হিন্দুস্তানী বাক্যের প্রয়োগ :
তেরা মেরা শাদী হোগা আয়েন্দা জুমারাত
কাদের রহিম আল্লা রহমানের রহিম,
আলমের পালনে ওয়ালা হক্কের হাকিম।
নেক কামে রাজি সেহ বদি কামে দেক।
পহেলা দাওত ভেজে রসুল খাতেরে।
খানা বেগর দো ইমাম বড়া পেরেসান।
সেতাবি এ মোছফেরে লেহ পাকড়িয়া।
সুন্দর করে বলা কথাই কাব্য তথা সাহিত্য। শায়েরদের রচনায় সে-সৌন্দর্যের অভাব। কে না জানে, ধ্বনিমাধুর্য সৃষ্টি হয় সূচিত শব্দের সুবিন্যাসেই। এ চেতনা স্বল্পশিক্ষিত পুথি শায়েরদের মধ্যে দুর্লক্ষ্য। তাই অনবরত শব্দের নির্লক্ষ্য বিশৃঙ্খল প্রয়োগে বক্তব্যের অনর্গল প্রকাশই ছিল তাদের লক্ষ্য। ফলে, অমার্জিত সুরুচির প্রলেপে ঐ ভাষায় এবং ভঙ্গিতে একটা সামগ্রিক অশ্লীলতা যেন প্রকাশমান। অবশ্য এ হচ্ছে বিরূপ শিক্ষিত মনের কথা। কিন্তু যারা এ সাহিত্যের লেখক আর যাদের জন্যে লেখা তাদের মধ্যে এসব ব্যাপারে কোনো বিচলন হয়তো নেই। বহুকালের অনুশীলনে এটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বীকৃত ও সমাদৃত রীতি, বিশেষত বিকল্প রীতি যখন অনুপস্থিত এবং পাঠকেরও শিক্ষা আর রুচির হ্রাস-বৃদ্ধি হয়নি।
মিশ্রভাষায় হালকা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক রচনারীতির ঐতিহ্য এদেশেও সুপ্রাচীন। আমীর খসরু (ফারসি-হিন্দি), ভারতচন্দ্র (বাঙলা-ফারসি-হিন্দুস্তানী), দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত সেন (বাঙলা ইংরেজি), আহসান হাবীব (দোভাষীরীতি : ফরমান, হকনাম ভরসা, জঙ্গনামা), আবুল মনসুর আহমদ (দোভাষী রীতি : আসমানী পর্দা) প্রমুখ কবির রচনা তার সাক্ষ্য।
আবার ইরানি কবি নিজামীর সিকান্দরনামা এবং বাঙালি কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবির বহু উৎকৃষ্ট কবিতা বিদেশী শব্দবহুল।
অতএব, শব্দের প্রয়োেগ-নৈপুণ্য বা কুশলতার উপরই কাব্যের উৎকর্ষ নির্ভর করে এবং ব্যবহার-যোগ্যতাই ঔচিত্য ও উপযোগের নিয়ামক ও পরিমাপক।
দোভাষী শায়েরা প্রাকৃতজনের কবি। তাই পরিশীলিত মানসের শিল্পরুচি এবং সুন্দর ও মহৎ জীবনের মাহাত্ম্যচেতনা কিংবা জীবন-জিজ্ঞাসা তাদের রচনায় অনুপস্থিত।
.
০৭.
দোভাষী সাহিত্য পাঁচটি ধারায় বিভক্ত?
