আবার গৌড়, পাণ্ডুয়া, চট্টগ্রাম, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি নতুন-পুরোনো শাসন-কেন্দ্রের মতো নতুন-জাগা বন্দর হাওড়া-হুঁগলী-কলকাতায়ও ঘটে বিদেশী লোকের সংখ্যাধিক্য! স্থায়ী বাসিন্দাও হয়ে যায় এদের অনেকেই। ফারসি-উর্দুভাষী বিদেশীর প্রভাবে স্থানীয় জনগণের মাতৃভাষাও হতে থাকে বিকৃত। আজো সেই বিকৃত বাঙলা ও বিকৃত হিন্দুস্তানী চালু রয়েছে উক্ত সব অঞ্চলে বিশেষ করে মুসলিম সমাজে। বড়র অনুকরণ করা মানুষের স্বভাব। এজন্যেই বন্দর এলাকায় একদা পর্তুগীজ ভাষাও শিখেছিল আত্যন্তিক আগ্রহে। হুগলীতে নাকি ইরানি ব্যবসায়ী শিয়াদের আড্ডা ও বসতি শুরু হয় মুর্শিদাবাদেরও আগে এবং ইরানি ভাষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবেও হুগলীর খ্যাতি ছিল দূর-বিস্তৃত। উল্লেখ্য যে, দোভাষীরীতির আদিকবি ফকির গরীবুল্লাহও ছিলেন হুগলীর বালিয়া হাফিজপুরের লোক।
ইরানি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব সর্বগ্রাসী ও সর্বাত্মক হয় আঠারো শতকে যখন উটের পিঠে শেষ তৃণখণ্ডের মতো বাঙলার শাসনভার পেলেন শিয়া-মুর্শিদকুলি খান। বংশানুক্রমিক নওয়াবীতে পরিণত হয় তাঁর সুবাদারী। ইরানে শিয়া সাফাভী বংশীয় রাজত্বের অবসান ঘটে সতেরো শতকে। ফলে কৃপাবঞ্চিত ও পীড়ন-ভীত বহু শিয়া তখন দেশত্যাগ করে। শিয়া মুর্শিদকুলি খানের অনুগ্রহকামী বহু ইরানি শিয়া আশ্রয় নেয় বাঙলাদেশে। এ সময়ে শহর অঞ্চলে তথা মুর্শিদাবাদ ও হাওড়া-হুঁগলী বন্দর এলাকায় ফারসি-উর্দু ও শিয়া-সংস্কৃতির প্রভাব হয় গভীর ও ব্যাপক। এই প্রভাবেরই সাক্ষ্য রয়েছে হালহেডের উক্তিতে, চিঠিপত্রের ভাষায়, সত্যনারায়ণ পাঁচালি ও মর্সিয়ার জনপ্রিয়তায় এবং পাঞ্জাতন, পাঁচপীর প্রভৃতির সংস্কারে, মহররমের তাজিয়া-উৎসবের পার্বণিক প্রতিষ্ঠায় এবং ফকির গরীবুল্লাহ প্রবর্তিত দোভাষী রীতিতে। উত্তরভারতীয় আদলে যখন একটি দেশী মুসলিম সংস্কৃতি প্রকাশমান এবং উর্দুর মতো একটি মুসলিম ভাষা সৃজ্যমান, তখন হঠাৎ নতুন দিগন্তের সন্ধান দিল পলাশীর প্রান্তর। পালে লাগল সেই দিগন্তমুখী বাতাস। পরিণামদর্শী স্বস্থ হিন্দুরা বরণ করে নিল নতুনকে; দ্বিধাগ্রস্ত মুসলমান আকর্ষণ হারাল পুরাতনে, কিন্তু আগ্রহ জাগল না নতুনেও, তাই অর্ধ শতাব্দ ধরে তারা রইল নিঃস্ব ও বিমূঢ়। তখন তারা মনেও কাঙাল, ধনেও কাঙাল। যে-নওয়াবীর প্রচ্ছায় একদা শহর-বন্দরের মুসলমানরা নতুন জীবনস্বপ্ন রচনা করছিল, তা অলক্ষ্যে লাটগিরিতে পরিণত হওয়ায় এভাবে ব্যর্থ হল তাদের স্বপ্ন। স্বপ্ন উবে গেল, কিন্তু ঘোর কাটল না অনেকদিন। যদিও সম্ভাবনাটা উদ্ভাসিত হয়েছিল উত্তরভারতীয় আদলেই, কিন্তু সৌভাগ্যটা আর মিলল না। কেননা রূপায়ণের আর সাফল্যের সব আয়োজন যখন সমাপ্ত, তখন আকাশে দেখা দিয়েছে নতুন সূর্য। নতুন দিনে পুরোনো রচনা অতীতের ঘটনা।
