যা হোক, কয়েকজন লেখক এর মধ্য থেকেই ইসলামের শিক্ষায় ও মুসলিম ঐতিহ্যে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে নজরুলের সমসাময়িক গোলাম মোস্তফাই প্রথম। কিন্তু তার রচনায় গণচিত্তে প্রেরণার তরঙ্গ তুলবার মতো তীব্রতা ছিল না। তিনি নিজে উদ্বোধিত হয়েছিলেন সন্দেহ নেই, কিন্তু পাঠকসাধারণকে অনুপ্রাণিত করবার সামর্থ্য ছিল না তাঁর কলমের। শাহাদৎ হোসেনের লেখার আবেদনও পাঠকচিত্ত স্পর্শ করেনি। তারপর অনেক পরে বাঙলা সাহিত্যক্ষেত্রে এলেন বেনজীর আহমদ। তিনি বিপ্লবী কবি বলে একসময় পাঠকসাধারণের অকুণ্ঠ অভিনন্দন পেয়েছেন। তার ইসলাম ও মুসলমান বিষয়ক কবিতাগুলো কিশোর ও তরুণ-হৃদয়ে সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়েছিল। ভাবে ও ভাষায় তিনি নজরুলেরই মানসসন্তান। কিন্তু নজরুলের মতো অফুরন্ত প্রাণময়তা ও উচ্ছ্বাস-প্রাচুর্য তাঁর ছিল না। ফলত তিনি যেমনি অতর্কিতে সাহিত্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তেমনি অকস্মাৎ যেন আত্মগোপন করেছেন। ইসলাম ও মুসলিম ঐতিহ্যানুসারী আর দুজন কবি হচ্ছেন ফররুখ আহমদ ও সৈয়দ আলী আহসান। ফররুখ আহমদের মধ্যে ইসলাম ও মুসলিম ঐতিহ্যমোহ তীব্র আবেগ জাগিয়েছিল। অনুরাগের সঙ্গে অবচেতন ভাবালুতা তাঁকে আবেগমুখর এবং সংবেদনশীল সৃষ্টিপ্রবণ করেছে। ইসলামের উন্মেষযুগের মুসলমানদের প্রাণময়তা ও জীবনবাদ মুগ্ধ করেছে তাকে। তাই তিনি হেরার রাজ তোরণের ও নারঙ্গীবনের স্বপ্ন দেখেন এবং সে-স্বপ্ন আজকের দিনে বাস্তবে রূপায়িত করবার অভিলাষও যেন পোষণ করেন। এইজন্যে তাঁকে Revivalist বলা যেতে পারে। কোনো জিনিসের Form ও Spirit এক বস্তু নয় এবং তাদের অনন্যপেক্ষ সত্তা উপলব্ধি সম্ভব। ইসলামকে যে-অর্থে আমরা চিরকালের সর্বদেশের চিরমানবের ধর্ম বলি, তা হচ্ছে ইসলামের spirit বা শিক্ষার মূলসূত্রগুলোর চিরমানবের সমাজে প্রযোজ্য হবার যোগ্যতা। অর্থাৎ আমাদের প্রয়োগবিধি ও জীবনপ্রণালী বদলাবে কিন্তু আদর্শ, উদ্দেশ্য ও নীতি অপরিবর্তিত থাকবে। কালে কালে প্রয়োগ-ধারা পালটাবে, কিন্তু নীতি ও লক্ষ্য থাকবে স্থির-অচঞ্চল। কাজেই Revival-এর প্রয়াস শুধু অবান্তর নয়, অনভিপ্রেতও বটে। যারা শুধু আত্মা (spirit) নয়, বহিঃরূপেরও (Form) পুনরাবর্তনের পক্ষপাতী, আজকের দুনিয়ায় তাঁদের অভিলাষ হয়তো পূর্ণ হবার নয়। ফররুখ ইসলাম-পূর্ব ও ইসলামোত্তর আরবি ঐতিহ্যের গৌরব-গর্বী। ফররুখের এই আরব ঐতিহ্য-প্রেরণাজাত সাতসাগরের মাঝি, হাতেম ও নৌফেল, হাতেমতায়ী, সিরাজুমমুনিরা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যে-ঐতিহ্যানুগ অবচেতন ভাবালুতা ফররুখের কাব্যপ্রেরণার উৎস, সৈয়দ আলী আহসানের মধ্যে সে-ভাবালুতা ছিল না, অর্থাৎ তিনি ইসলাম বা মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতি মোহগ্রস্ত নন, তাঁর কাব্যসাধনা ছিল আদর্শানুশীলনের সচেতন প্রয়াস মাত্র। এ কারণে তাঁর কবিতা আবেগমুখর নয় বরং বিদগ্ধমনের প্রয়াসচিহ্নিত। এজন্যেই বোধ হয় তাঁর এ ধারার কাব্যসাধনা চাহার দরবেশের সাথী হয়ে গহন বনে পথ হারিয়ে ফেলেছে।