(ক) প্রণয়োপাখ্যান : সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল, ইউসুফ জোলেখা, চন্দ্রভান, চন্দ্রাবতী, গুল-হরমুজ, গুল-সনোবর, গুলে বকাওলি, মধুমালতী, মৃগাবতী-যামিনীভান, লায়লী মজনু, আলেফ লায়লা প্রভৃতি। এগুলো উর্দু গ্রন্থেরকৃচিৎ ফারসি ও হিন্দি-অওধী কাব্যের স্বাধীন অনুবাদ তথা কাহিনীর স্বাধীন অনুসৃতিমূলক। এগুলোর মধ্যে রূপকথা শ্রেণীর গল্প-কথন প্রয়াস আছে, বাস্তব জীবনবোধের কোনো পরিচয় বা জীবনের কোনো তাত্ত্বিক চেতনার বা রূপের উদ্ভাস নেই। বাঙালি রচিত বা অনূদিত এ সাহিত্যে বাঙলার প্রকৃতি বা সমাজ, বাঙালি জীবনের সমস্যা কিংবা যন্ত্রণা বা উল্লাসের কোনো ছাপ নেই। আছে কেবল আঙ্গিকের ও রসের গতানুগতিকতা এবং ব্যক্তিমনের স্পর্শনিরপেক্ষ যান্ত্রিক পরিচর্যা।
(খ) যুদ্ধকাব্য : জঙ্গে খয়বর, জঙ্গে ওহুদ, জঙ্গে বদর, শাহনামা, আমির হামজা, সোনাভান, জৈগুন, কারবালা যুদ্ধ, কাসাসূল আম্বিয়া প্রভৃতি কাব্যে রসুল, আলি, হামজা, হানিফা, হোসেন প্রমুখ ইসলামের উন্মেষযুগের বীরদের কাফের-দলন এবং ইসলাম প্রচারকাহিনী বিবৃত। এসব যুদ্ধকাব্যে রোমান্সের তথা প্রণয়-রসের অবতারণা থাকলেও এগুলো মূলত জেহাদী প্রেরণার কাব্য। কোনো স্বার্থবুদ্ধি নয়–ইসলাম প্রচার-প্রীতিই প্রেরণার উৎস। তাঁদের এক হাতে কোরআন আর এক হাতে তরবারি, মুখে রয়েছে বেদীনের প্রতি তাদের আহ্বান : হয় কোরআন বরণ কর, নয়তো তরবারির মোকাবেলা কর। তাঁরা কাফের-পূজ্য দেবতাদের বিজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বী। এসব কাব্যে স্বধর্মের ও স্বজাতির অতীত গৌরব স্মরণে উল্লাসবোধের আভাস আছে, অবশ্য সে-উল্লাস হচ্ছে আত্মপ্রত্যয়হীন নিঃস্ব দুর্বলের আত্মীয়-গৌরবে আত্মপ্রসাদলাভের বাঞ্ছাজাত এবং এতে রয়েছে বর্তমান আর্তনাদকে অতীত আস্ফালনে ঢাকা দেবার প্রয়াস–দুর্দিনে আত্মপ্রবোধ ও স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা।
(গ) পীর পাঁচালী : পীর পাঁচালিগুলো শায়েরদের মৌলিক সৃষ্টি, যে-অর্থে মঙ্গল কাব্যগুলো মৌলিক সে-অর্থেই অবশ্য। কেননা এখানেও রয়েছে পুচ্ছগ্রাহীর অনুসৃতি। পীর পাঁচালি দুই শ্রেণীর : (১) ঐতিহাসিক ব্যক্তি নির্ভর ও (২) কাল্পনিক।
(১) মোবারক, গোরাচাঁদ, ইসমাইল গাজী, খাঞ্জা খা গাজী (খান-ই জাহাঁ খান), সফি খা গাজী শাহ শফিউদ্দিন (খা?)] ঐতিহাসিক ব্যক্তি। এঁরা হিন্দুর লৌকিক দেবতার প্রতিদ্বন্দ্বী কাফের-মর্দন ও ইসলামপ্রচারক পীররূপে কল্পিত। অতএব এঁরা মঙ্গল কাব্যের দেবতার আদলে সৃষ্ট এবং এঁদের ভূমিকাও অভিন্ন।
(২) শাসক-শাসিতের তথা হিন্দু-মুসলমানের ধর্ম সমন্বয়, সদ্ভাব ও প্রীতির ভিত্তিতে এসব মৌলিক তথা কাল্পনিক পীর সৃষ্ট। জীবন ও জীবিকার এবং পীড়ন ও নিরাপত্তার অভিন্নতাবোধ থেকেই এই প্রীতি ও মিলন-প্রয়াসের জন্ম। তাই এসব পীর হিন্দুদেবতারই প্রতিরূপ : সত্যনারায়ণ-সত্যপীর, কালুরায়-কালুগাজী, বনদেবী-বনবিবি, মছন্দর-মছলন্দি, ওলাদেবী-ওলাবিবি, দক্ষিণরায়-বড় খাঁ গাজী, উদ্ধারদেবী-উদ্ধার বিবি, বাস্তদেবী-বাস্তুবিবি। এঁদের মধ্যে সত্যপীরই আদি ও প্রধান ঐক্যদূত। তাঁকে কেন্দ্র করে তৈরি হল মিলনসেতু। মিলন-ময়দানের তিনিই ইমাম।
