(ঘ) ধর্মশাস্ত্রীয় রচনা : শরীয়ত ও মারফত বিষয়ক বহু গ্রন্থও রচনা করেছেন এরা? মোহাম্মদী বেদতত্ত্ব, ফকির বিলাস, নসিয়তনামা, মুর্শিদনামা, তম্বিয়াতুন্নেসা, আহকামুল জুমা, সেরাতুল মুমেনীন, একশত বত্রিশ ফরজ, নামাজ মাহাত্ম্য, হাজার মোসায়েল, তরিকতে হক্কানি, হকিকতে সিতারা প্রভৃতি এ শ্রেণীর গ্রন্থ।
(ঙ) বিবিধ :তাজকিরাতুল আউলিয়া, আবু সামা, ইরিস নামা, যুগীকাঁচ, ফালনামা, গান, কিয়ামতনামা প্রভৃতি।
প্রণয়োপখ্যান ছাড়া অন্য শ্রেণীর রচনাগুলো কম-বেশি ধর্ম-সংপৃক্ত। এবং প্রাকৃতজনের এ ইসলাম হচ্ছে লৌকিক ইসলাম। অর্থাৎ স্থান-কালে প্রভাবজ এবং দেশী মুসলমানের মানস-প্রসূত এ ইসলাম নতুন অবয়বে প্রকাশমান। এই তথ্য মনে রেখে বলা যাবে দোভাষী সাহিত্য স্বধর্মনিষ্ঠ, আদর্শবাদী ও জাতীয় ঐতিহ্যগর্বী এবং অদ্ভুত কল্পনাপ্রিয় স্বাপ্নিক কবির রচনা। অসম্পূর্ণ শিক্ষার দরুন নীতিবোধ ও জীবনাদর্শ সম্বন্ধে একটি লোকায়ত স্কুলবোধের প্রতিচ্ছবি পাই এঁদের রচনায়। দেশ, জাতি ও ধর্মের ইতিকথা এবং সমাজ-সংস্কৃতির একটি অতি স্কুলবোধ ও রূপ এ সাহিত্যে প্রতিফলিত।
অতএব, আঠারো-উনিশ শতকী দোভাষী সাহিত্য আমাদের নগর-বন্দর এলাকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর মন-মানসের তথা জীবনচর্যার প্রতিচ্ছবি ও প্রতিভূ! এ সাহিত্যই উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে আজ অবধি, শতকরা নিরানব্বইজন বাঙালি মুসলমানের মনে জাগিয়ে রেখেছে ইসলামী জীবন ও ঐতিহ্য চেতনা। সাহিত্য রচনার শেষ লক্ষ্য যদি সমাজকল্যাণ হয়, তাহলে মানতেই হবে দোভাষী সাহিত্যই গত একশ বছর ধরে অশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত মুসলমানের জগৎ ও জীবন ভাবনার নিয়ামক। এই দিক দিয়ে এ সাহিত্যের সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিমেয়! এ ভাষাও দাখিনী উর্দু ও উত্তরভারতীয় উর্দুর মতো একটি মুসলিম ভাষা হতে পারত–এ উল্লাসবোধ, কিন্তু হল না–এ ক্ষোভই দোভাষী রীতি চিরকাল জাগিয়ে রাখবে স্বজাতি ও সংস্কৃতিপ্রিয় মুসলিম ঐতিহাসিকের মনে।
বাংলা সাহিত্যের ইসলামমুখী ধারা
মুসলমানদের ভারত অধিকার ভারতবর্ষের সামাজিক ও কৃষ্টির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ইতিপূর্বে শক-হুঁণদল এসেছিল; ভারতবাসীরা অনায়াসে তাদের গ্রহণ করতে পেরেছিল। কিন্তু বহিরাগত পাঠান-মুঘলকে এদেশীয় সমাজ আত্মস্থ করতে পারেনি। তার কারণ মুসলমানেরা শুধু বিশেষ আকৃতি, প্রকৃতি ও বাহুবল সম্বল করে আসেনি, এনেছিল যুক্তি-নির্ভর এবং প্রত্যয়-দৃঢ় ধর্ম, সমাজ, আচার আর রাষ্ট্রাদর্শ–যার সামাজিক ও পারমার্থিক প্রভাব