশে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে আর অশোকের সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েই তা স্থায়ী প্রতিষ্ঠা পায়। জৈনমত সম্ভবত উত্তর-পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যায়নি, কিন্তু বৌদ্ধমত বাঙলার সর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পাল আমলে বৌদ্ধমত রাজধর্মের মর্যাদা ও অধিকার পেয়ে বিচিত্র বিকাশের সুযোগ লাভ করে। এ কারণে পাল রাজত্ব বাঙলার ও বাঙালি সংস্কৃতির সোনার যুগ।
তাহলে আমরা অনুমান করতে পারি খ্রীস্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে বাঙলা দেশে আর্যভাষা চালু হয়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ ভাষার নাম রেখেছেন প্রাচীন প্রাচ্য প্রাকৃত। তাঁর অনুমান গৌতম ও মহাবীর এ ভাষায় কথা বলতেন। অতএব জৈন ও বৌদ্ধ শাস্ত্রে এ ভাষারই লিখিত রূপ পাই। আমরা জানি কোনো বুলিরই লেখ্য ও কথ্যরূপ এক হতে পারে না। লেখ্যভাষা গভীর ও বিচিত্রভাববাহী হয়ে শালীন ও মার্জিত রূপ ধারণ করে। এ যদি সত্য হয়, তাহলে এ সময়কার কথ্য প্রাচীন প্রাচ্য প্রাকৃত কিছুটা বিকৃত ছিলই। ডক্টর শহীদুল্লাহ্ সম্প্রতি অর্ধমাগধী ও মাগধী প্রাকৃতের সমস্তরের গৌড়ী প্রাকৃতকেই বিহারী, উড়িয়া ও বঙ্গকামরূপী বুলির জননী বলে সিদ্ধান্ত করেছেন। তার মতে :

আর জর্জ গ্রিয়ার্সন ও ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ভাষাতাত্ত্বিকগণের মতে মাগধী প্রাকৃত থেকেই বাঙলা ভাষার উদ্ভব। ডক্টর শহীদুল্লাহর গৌড়ী প্রাকৃতে ও অন্যান্য মাগধী প্রাকৃতে কেবল নামেই তফাৎ, কেননা ডক্টর শহীদুল্লাহ্ বিহারকে গৌড়ী- প্রাকৃতের আওতাভুক্ত করেছেন। অথচ এই বিহারের এক অংশই ছিল মগধ। বিশেষ করে তার গৌড়ী-প্রাকৃত এবং গিয়ার্সন ও সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের মাগধী প্রাকৃত থেকে উদ্ভূত ভাষাগুলো অভিন্ন। তাঁর এই মত প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে তিনি মাগধী প্রাকৃতকে দেশছাড়া করেছেন, বেদিয়া-জিপসির ভাষাতেই খুঁজেছেন এই ভাষার জীবন্ত বিবর্তন। আর্যভাষা বাঙলা দেশে যখনই আসুক, এসেছে বিহার হয়েই। মৌর্য ও গুপ্তবংশের শাসন-কেন্দ্র আর্যাবর্ত ঘেঁষা বিহারের আর্যসংস্কৃতি পুষ্ট ও আভিজাত্য-গী অধিবাসীরা গৌড়ীয় আসুরিক ভাষার প্রভাবে পড়েছিল, এই কথা ভাবতে অদ্ভুত ঠেকে। এমনকি পাল আমলে বাঙলার সংস্কৃতি-কেন্দ্র ছিল বাঙলার বাইরে–বিক্রমশীলা, উড্ডিয়ানা ও নালন্দায়। কাজেই প্রাচ্য প্রাকৃতের আদি মঞ্জিল মগধের নামে একে মাগধী প্রাকৃত বলাই সঙ্গত। ভাষা হচ্ছে বহতা নদীর মতো; জনে জনে, যুগে যুগে ও অঞ্চলে অঞ্চলে তার বিচিত্র বিকৃতি ঘটেছে। সেই বিকৃতির উপর আত্যন্তিক গুরুত্ব আরোপ করেই° ডক্টর শহীদুল্লাহ গৌড়ী-প্রাকৃত কল্পনা করেছেন এবং দণ্ডী প্রমুখ পণ্ডিতের উক্তিতে সমর্থন খুঁজেছেন। আজকের বাঙলা দেশের আঞ্চলিক বুলিগুলোর ধ্বনি ও রূপে এত তফাৎ যে, এগুলো যে একই জননীর সন্তান তা প্রমাণ করা দুঃসাধ্য; তাই বলে কি আমরা প্রত্যেক অঞ্চলের জন্যে পৃথক প্রাকৃত, অপভ্রষ্ট ও অবহট্ঠ কল্পনা করব?