এদেরই প্রায় সমসময়ে আমরা তালিম হোসেনকে পেলাম। তাঁর প্রেরণার উৎস ইসলাম বা মুসলিম ঐতিহ্যবোধ নয়–বরং মুসলিম জাতীয়তাবোধ। তাঁর আযাদীর স্বপ্ন ও উল্লাসজাত পাকিস্তানী কবিতা ও গান বিভাগপূর্ব বাঙলাদেশে পাঠকসাধারণের অজস্র প্রশংসা অর্জন করেছে।
নজরুলোত্তর এ ধারার কবিগণ ১৯৩০ সালের মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্ব ও ১৯৪০ সালের পাকিস্তান পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে কাব্যসাধনা আরম্ভ করেন। এইক্ষেত্রে ইকবালের কাব্যসমূহ তাদের প্রেরণার পরিপোষক ছিল। ধর্মবোধের পরিসরে বিশ্বমুসলিম জাতীয়তা ও সমাজবোধ অর্জনই ছিল ইকবাল-কাব্যের মূল সুর। তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছেন–আচারিক ও আনুষ্ঠানিক ধর্ম সবসময় সমাজকেন্দ্রিক; এবং পারমার্থিক বা আধ্যাত্মিক সাধনা জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে প্রজ্ঞাদৃষ্টি লাভের সহায়ক। আমরাও স্বীকার করি যে, ধর্মবোধ সামাজিক প্রয়োজনে অপরিহার্য। ইকবালের শেকওয়া, আরারে খুদী ও রমুজে বেখুদী প্রভৃতির লক্ষ্যও এই। ইকবালের কর্ম ও কাব্য-প্রেরণায় হালী ও সৈয়দ আহমদের প্রভাব প্রবল ও প্রকট। বস্তুত তিনি তাদের স্বপ্নকেই সার্থক করে তুলতে চেয়েছেন। ইকবাল তাদের যোগ্যতম মানস-সন্তান।
মধ্যযুগে ও নজরুলপূর্ব আধুনিক যুগে বাঙলা সাহিত্যের ইসলামমুখী যে-ধারার কথা উল্লেখ করেছি, তা মুখ্যত ধর্মানুরাগজাত। নজরুলের সম-সময়ে তা ছিল প্রধানত সমাজবোধানুষঙ্গিক এবং পরবর্তীকালে অর্থাৎ বেনজীর আহমদের কাল থেকে তা হল নিছক জাতীয়তা, সমাজবোধ ও আযাদী প্রেরণাপ্রসূত। আযাদী-উত্তর যুগে এ আবার শুধু রাষ্ট্র ও সমাজাদর্শের বাহনই যে হয়েছে, তা আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং এ ধারার কাব্য-সাহিত্যকে যদিও আমরা ইসলামমুখী ধারা নামে অভিহিত করেছি, তবু বিভিন্ন যুগে এ সাহিত্যের প্রেরণা, ব্যঞ্জনা, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ভিন্ন। ভিন্ন ছিল। অতএব আপাতদৃষ্টিতে বিষয়সাদৃশ্যে এ সাহিত্য একক ধারার অন্তর্গত বলে মনে হলেও আসলে বিভিন্ন যুগের এ সাহিত্যের মধ্যে কোনো ভাবগত মৌলিক ঐক্য নেই।
পাকিস্তান অর্জনের পর থেকে জনসাধারণের ইসলাম ও মুসলিম তমদুন-প্রীতি সর্বত্র আলোড়ন জাগিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ইসলামমুখী কর্মপ্রেরণা ও সাহিত্য সাধনার অভাবে ঘোচেনি। আজকের যুগে জীবন-সমস্যা উৎকট আকারে দেখা দিয়েছে, তাতে নিতান্ত বেঁচে থাকার সাধনা ছাড়া অন্য সাধনা ঠাই পাবার কথা নয়। জাতি ও শ্রেণীসংগ্রামে আজকের পৃথিবী জর্জরিত ও মুমূর্ষ। যে-দেবতা বর দিতে পারে না, তার পূজা হয় না। আজকের অধার্মিকতা আস্থাহীনতার জন্য তত নয়, যতটা ক্ষোভ, নৈরাশ্য ও জেদজাত! এই সব কারণেই ইসলামমুখী সাহিত্য-সাধক আজ দেশে নিতান্ত বিরল।
বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের খসড়াচিত্র
০১.