অতএব দোভাষীরীতির উদ্ভব, পরিচর্যা ও বিকাশক্ষেত্র হচ্ছে কলকাতা, হাওড়া ও হুগলীর বন্দর এলাকা। এখানকার এটিই ছিল চলিত বাঙলা। রেজাউল্লাহ (১৮৬১), মালে মুহম্মদ, বেলায়েত ও দানিশ তাই দোভাষী রীতিকে বলেছেন এছলামি বাঙলা, কেউ অভিহিত করেছেন চলিত বাঙলা বলে, আর এর বিকাশ ও বিস্তারকাল হল ইংরেজ আমল। যা উচ্চবর্গের অভিজাতের পরিচর্যার অপেক্ষা রাখত, তা-ই নিম্নবিত্তের স্বল্পশিক্ষিত লোকের অনুশীলনে টিকে রইল শহরের সংকীর্ণ-সীমায়। এ যেন দুধের প্রত্যাশায় ঘোলের সাধনা অথবা দুধের সাধ ঘোলে মিটানো। কেননা এ সাধনায় যারা ব্ৰতী রইলেন, তাঁদের অসম্পূর্ণ শিক্ষা ও অপরিসুত শিল্পরুচি যোগ্য ছিল না কোনো সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করার সামর্থ্য ছিল না তাদের লক্ষ্য-চেতনা মনে জাগিয়ে রেখে এগিয়ে যাবার। এভাবে ব্যর্থ হল একটি জাতীয় স্বপ্ন, একটি ইপ্সিত সম্ভাবনা ও একটি মহৎ প্রয়াস।
উনিশ শতকের শেষপাদ থেকেই কেবল কলকাতা, হাওড়া ও হুগলী অঞ্চলের বাইরের লোক বটতলার প্রকাশকদের দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে ফরমায়েশি রচনায় দোভাষী রীতি প্রয়োগ করতে থাকেন। এ রীতি আজো অনুসৃত হচ্ছে প্রাকৃত মুসলমানদের জন্যে সৃষ্ট বটতলা সাহিত্যে–এমনকি মাওলানা আকরম খানের পাকিস্তান নামায় কিংবা কাজী আবুল হোসেনের জিন্নানামায় এবং আবুল মনসুর আহমদের আসমানি পর্দায়ও।
গৌড়, পাণ্ডুয়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, হাওড়া, হুগলী, কলকাতা ও মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি শাসনকেন্দ্র ও বন্দর এলাকা ছাড়া, অন্যান্য অঞ্চলের দেশজ মুসলমানের কথ্য ভাষা তো বটেই, লেখ্যভাষাও চিরকাল অবিমিশ্র বাঙলা।
.
০৬.
বিদেশী শব্দের বহুল প্রয়োগ নয়–হিন্দুস্তানী বাঙ্গির অনুকৃতিই এ রীতিকে দোভাষী করেছে :
সর্বনাম–তেরা, মেরা, তুঝে, মুঝে ইত্যাদি।
বিশেষণ–এয়ছা, যেয়ছা, তেয়ছা, কেয়ছা, কব, কাহে, এত্তা, কেত্তা, হোড়া, ভি, আভি।
সংখ্যাবাচক–পয়লা, দোছরা, তেছরা প্রভৃতি।
অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয়–বিচে, খাতেরে, হুজুরে ইত্যাদি।
হিন্দুস্তানী ক্রিয়াপদ-তোড়, ডাল, ছোড়, নিকাল, গির, উতার, ভেজ, কিয়া, পাকড়, ঘুম ইত্যাদি।
ফারসি নামধাতু-খেসালিত, নেওয়াজিয়া, গোজারিয়া ইত্যাদি।
আরবি-ফারসি বহুবচন-বেরাদরান, এজিদান, শহীদান, মোমেনিন, চাকরান!
পুংলিঙ্গে স্ত্রীলিঙ্গের প্রত্যয় প্রয়োগ-বালা, প্রিয়া, উদাসিনী। পুরো
