এইরূপে অধিকাংশের গোঁড়ামির ফলে স্বল্প-সংখ্যকের উদারতার ক্ষীণধারা কখনও সুপ্ত কখনও বা লুপ্তই হয়ে গিয়েছে। তবু যাঁরা আশাবাদী, তারা কোনোদিন হাল ছাড়েননি। তাই মধ্যযুগের ধর্মসাধকগণ থেকে বাঙলাদেশের বাউল-মুর্শিদপন্থীরা পর্যন্ত এবং সে-যুগের রাষ্ট্রসাধক আকবর থেকে এ যুগের গান্ধী তক্ সকলেই আন্তরিকভাবে সমঝোতা-সমন্বয় সাধনা করে গেছেন।
চণ্ডীদাস বলেছেন : সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। আর একজন লোক-সঙ্গীতকার বলেছেন :
নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ।
জগৎ ভ্রমিয়া দেখিলাম একই মায়ের পুত।
কিন্তু জনসমাজে এসব বাণী আশানুরূপ সমাদর পায়নি। নাড়া দেয়নি মস্তিস্কে, সাড়া জাগায়নি হৃদয়ে, আলোড়ন আনেনি সমাজে। তাই হিন্দুর ধর্মশাস্ত্রের কাহিনী মাতৃভাষায় অনুবাদ করতে গিয়ে উদারপন্থীরা প্রবল বাধা পেয়েছিলেন–অস্টাদশ পুরাণানি রামর্শ চরিতানি চ ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।] তেমনি মুসলমান লেখকরাও স্বজাতি থেকে কম ধমক খাননি। ষোলো শতকের কবি সৈয়দ সুলতান বলেন–না বুঝে বাঙ্গালী সবে আরবি বচন তাই আপনা দীনের বোল এক না বুঝিলা। এবং
যে সবে (মৌলবীরা) আপনা বোল না পারে বুঝিতে।
পঞ্চালী রচিলু করি আছএ দূষিতে ॥
মোনাফেক বলে মোরে কিতাবেতু কাড়ি।
কিতাবের কতা দিলুম হিন্দুয়ানি করি ॥ ….
তেকারণে কত কত পশুবুদ্ধি নরে।
কিতাব ভাঙ্গিলু করি দোষএ আমারে।
কিন্তু কোনো বাধাই টিকল না, কারণ কবির আত্মবিশ্বাস ছিল দৃঢ় এং সত্যোপলব্ধি সম্বন্ধে ছিলেন স্বয়ং নিঃসন্দেহ-মমাহোর মনের ভাব জানে করতারে। এবং এজন্যেই তিনি পরিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে বলেছেন–নবীবংশ ও সবে মেরাজ —
এ দুই পুস্তক যেই পালিবারে পারে।
আল্লার গৌরব হৈব তাহার উপরে ॥
এমনি বিশ্বাস নিয়ে মালাধর বসুও বলেছেন :
পুরাণ পড়িতে নাই শূদ্রের অধিকার।
(তাই) পাঁচালী পড়িয়া তর এ ভব সংসার ॥
এইরূপে বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে মধ্যযুগে জায়নুদ্দিন, সৈয়দ সুলতান মোহাম্মদ খান, শেখচান্দ, সাবিরিদ খান, আবদুল হাকিম প্রভৃতি বহু মুসলমান কবি একদিকে যেমন রসুল ও ইসলাম বিষয়ক নানা গ্রন্থ রচনা করেছেন, তেমনি আবার তারা গোরক্ষবিজয়, জ্ঞানপ্রদীপ, সুরতনামা, যোগকালন্দর, হরগৌরী-সংবাদ, নুরজামাল, জ্ঞানসাগর প্রভৃতি তত্ত্ব-সাহিত্য এবং রাধা কৃষ্ণবিষয়ক পদাবলী রচনা করে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের মৌলিক ঐক্য সন্ধানে প্রয়াস পেয়েছেন। সুতরাং সেইযুগে একদিকে উদারপন্থীদের সমন্বয় ও মিলন মোহ এবং অপরদিকে গোড়াদের বঙ্গভাষাপ্রীতির অভাব বাংলা সাহিত্যের ইসলামমুখিনতার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ইংরেজ আমলে পাশ্চাত্যাদর্শে আধুনিক সাহিত্যধারা শুরু হল। এই যুগেও আমরা মীর মশাররফ হোসেন প্রভৃতির মধ্যে স্বধর্ম ও স্বজাতিনিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় জাতীয়তা