ছিল অসাধারণ–এত অসাধারণ যে, তা আজকের দিনের বোলশেভিকবাদের চাইতেও সর্বগ্রাসী এবং আণবিক বোমার চাইতেও বিস্ময়কর। ফলে মুসলমানদের এক দেহে লীন করা সম্ভব হয়নি কোনোমতেই। কিন্তু আচার-নিষ্ঠ ব্রাহ্মণ্যধর্মও পর্যদস্ত হবার নয়; এর অন্তর্নিহিত শক্তিই এই নবশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার যোগ্য ছিল। তাই ভারতীয় সনাতন ধর্ম জখম হল নানাভাবে কিন্তু লুপ্ত হল না। ফলে ব্রাহ্মণ্যধর্ম না হল ইসলামে বিলীন, না পারল মুসলমানদের বিলীন করতে। বিজেতা ও বিজিতদের তথা শাসক ও শাসিতদের মধ্যেকার এ স্নায়ুবিক দ্বন্দ্ব দেখা দিল বড়ই তীব্র হয়ে। কেউ কাকেও না পারে গ্রহণ করতে, না পারে গ্রহণ করাতে। অবস্থাটা যেন কেহ কারে নাহি জিনে সমানে সমান। উভয় পক্ষই বুঝল–এ অবস্থা অসহ্য, এর আশু সমাধান প্রয়োজন। বর্ণাশ্রম কণ্টকিত অনুদার রক্ষণশীল হিন্দু সমাজেও ভাঙন ধরল ইসলামের সাম্য-ভ্রাতৃত্বের চুম্বকাকর্ষণে।
এ সমস্যার সমাধানার্থ শুরু হল সমাজ-চেতন মনীষীদের সাধনা। ধর্ম সমন্বয়ের ও ঐক্যের বাণী ভারতের সর্বত্র ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। রামানন্দ, নানক, কবির, একলব্য, দাদু, চৈতন্য ও সম্রাট আকবর থেকে গান্ধী পর্যন্ত এ ধারার সাধনা অব্যাহত ছিল। এ পথে গান্ধীর রামধূন সঙ্গীতকে শেষ প্রয়াস বলে ধরে নেয়া চলে। এইসব মনীষীদের যা ছিল সচেতন প্রয়াস, অশিক্ষিত জনসাধারণের অবচেতন মনে তার প্রতিক্রিয়া ছিল শ্লথ ও মন্থর। তাই সাতশ বছরের এ একাগ্র সাধনা আশানুরূপ ফলপ্রসূ হয়নি। মনীষীদের দূরদৃষ্টি জনসাধারণের মধ্যে ছিল একান্তই দুর্লভ। তাই সমঝোতা হল, বন্ধুত্ব হল, আত্মীয়তাও না হয়েছে তা নয়, কিন্তু এ বন্ধনসূত্র দৃঢ় ছিল কোথাও। ফলে যেহেতু গড়ন ভঙ্গিতে পারে আছে কত খল, সেহেতু অল্লোপরিষদ থেকে রামধূন সঙ্গীত পর্যন্ত সবকিছুর আবেদন কার্যক্ষেত্রে বারবার ঠুনকো কাঁচের মতো অসার প্রতিপন্ন হয়েছে।
বলেছি, অশিক্ষা ও অদূরদর্শিতার দরুন জনসাধারণের মনে ঐক্য ও সমন্বয় প্রয়াস সচেতনভাবে কার্যকর হয়নি। সেইজন্যে যদিও এখানে সেখানে পারস্পরিক প্রভাবে অজান্তে সংস্কার ও কৃষ্টিগত সংমিশ্রণ ঘটেছিল, তথাপি আচরণে না হোক উভয়পক্ষের স্বধর্মনিষ্ঠা ও স্বধর্ম মাহাত্মগর্ব প্রবল ছিল। ফলে তারা ঘাটে-মাঠে ও হাটে-বাটে মিলেছে, কেননা জীবিকা ছিল তাদের অভিন্ন, কিন্তু জীবনদর্শনে মেলেনি। কাজে মিলেছে, ভাগ্যও ছিল একসূত্রে গাঁথা; তাই পণ্য দিয়েছে, কিন্তু প্রেম দেয়নি; সহায়তা করেছে কিন্তু সোহাগ দেখায়নি। একে অপরের পাশে ছিল, কেউ কেউ কাকেও মনের কাছে পায়নি। কেননা মন ছিল বিচ্ছিন্ন ও বিপরীতমুখী।