আর সংস্কারের প্রভাবও দেখতে পাই। বিষাদ-সিন্ধুতে স্বর্গমর্তের হিন্দুয়ানি কল্পনা প্রশ্রয় পেয়েছে। তারই সমসাময়িক কবি শামসুদ্দিন সিদ্দিকীর ভাবলাভ কাব্যের পারমার্থিক সংগীতের কালার সাক্ষাৎ মিলে। আশ্চর্য এই যে, এঁরা বঙ্কিমচন্দ্রের সমসময়ের হলেও বঙ্কিমের তথাকথিত মুসলমান বিদ্বেষের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ হিন্দুর অকল্যাণ কামনা করেননি।
আবার সৈয়দ সুলতান সে-যুগে যে-বাধা পেয়েছিলেন, এ-যুগে কোরআনের বঙ্গানুবাদেও সে বাধা বেশ কিছুকাল প্রবল ছিল। তাই আধুনিক যুগে কোরআনের প্রথম অনুবাদ ও রসুলের জীবনী রচিত হয় হিন্দুর দ্বারা। কৃষ্ণকে মুসলমান-লেখক অন্যতম পয়গম্বর বলে স্বীকৃতি দিতেও কুণ্ঠিত হননি। এভাবে নজরুল ইসলামের কাব্যে আমরা শেষবারের মতো হিন্দু-মুসলিমের মিলন-প্রয়াস লক্ষ্য করি। তবু এ-যুগের বিকাশোন্মুখ ধর্ম ও জাতীয়তাবোধের ফলস্বরূপ আমরা মোজাম্মেল হকের জাতীয়ফোয়ারা, কায়কোবাদের অমিয়ধারা এবং ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মুসলিমঐতিহ্যপ্রধান স্পেনবিজয়, অনল প্রবাহ প্রভৃতি কাব্য-কবিতা পেয়েছি। কিন্তু তাদের এ প্রয়াস খুব সচেতন ছিল না, মূলত হালীর মুসদ্দস ও সৈয়দ আহমদের আলীগড় আন্দোলনের পরোক্ষ প্রভাবেই তাদের সাধনা শুরু হয়। কিন্তু মুসলমানদের আচরণে না হোক, আস্থার দিক থেকে এতটুকু স্বধর্মচ্যুতি ঘটেনি কোনোদিন। এই সময়েই ইমাম গাজ্জালীর কিমিয়া-ই সাদৎএর অনুবাদ সৌভাগ্য স্পর্শমণিও প্রচারিত হল। শুধু তাই নয়, তিতুমিরের আযাদীস্বপ্নের এবং যুক্তিবাদীদের ওহাবী আন্দোলনের প্রভাবও তাঁদের উপর কিছু কম ছিল না।
এইরূপ দুই বিরুদ্ধ আদর্শের ঠেলাঠেলিতে অবশ্য ইসলামও টিকে ছিল, মুসলমানও বেঁচে ছিল, কিন্তু ইসলামমুখী মনোভাবের তীব্রতা কোথাও ফুটে ওঠেনি। তাই আমাদের সাহিত্যে সাম্প্রত পূর্বযুগে নিরবচ্ছিন্ন ইসলামমুখিতার নিদর্শন নেই।
অত্যাধুনিক যুগে নজরুল ইসলাম ইসলামবিষয়ক অনেকগুলো গান এবং কয়েকটি কবিতা লিখেছেন। এগুলো থেকে অনেক মুসলমান পাঠক ও কয়েকজন লেখক ইসলামী প্রেরণা পেয়েছেন। তবে অপ্রিয় হলেও এখানে বলা আবশ্যক যে, নজরুল ইসলাম প্রথমত বাঙালি তথা ভারতীয় জাতীয়তায় (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) বিশ্বাসী ছিলেন। দ্বিতীয়ত তার মধ্যে বিশ্বমুসলিম জাতীয়তাবোধ ছিল না। তার কারণ, তাঁর কাব্য-প্রেরণার উৎস ও লক্ষ্য ছিল মানবনিষ্ঠা। তার ধর্মবোধও ছিল মানবনিষ্ঠ। তিনি ছিলেন একান্তভাবে স্বদেশপ্রেমিক, স্বজাতি (ভারতবাসী)-নিষ্ঠ ও নিপীড়িত মানবতার দরদী কবি। এই স্বদেশ ও মানবনিষ্ঠ কাব্যসাধনার আনুষঙ্গিক ফলস্বরূপ আমরা তাঁর কাছে ইসলামী কবিতা ও গানগুলি পেয়েছি। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা ও প্রেরণা ইসলাম-প্রীতিপ্রসূত নয় বরং তীব্র আযাদী-বাঞ্ছা ও মানবতাবোধের পরিচয় ও পরিপূরক। সুতরাং কবির জিঞ্জির মুসলিম কবিতার সমষ্টি বলে বিজ্ঞাপিত হলেও আসলে ওটা তা নয়।
